বিশ্ব বাণিজ্য ও কৌশলগত জলপথের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধমনী হরমুজ প্রণালি এখন এক অগ্নিগর্ভ রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। থমথমে পারস্য উপসাগরের ওপর দিয়ে যাওয়ার সময় সমুদ্রের জলে পেতে রাখা নিখুঁত নৌমাইনের আঘাতে দাউ দাউ করে জ্বলে উঠেছে বিশাল আকারের দুটি সুপার ট্যাংকার।
অনুমোদনহীন জলসীমা অতিক্রম এবং নৌ চলাচলের মৌলিক নিয়ম ভাঙার অভিযোগে এই রক্তক্ষয়ী ঘটনা ঘটেছে বলে দাবি করেছে ইরানের অভিজাত সামরিক বাহিনী ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)। খবরটি প্রকাশ্যে আসতেই বিশ্বজুড়ে চরম উদ্বেগের ঢেউ খেলে গেছে।
শনিবার বিকেলে তেহরান থেকে প্রকাশিত সামরিক এক বিশেষ বিবৃতিতে আইআরজিসি জানায়, তাদের পেতে রাখা সামুদ্রিক মাইনের সংস্পর্শে এসেই দুই বিশাল তেলবাহী ট্যাংকারে অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে। মাইনের আঘাতে বিশাল আকারের জাহাজ দুটির কাঠামোগত মারাত্মক ক্ষতিসাধন হয়েছে।
তবে ইরানের এই প্রকাশ্য দাবির সঙ্গে তীব্র দ্বিমত পোষণ করেছে পশ্চিমা পরাশক্তি এবং আরব প্রতিবেশী দেশগুলো। তাদের সরাসরি অভিযোগ, হরমুজ প্রণালির মতো আন্তর্জাতিক ট্রানজিট রুটে মুক্ত বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে বাধা সৃষ্টি করতে ইরানি বাহিনী নিজেরাই সরাসরি এই পৈশাচিক হামলা চালাচ্ছে।
আইআরজিসির প্রকাশিত বক্তব্যের দ্বিতীয় দফায় জানানো হয়, আঘাতপ্রাপ্ত দ্বিতীয় বহুজাতিক সুপার ট্যাংকারটিতে প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত খনিজ তেল বোঝাই ছিল। বৈশ্বিক জ্বালানি চাহিদার নিরিখে এটি এক বিশাল পরিমাণের সংস্থান।
সামরিক বাহিনীর ভাষ্য অনুযায়ী, এই সুবিশাল ট্যাংকারটি তাদের নেভিগেশন স্যাটেলাইট ব্যবস্থা ও ট্র্যাকিং রাডার ইচ্ছেকৃতভাবে বন্ধ করে রেখেছিল। কোনো ধরনের আগাম সতর্ক বার্তা বা অনুমতি ছাড়া বিপজ্জনক ও অবৈধ সামুদ্রিক রুট ব্যবহার করে প্রণালি পার হওয়ার অপচেষ্টা করছিল জাহাজটি।
ঠিক সেই বিপজ্জনক মুহূর্তে সমুদ্রতলে পেতে রাখা শক্তিশালী কোনো মাইনের সরাসরি সংস্পর্শে আসে অতিকায় এই ট্যাংকার। বিকট শব্দে মাইনের বিস্ফোরণ ঘটলে মুহূর্তের মধ্যে জাহাজটির মূল ইঞ্জিনকক্ষে ভয়াবহ আগুনের সূত্রপাত হয় এবং তা দ্রুত পুরো কন্টেইনারে ছড়িয়ে পড়ে।
বিপ্লবী গার্ডের নৌ শাখা দাবি করেছে, বিস্ফোরিত হওয়া সেই বিশালাকার সুপার ট্যাংকারটি আগুনের লেপনে দাউ দাউ করে জ্বলছিল এবং বিশাল কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলী আকাশে ভাসছিল। তবে জাহাজে থাকা নাবিক ও কর্মীদের তাৎক্ষণিক পরিণতি সম্পর্কে এখনও চূড়ান্ত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
ঘটনার ধারাবাহিকতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, শুক্রবার থেকেই থমথমে হরমুজ প্রণালিতে মারাত্মক সামরিক তৎপরতা বৃদ্ধি পেয়েছিল। ওই দিনেই প্রথম দুটি বাণিজ্যিক ট্যাংকারে আকস্মিক আক্রমণের কথা আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে চাউর হতে শুরু করে।
পরদিন শনিবার ভোরের দিকে প্রথম একটি ভারী ড্রাম সুপার ট্যাংকারে আগুন ধরে যাওয়ার খবর নিশ্চিত করে তেহরান। তার কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে দুপুরে দ্বিতীয় আরেকটি একই মাত্রার সুবিশাল ট্যাংকার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার তথ্য দিয়ে পারস্য উপসাগরের পারদ আরও চড়িয়ে দেয় বাহিনীটি।
পারস্য উপসাগরের এই বিষাক্ত সামরিক সংকটের শেকড় জড়িয়ে রয়েছে চলতি বছরের শুরুতেই ঘটে যাওয়া এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের ইতিহাসের সঙ্গে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের অভ্যন্তরীণ অবকাঠামো লক্ষ্য করে যৌথভাবে বড় ধরনের সামরিক হামলা চালায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল।
সেই বিধ্বংসী বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার প্রতিবাদ ও জবাবে তেহরান কালক্ষেপণ না করে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে সকল প্রকার আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। প্রণালির সরু জলপথে মাইন বিছিয়ে অবরুদ্ধ করে রাখা হয় পুরো সামুদ্রিক বাণিজ্যিক রুট।
পরবর্তী পরিস্থিতিতে ক্ষিপ্ত হয়ে যুক্তরাষ্ট্রও বসে থাকেনি। মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের মিত্রদের জ্বালানি নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে তারা পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে ইরানের সমস্ত সমুদ্র বন্দরে কঠোর নৌ-অবরোধ আরোপ করে। এই পাল্টাপাল্টি সামুদ্রিক অবরোধের ফলে পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথটি চরম অনিশ্চয়তা ও বিপজ্জনক ফাঁদে পরিণত হয়।
এই সর্বাত্মক সামরিক অবরোধের মধ্যেই মার্কিন নৌবাহিনীর বিশেষ পাহারা ও নিরাপত্তায় কৌশলগত সুযোগ নিয়ে কয়েকটি আরব দেশ তাদের পরিশোধিত ও অপরিশোধিত তেল বোঝাই ট্যাংকার সাফল্যের সঙ্গে হরমুজ প্রণালি পার করে দিতে সমর্থ হয়েছিল।
পশ্চিমা বলয়ের এই কৌশল ইরানকে মানসিকভাবে আরও ক্ষিপ্ত করে তোলে। ফলে গত কয়েক দিন ধরে সেই সমুদ্রপথ দিয়ে যাতায়াতকারী যেকোনো সন্দেহভাজন ট্যাংকার ও বাণিজ্যিক জাহাজের গতিপথ রুদ্ধ করতে ফের নজিরবিহীন সামরিক ও প্রযুক্তিগত বাধা সৃষ্টি করতে শুরু করেছে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী।
হরমুজ প্রণালির ভৌগোলিক গঠন অত্যন্ত সংকীর্ণ হওয়ার কারণে নিরাপত্তা ঝুঁকির মাত্রা বহুগুণ বেড়ে গেছে। ওমান ও ইরানের মাঝখানে অবস্থিত এই প্রণালির সবচেয়ে সরু অংশটি মাত্র ২১ মাইল চওড়া। অথচ বিশ্বজুড়ে প্রতিদিন যত অপরিশোধিত তেল পরিবাহিত হয়, তার এক-পঞ্চমাংশই যায় এই একটিমাত্র পথ দিয়ে।
ফলে এই গুরুত্বপূর্ণ প্রণালিতে কোনো ধরনের বিস্ফোরণ কিংবা জাহাজ ডুবির ঘটনা ঘটলে তার প্রত্যক্ষ নেতিবাচক প্রভাব পড়ে বিশ্বজুড়ে। তেলের মূল জোগান নিশ্চিতকারী রুটটি অচল হয়ে পড়লে নিমেষের মধ্যেই আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম আকাশচুম্বী হতে বাধ্য।
ইতিমধ্যেই বৈশ্বিক তেলের বাজারগুলোতে হরমুজে দুই সুপার ট্যাংকার পোড়ার খবরের পর বড় ধরনের অস্থিরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এশিয়া থেকে ইউরোপ—বিশ্বের প্রধান প্রধান শেয়ার বাজার ও জ্বালানি বাণিজ্যিক কেন্দ্রে তেলের ভবিষ্যৎ চুক্তি নিয়ে বড় ধরনের দরপতনের আতঙ্ক বিরাজ করছে।
কূটনৈতিক মহল মনে করছে, মার্কিন ও ইসরায়েলি যৌথ হামলার পর তেহরান এখন তাদের প্রধান অর্থনৈতিক অস্ত্র হিসেবে হরমুজ প্রণালিকে কঠোরভাবে ব্যবহার করছে। বিশ্বের তেলের বাজারকে জিম্মি করে নিজেদের ওপর আসা বৈশ্বিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ কমানোই তেহরানের মূল সামরিক কৌশল।
কিন্তু এই সামরিক খেলার খেসারত দিতে হচ্ছে সাধারণ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক শিপিং কোম্পানিগুলোকে। বিশ্বখ্যাত শিপিং ফার্মগুলো তাদের কোটি কোটি ডলারের তেলের ট্যাংকার এই বিষাক্ত প্রণালির মধ্য দিয়ে পাঠাতে অস্বীকার করছে। ফলে আন্তর্জাতিক সাপ্লাই চেইন বা সরবরাহ ব্যবস্থায় এক অভাবনীয় স্থবিরতা দেখা দিয়েছে।
বিভিন্ন সামুদ্রিক বিমা প্রদানকারী সংস্থাও পারস্য উপসাগরীয় এলাকায় চলাচলকারী যেকোনো জাহাজের জন্য ওয়ার-রিস্ক বা যুদ্ধকালীন ঝুঁকি বিমার প্রিমিয়াম কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। বিমা খরচ লাফিয়ে বাড়ার কারণে পরিবাহিত প্রতিটি তেল ট্যাংকারের পরিচালন ব্যয় এখন অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি।
আরব দেশগুলো, বিশেষ করে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কুয়েত তাদের বিপুল পরিমাণ খনিজ তেল রপ্তানির জন্য ঐতিহাসিকভাবে হরমুজের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। তাই হরমুজ প্রণালিতে মাইন আতঙ্কের কারণে এই দেশগুলোর জাতীয় রাজস্ব ও অর্থনীতিও মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে।
আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন অনুযায়ী হরমুজ প্রণালি একটি আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক ট্রানজিট চ্যানেল, যেখানে যেকোনো দেশের বাণিজ্যিক জাহাজের স্বাধীনভাবে যাতায়াতের আইনি অধিকার স্বীকৃত। কিন্তু যুদ্ধ কিংবা জাতীয় নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে ইরান সরকারের এই কড়া সামুদ্রিক অবরোধ আন্তর্জাতিক আইনকে এক বড় চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের পঞ্চম নৌবহর, যাদের মূল ঘাঁটি পারস্য উপসাগরের বাহরাইনে অবস্থিত, তারা ইতিমধ্যেই এই অঞ্চলে তাদের যুদ্ধজাহাজ, দূরপাল্লার ড্রোন এবং নজরদারি বিমান টহল বাড়িয়েছে। যে কোনো সময় আইআরজিসির মুখোমুখি সংঘাত লেগে যাওয়ার এক ভয়াবহ আশঙ্কায় দিন গুনছে পুরো বিশ্ব।
সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরানের আইআরজিসি সাধারণ যুদ্ধজাহাজের চেয়েও গেরিলা কৌশলের সামুদ্রিক যুদ্ধে অত্যন্ত পারদর্শী। তাদের হাতে থাকা আধুনিক স্টিলথ মাইন, দ্রুতগতির অ্যাটাক বোট এবং উপকূলীয় ক্ষেপণাস্ত্র বড় বড় মার্কিন রণতরীরও ব্যাপক ক্ষতিসাধন করতে সক্ষম।
অসম বা অ্যাসিমেট্রিক রণকৌশলে ইরান যদি দীর্ঘমেয়াদে হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণ অচল করে রাখতে পারে, তবে বিশ্বের জ্বালানিভিত্তিক অর্থনীতিতে এক চরম বিপর্যয় নেমে আসবে। সাধারণ মানুষের জন্য দৈনন্দিন জ্বালানি তেল, রান্নার গ্যাস ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম হু হু করে বাড়বে।
জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইতিমধ্যেই উভয় পক্ষকে সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শনের তাগিদ দিয়ে জরুরি বিবৃতি জারি করেছে। তবে ওয়াশিংটন এবং তেহরানের মধ্যকার কূটনৈতিক সেতু পুরোপুরি ভেঙে পড়ায় এই উপদেশ বাস্তবে কতটা কাজ করবে, তা নিয়ে গভীর সংশয় থেকে যাচ্ছে।
এভিয়েশন ও শিপিং খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পারস্য উপসাগরের বাণিজ্যিক জাহাজগুলোতে নিয়োজিত হাজার হাজার আন্তর্জাতিক নাবিক ও ক্রু সদস্যদের জীবন এখন চরম ঝুঁকির মুখে। কাজের তাগিদে মাঝসমুদ্রে ঘুরে বেড়ানো এই নিরপরাধ শ্রমিকেরা এখন পরাশক্তিগুলোর মধ্যে চলতে থাকা এই ছায়াযুদ্ধের প্রধান বলির পাঠা হয়ে উঠছেন।
উভয় পক্ষের এই মারমুখী অবস্থানের ফলে মধ্যপ্রাচ্যে এক পূর্ণাঙ্গ আন্তর্জাতিক সংঘাতের আশঙ্কা ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। যদি দ্রুত কোনো কূটনৈতিক সমাধান বের না করা যায়, তবে হরমুজ প্রণালির এই পোড়া তেলের আগুন অচিরেই ছড়িয়ে পড়বে বিশ্ব অর্থনীতির প্রতিটি কোণায়, যা কাটিয়ে ওঠা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য হবে এক পর্বতসম পরীক্ষা।
একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক অবরোধ ও সামরিক উপস্থিতি, অন্যদিকে ইরানের প্রতিরক্ষামূলক আক্রমণাত্মক মাইন কৌশল—এই দুইয়ের চাপে পড়ে অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে পৃথিবীর সবচেয়ে সংবেদনশীল জ্বালানি ধমনী। তেলের বাজারে আগুনের আঁচ যে কত দূর পৌঁছায়, তা এখন কেবল সময়ের ব্যাপার।
হরমুজ প্রণালিতে দুই সুপার ট্যাংকারে ভেসে ওঠা সেই লাল আগুনের শিখা কেবল দুটি সমুদ্রযানের ধ্বংস নয়, এটি মূলত বৈশ্বিক অর্থনীতি ও পরাশক্তিগুলোর মধ্যকার সম্ভাব্য এক দীর্ঘমেয়াদি ও প্রলয়ংকরী যুদ্ধের বিপজ্জনক আগাম পূর্বাভাস।

