বঙ্গোপসাগরের বুকে জমা হওয়া মেঘ আর থমথমে বাতাসের গর্জনে উপকূলীয় জনপদে নতুন করে আশঙ্কা দানা বাঁধতে শুরু করেছে। সাগরে অবস্থানরত গভীর নিম্নচাপটি শক্তি সঞ্চয় করে শেষ পর্যন্ত একটি পূর্ণাঙ্গ ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নিতে পারে বলে সতর্ক বার্তা দিয়েছে আবহাওয়া অফিস।
প্রকৃতির এমন রুদ্ররূপের আভাস পেতেই দেশের সমুদ্রবন্দরগুলোতে জারি করা হয়েছে বিশেষ দূরবর্তী সতর্কসংকেত। উত্তাল হয়ে ওঠা সাগরের ঢেউয়ের তোড়ে জেলে ও উপকূলের সাধারণ মানুষের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়তে শুরু করেছে।
রোববার সন্ধ্যায় বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের ঝড় সতর্কীকরণ কেন্দ্র থেকে প্রকাশিত বিশেষ বিজ্ঞপ্তিতে এই আশঙ্কার কথা জানানো হয়েছে। আবহাওয়াবিদ এ কে এম নাজমুল হকের সই করা ওই বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গভীর নিম্নচাপটি এখন আরও ঘনীভূত হওয়ার পথে রয়েছে।
পূর্ব-মধ্য বঙ্গোপসাগর ও তার কাছাকাছি দক্ষিণ-পূর্ব বঙ্গোপসাগর এলাকায় অবস্থান করা নিম্নচাপটি ধীরগতিতে আরও শক্তি সঞ্চয় করে গভীর নিম্নচাপে পরিণত হয়েছে। প্রকৃতির এই খামখেয়ালিপনা যেকোনো মুহূর্তে বড় কোনো প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের রূপ নিতে পারে বলে শঙ্কা প্রকাশ করছেন আবহাওয়াবিদেরা।
রোববার দুপুরে আবহাওয়া অধিদপ্তরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গভীর নিম্নচাপটি দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরগুলো থেকে বেশ কিছুটা দক্ষিণ দিকে অবস্থান করছিল। এটি চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর থেকে ৮১০ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থান করছিল।
এছাড়া কক্সবাজার সমুদ্রবন্দর থেকে এর দূরত্ব ছিল ৭৩০ কিলোমিটার দক্ষিণে। মোংলা সমুদ্রবন্দর থেকে ৮৪০ কিলোমিটার দক্ষিণে এবং পায়রা সমুদ্রবন্দর থেকে এটি ৭৮০ কিলোমিটার দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব দিকে অবস্থান করছিল।
সমুদ্রের ঠিক কোন জায়গায় এই শক্তি সঞ্চয় ঘটছে, তা প্রতিনিয়ত পর্যবেক্ষণ করছেন আবহাওয়াবিদেরা। স্যাটেলাইট ও রাডার চিত্রের মাধ্যমে গভীর নিম্নচাপটির গতিবিধি অত্যন্ত নিবিড়ভাবে ট্র্যাক করা হচ্ছে।
আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, এই গভীর নিম্নচাপটি প্রথমে দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে সামান্য অগ্রসর হতে পারে এবং পরবর্তীতে আরও বেশি ঘনীভূত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। পরিস্থিতি অনুকূলে থাকলে আগামীকাল সোমবার এটি একটি পূর্ণাঙ্গ ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নিতে পারে।
ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নেওয়ার পর এর গতিপ্রকৃতি ও দিক পরিবর্তন করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এটি পরবর্তীতে পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিম দিকে বাঁক নিয়ে ধীরে ধীরে ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশ উপকূলের দিকে অগ্রসর হতে পারে।
আগামী ২৮ অক্টোবর নাগাদ এটি একটি অতিপ্রবল ঘূর্ণিঝড়ের রূপ নিয়ে ভারতের অন্ধ্র উপকূল অতিক্রম করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে এর প্রভাবে বাংলাদেশ উপকূলীয় অঞ্চলেও ঝড়ো হাওয়া ও ভারী বৃষ্টির শঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
বর্তমানে এই গভীর নিম্নচাপটির চারপাশের পরিবেশ বেশ বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে। গভীর নিম্নচাপটির কেন্দ্রের কাছাকাছি এলাকার ৪৮ কিলোমিটারের মধ্যে বাতাসের একটানা সর্বোচ্চ গতিবেগ ঘণ্টায় ৫০ কিলোমিটার পর্যন্ত রেকর্ড করা হয়েছে।
মাঝেমধ্যে দমকা কিংবা কালবৈশাখী ঝড়ের মতো হাওয়া বয়ে যাওয়ার সময় বাতাসের এই বেগ ঘণ্টায় ৬০ কিলোমিটার পর্যন্ত বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাতাসের এই তীব্রতার কারণে সাগরের বুক চিরে বড় বড় ঢেউ আছড়ে পড়ছে।
ঝড়ের কেন্দ্রের কাছাকাছি সাগরের পানি অত্যন্ত উত্তাল থাকায় ছোট নৌযানগুলোর জন্য পরিস্থিতি মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এই প্রাকৃতিক দুর্যোগের আঁচ পেতেই দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরগুলোতে সতর্কতা জারি করা হয়েছে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরকে ১ নম্বর দূরবর্তী সতর্কসংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে। বন্দরগুলোর কর্র্তৃপক্ষকে সার্বিক পরিস্থিতির ওপর নজর রাখতে বলা হয়েছে।
পাশাপাশি গভীর সাগরে মাছ ধরতে যাওয়া সব ধরনের ট্রলার ও নৌকাকে নিরাপদ আশ্রয়ে থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। উত্তর বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত মাছ ধরার নৌকাগুলোকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত উপকূলের কাছাকাছি থেকে অত্যন্ত সাবধানে চলাচল করতে বলা হয়েছে।
উপকূলীয় এলাকার জেলেদের অনেকেই ইতিমধ্যে মাঝসমুদ্র থেকে ফিরে আস শুরু করেছেন। নিজেদের কাঠের নৌকাগুলো নিরাপদ স্থানে বাঁধতে ব্যস্ত সময় পার করছেন তারা।
প্রকৃতির এই আকস্মিক রূপ পরিবর্তনে উপকূলের মানুষের মনে পুরোন প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়গুলোর স্মৃতি ভেসে উঠছে। বিশেষ করে সিডর কিংবা আইলার মতো ভয়াল দিনগুলোর কথা ভেবে দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছেন তারা।
দুর্যোগ মোকাবিলায় জেলা প্রশাসনগুলোর পক্ষ থেকেও প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়ার কাজ শুরু হয়েছে। উপকূলের ঝুঁকিপূর্ণ বেড়িবাঁধ ও আশ্রয়কেন্দ্রগুলো প্রস্তুত রাখার বিষয়ে আলোচনা চলছে।
আবহাওয়াবিদেরা বলছেন, নিম্নচাপটি ঠিক কোন গতিতে এগোবে এবং এর শক্তি কতদূর বাড়াবে, তা আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আরও পরিষ্কার হবে। সাধারণ মানুষকে নিয়মিত আবহাওয়া বুলেটিন শোনার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

