এক দশক আগের সেই বিভীষিকাময় রাত। কুমিল্লা সেনানিবাসের অন্ধকার ঝোপঝাড় থেকে উদ্ধার হয়েছিল ভিক্টোরিয়া কলেজের মেধাবী ছাত্রী ও নাট্যকর্মী সোহাগী জাহান তনুর নিথর দেহ। দেশজুড়ে প্রতিবাদের ঝড় উঠলেও দীর্ঘ ১০ বছরে তদন্তের চাকা যেন এক জায়গাতেই থমকে ছিল। অবশেষে সেই পাথরচাপা রহস্যের জট খুলতে শুরু করেছে। তনু হত্যার ১০ বছর পর প্রথমবারের মতো এই মামলায় কোনো আসামিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।
বুধবার ভোরে রাজধানীর কেরানীগঞ্জের একটি বাসা থেকে সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত ওয়ারেন্ট অফিসার হাফিজুর রহমানকে গ্রেপ্তার করা হয়। বিকেলে তাকে কড়া নিরাপত্তায় কুমিল্লার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মমিনুল হকের আদালতে তোলা হলে বিচারক জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। দীর্ঘ এক দশকের বিচারহীনতার সংস্কৃতিতে এই গ্রেপ্তার তনুর পরিবার ও বিচারপ্রত্যাশীদের মনে নতুন করে আশার আলো সঞ্চার করেছে।
পিবিআই সূত্র জানায়, এই মামলার মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে তনুর কাপড়ে পাওয়া সেই পুরনো ডিএনএ প্রতিবেদন। ২০১৬ সালে তনুর মরদেহে তিন ব্যক্তির বীর্যের আলামত বা ডিএনএ পাওয়া গিয়েছিল। কিন্তু রহস্যজনক কারণে দীর্ঘ ৯ বছর সেই ডিএনএ প্রোফাইলের সঙ্গে কোনো সন্দেহভাজনকে মিলিয়ে দেখা হয়নি। গত ৬ এপ্রিল কুমিল্লার আদালত পিবিআই-এর বর্তমান তদন্ত কর্মকর্তাকে তলব করলে তিনি ডিএনএ ম্যাচ করার আবেদন জানান। আদালত সেই আবেদন গ্রহণ করে তিন সাবেক সেনাসদস্যের ডিএনএ পরীক্ষার নির্দেশ দেন।
এই তিনজনের তালিকায় ছিলেন সাবেক সার্জেন্ট জাহিদ, সাবেক ওয়ারেন্ট অফিসার হাফিজুর রহমান এবং সাবেক সৈনিক শাহিদুল আলম। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে এদের মধ্যে হাফিজুর রহমানকে আজ গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআই ঢাকার পরিদর্শক তরিকুল ইসলাম নিশ্চিত করেছেন যে, হাফিজুরকে রিমান্ডে নিয়ে সেই রাতের ঘটনা এবং ডিএনএ সংক্রান্ত তথ্যের সত্যতা যাচাই করা হবে।
২০১৬ সালের ২০ মার্চ সন্ধ্যায় টিউশনি করতে গিয়ে নিখোঁজ হয়েছিলেন তনু। পরদিন সেনানিবাসের পাওয়ার হাউস সংলগ্ন জঙ্গল থেকে তার রক্তাক্ত দেহ উদ্ধার হয়। এরপর থানা পুলিশ থেকে শুরু করে ডিবি এবং সিআইডি—একের পর এক সংস্থা তদন্তের দায়িত্ব নিলেও কোনো কূল-কিনারা করতে পারেনি। ২০২০ সালে মামলাটি পিবিআই-এর হাতে যাওয়ার পর তদন্তে নতুন গতি আসে। ষষ্ঠ তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর তরিকুল ইসলাম ডিএনএ প্রমাণের ওপর জোর দেন।
তনুর মা আনোয়ারা বেগম দীর্ঘ ১০ বছর ধরে মেয়ের খুনিদের বিচারের দাবিতে দ্বারে দ্বারে ঘুরেছেন। আজকের এই গ্রেপ্তারের খবর শুনে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে তিনি বলেন, “১০ বছর পর অন্তত একজনের হাতকড়া পড়ল। আমি মরে যাওয়ার আগে দেখে যেতে চাই কারা আমার মাসুম মেয়েটাকে শেষ করেছিল।” তনুর বাবার মৃত্যুর পর পরিবারটি যখন বিচার পাওয়ার আশা প্রায় ছেড়ে দিয়েছিল, তখন এই আইনি অগ্রগতি তাদের জন্য বড় এক স্বস্তি।
আদালত প্রাঙ্গণে রিমান্ড মঞ্জুরের পর তদন্ত কর্মকর্তা তরিকুল ইসলাম সংবাদমাধ্যমকে বলেন, “আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়। আমরা বৈজ্ঞানিক তথ্য-প্রমাণ ও ডিএনএ প্রোফাইলের ওপর ভিত্তি করে এগোচ্ছি। হাফিজুর রহমানকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে অন্য অভিযুক্তদের সম্পর্কেও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যাবে বলে আমাদের বিশ্বাস।” তিনি জানান, জড়িত বাকি দুজনকেও শীঘ্রই আইনের আওতায় আনা হবে।
দশ বছর আগে যে ক্ষত কুমিল্লাসহ পুরো বাংলাদেশকে ব্যথিত করেছিল, সেই ক্ষতের বিচারিক চিকিৎসা কি তবে শুরু হলো? হাফিজুর রহমানের রিমান্ডে কী তথ্য বেরিয়ে আসে এবং বাকি দুই সন্দেহভাজনের ডিএনএ পরীক্ষার ফলাফল কী হয়—সেদিকেই এখন তাকিয়ে আছে পুরো দেশ। তনু হত্যার ন্যায়বিচার কি এক দশক পর আলোর মুখ দেখবে, নাকি এটিও কেবল আইনি দীর্ঘসূত্রতার একটি ধাপ হয়ে থেকে যাবে, তা সময়ই বলে দেবে। তবে আজকের এই গ্রেপ্তার নিশ্চিতভাবেই দেশের বিচার ব্যবস্থায় একটি বড় বার্তা পৌঁছে দিয়েছে।

