পশুর হাটের কোলাহল আর শত শত মানুষের কৌতূহলী চোখের সামনে অবশেষে চূড়ান্ত হলো তার গন্তব্য। পটুয়াখালীর মাঠঘাট পেরিয়ে রাজধানীর রাজপথে আসা সেই বিশালাকার কৃষ্ণবর্ণের ষাঁড়টি এখন নতুন মালিকের জিম্মায়। গত বছর দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনের এক শীর্ষ ব্যক্তিত্বের হাত ছুঁয়ে আসা এই পশুটিকে ঘিরে সাধারণ মানুষের আগ্রহের কমতি ছিল না একটুও। দামের অঙ্কে কিংবা ওজনের ভারে, সব দিক থেকেই সে নিজেকে প্রমাণ করেছে হাটের সেরা আকর্ষণ হিসেবে।
শনিবার (২৪ মে) রাতে রাজধানীর উত্তরা দিয়াবাড়ি পশুর হাটে দেখা গেল এক ভিন্ন রকমের চাঞ্চল্য। ক্ষণে ক্ষণে ক্রেতাদের ভিড় আর দরদামের টানাপোড়েন শেষে ২০ লাখ টাকায় বিক্রি হলো আলোচিত সেই ষাঁড় ‘কালো মানিক’। পটুয়াখালীর এক সাধারণ কৃষকের গোয়ালে বেড়ে ওঠা এই পশুটির পরিচয় কেবল তার বিশাল দেহের মাঝেই সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দেশের এক সাবেক প্রধানমন্ত্রীর নাম এবং একটি পরিবারের আবেগ-অনুভূতির গল্প।
কালো মানিকের এই চড়া মূল্যে বিক্রি হওয়ার খবরটি দ্রুতই ছড়িয়ে পড়ে হাটের ভেতরে ও বাইরে। সিলেটের ব্যবসায়ী ফাহিম আহমেদ অনেক যাচাই-বাছাইয়ের পর শেষ পর্যন্ত এই বিশালদেহী পশুটিকে নিজের কোরবানির জন্য বেছে নেন। যদিও বিক্রির শুরুতে খামারি এর দাম হাঁকিয়েছিলেন ২২ লাখ টাকা। তবে বাজারের সার্বিক পরিস্থিতি এবং ক্রেতার আন্তরিকতায় দুই লাখ টাকা ছাড় দিয়েই চুক্তি সম্পন্ন করেন বিক্রেতা।
গোয়াল থেকে রাজপথ: কালো মানিকের ইতিহাস
সাত বছর আগের কথা। পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জ উপজেলার উত্তর ঝাঁটিবুনিয়া গ্রামের এক সাধারণ কৃষক সোহাগ মৃধা একটি ছোট বাছুর কিনেছিলেন। পরম মমতায় ও সম্পূর্ণ দেশীয় পদ্ধতিতে সেটিকে বড় করতে শুরু করেন তিনি ও তার স্ত্রী। দিন যত গড়িয়েছে, বাছুরটি তত বেশি খামারির পরিবারের সদস্য হয়ে উঠেছে। কালো কুচকুচে গায়ের রঙের কারণে আদর করে তার নাম রাখা হয়েছিল ‘কালো মানিক’।
বিগত বছরগুলোতে কালো মানিকের ওজন আর আকৃতি এতটাই বৃদ্ধি পায় যে, তা পুরো পটুয়াখালী জেলায় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। প্রায় ১৮০০ কেজি ওজনের এই বিশাল ষাঁড়টিকে একনজর দেখতে প্রতিদিন সোহাগ মৃধার বাড়িতে ভিড় জমাতেন দূর-দূরান্তের মানুষ। গ্রামীণ জনপদে সে হয়ে উঠেছিল এক জীবন্ত বিস্ময়। কিন্তু এই সাধারণ খামারের গল্পে এক নতুন মাত্রা যোগ হয় গত বছরের পবিত্র ঈদুল আজহায়।
কৃষক সোহাগ মৃধা তার প্রিয় কালো মানিককে বিএনপির প্রয়াত চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে উপহার হিসেবে উৎসর্গ করেছিলেন। উপহারের খবরটি যখন রাজনৈতিক মহলে পৌঁছায়, তখন তা বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করে। তবে সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী উপহারটি সাদরে গ্রহণ করলেও তা নিজের কাছে রাখেননি। গ্রামীণ খামারির দারিদ্র্য বিমোচন ও সচ্ছলতা ফেরানোর উদ্দেশ্যে তিনি গরুটি আবার সোহাগের পরিবারকেই উপহার হিসেবে ফেরত দেন।
উপহারের প্রতিদান ও খামারির স্বপ্ন
নেত্রীর হাত থেকে ফেরত পাওয়া সেই উপহারই এবার সোহাগের ভাগ্য বদলে বড় ভূমিকা রাখল। দিয়াবাড়ি হাটে বিক্রির পর খামারি সোহাগ মৃধার চোখে-মুখে এখন স্বস্তির আলো। ঢাকার এই পশুর হাটে আনার পর থেকেই কালো মানিককে ঘিরে সাধারণ মানুষের যে উন্মাদনা ছিল, তা তাকে বেশ আনন্দ দিয়েছে। হাজারো মানুষ মোবাইল ফোনে ছবি তুলেছেন, অনেকে সেলফি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করেছেন।
টাকা হাতে পেয়ে সোহাগ মৃধা তার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা গণমাধ্যমকে জানান। তিনি বলেন, “২০ লাখ টাকায় আমি আমার কালো মানিককে বিক্রি করতে পেরেছি। এই টাকা আমার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেবে। তবে আমার প্রথম কাজ হবে যে নেত্রী আমাকে এই গরু ফেরত দিয়ে সচ্ছলতার পথ দেখিয়েছেন, সেই বেগম খালেদা জিয়ার রুহের মাগফিরাত কামনায় বড় করে মিলাদ ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা।”
সোহাগের পরিকল্পনা কেবল ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। তিনি চান তার এই পশুপালনের অভিজ্ঞতাকে আরও বড় পরিসরে কাজে লাগাতে। মিলাদ ও দোয়ার খরচ বাদে বাকি যে টাকা থাকবে, তা দিয়ে গ্রামে একটি আধুনিক ও বৈজ্ঞানিক সুযোগ-সুবিধা সম্পন্ন গরুর ডেইরি ফার্ম গড়ে তুলতে চান তিনি। তার বিশ্বাস, এর মাধ্যমে তিনি নিজের পরিবারের স্থায়ী সচ্ছলতা নিশ্চিত করতে পারবেন।
সিলেটের নতুন ঠিকানায় কালো মানিক
হাটের এই সফল কেনাবেচায় ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়ের মধ্যেই এক চমৎকার সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশ তৈরি হয়েছে। ক্রেতা ফাহিম আহমেদ শুধু গরুই কেনেননি, বরং পটুয়াখালীর এই প্রান্তিক কৃষক পরিবারকে সম্মান জানাতেও কার্পণ্য করেননি। তিনি খামারি সোহাগ মৃধা ও তার পুরো পরিবারকে সিলেটে তার গ্রামের বাড়িতে বেড়ানোর আমন্ত্রণ জানিয়েছেন।
কৃষক সোহাগ জানান, “যিনি গরুটি কিনেছেন, তিনিও খুব ভালো মানুষ। তিনি এত বড় গরু যত্ন সহকারে নিয়ে যাওয়ার সব ব্যবস্থা করেছেন। আমাদের ওপর খুশি হয়ে তিনি সপরিবারে সিলেটে দাওয়াত দিয়েছেন। আমরা এখন তার আতিথেয়তায় সিলেটেই অবস্থান করছি। গ্রামীণ একজন কৃষকের জন্য এটি এক বিশাল পাওয়া।”
কালো মানিকের চলে যাওয়া নিয়ে খামারি পরিবারের ভেতরে এক ধরনের মিশ্র অনুভূতি কাজ করছে। দীর্ঘ সাতটি বছর ধরে প্রতিদিন যার পেছনে সকাল-সন্ধ্যা শ্রম দিতে হয়েছে, তাকে হুট করে চোখের আড়াল করা সহজ নয়। হাটের এক কোণে দাঁড়িয়ে যখন ট্রাকের ওপর কালো মানিককে তোলা হচ্ছিল, তখন এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
সুলতানা বেগমের মায়া ও বাস্তবতার জয়
সোহাগ মৃধার স্ত্রী সুলতানা বেগম পুরো প্রক্রিয়ায় স্বামীর পাশে ছায়ার মতো ছিলেন। কালো মানিকের পেছনে তার অবদানও কম নয়। নিজের সন্তানের মতো করে খড় কাটা, গোসল করানো আর মশা-মাছির হাত থেকে বাঁচাতে দিনরাত পরিশ্রম করেছেন তিনি। গরুটি বিক্রি হয়ে যাওয়ার পর তার কণ্ঠে কিছুটা মন খারাপের সুর শোনা গেল।
সুলতানা বেগম বলেন, “এতগুলো বছর ধরে দিন-রাত চোখে চোখে রেখে ওরে আমরা বড় করেছি। ঘরের ছায়ায় লালন-পালন করা জিনিস যখন চলে যায়, তখন বুকটা একটু খালি লাগেই। খারাপ তো অবশ্যই লাগছে। তবে আমরা যে ভালো দাম পেয়েছি, এটাই আমাদের সান্ত্বনা। এই টাকা দিয়ে আমরা এখন ভালোভাবে দিনযাপন করতে পারব, ধারদেনা শোধ করতে পারব।”
পশুর হাটের সাধারণ ক্রেতারা বলছেন, ঈদুল আজহার এই বাজারে যেখানে অনেক বড় গরুর বিক্রেতারা কাঙ্ক্ষিত দাম না পেয়ে হতাশ হয়ে ফিরে যাচ্ছেন, সেখানে কালো মানিকের ২০ লাখ টাকায় বিক্রি হওয়াটা বেশ ইতিবাচক। এটি প্রমাণ করে যে, পশুর জাত এবং তার পেছনের ইতিহাস যদি আকর্ষণীয় হয়, তবে বাজারে মন্দা থাকলেও সঠিক ক্রেতা মিলবেই।
কোরবানির বাজারে ইতিহাসের প্রভাব
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এবারের কোরবানির বাজারে বড় পশুর চাহিদা কিছুটা সীমিত হলেও ‘কালো মানিক’ তার রাজনৈতিক ও আবেগময় ইতিহাসের কারণে শুরু থেকেই সুবিধাজনক অবস্থানে ছিল। বেগম খালেদা জিয়ার নাম জড়িয়ে থাকার কারণে বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মী ও সমর্থকদের মধ্যেও এই গরুটি নিয়ে আলাদা একটি আগ্রহ কাজ করছিল। দিয়াবাড়ি হাটে এটি এক ধরনের ব্র্যান্ড ভ্যালু তৈরি করেছিল।
উত্তরা দিয়াবাড়ি পশুর হাটের ইজারাদার কর্তৃপক্ষ জানায়, এবারের হাটে আসা অন্যতম সেরা এবং ওজস্বী পশুর তালিকায় কালো মানিক ছিল শীর্ষ সারিতে। এর বিক্রি সম্পন্ন হওয়ার পর হাটের অন্য বড় খামারিদের মধ্যেও এক ধরনের উদ্দীপনা দেখা দিয়েছে। অনেকেই আশা করছেন, ঈদের শেষ দুই দিনে বাকি বড় পশুগুলোও ভালো দামে বিক্রি হয়ে যাবে।
কালো মানিক হয়তো এখন ঢাকার হাট ছেড়ে সিলেটের কোনো এক সবুজ খামারে ঈদের সকালের জন্য অপেক্ষা করছে। কিন্তু পটুয়াখালীর উত্তর ঝাঁটিবুনিয়া গ্রামে তার রেখে যাওয়া স্মৃতি আর এক সাধারণ কৃষকের ভাগ্য বদলের গল্প দীর্ঘদিন মানুষের মুখে মুখে ফিরবে। উপহারের গরু কীভাবে একটি পরিবারের স্বপ্ন পূরণের হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে, কালো মানিক তারই এক অনন্য উদাহরণ হয়ে রইল ২০blank সালের এই কোরবানির ঈদে।

