ঈদুল আজহার ছুটির আমেজ শুরু হতেই দেশের উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলের প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত গাজীপুরের মহাসড়কগুলোতে যানবাহনের চাকা থমকে গেছে। শিল্পনগরে অবস্থিত কারখানাগুলোর বড় অংশ ছুটি হওয়ার পরপরই ঘরের টানে বের হওয়া মানুষের ঢল নেমেছে চন্দ্রা ত্রিমোড় এলাকায়।
অতিরিক্ত যানবাহনের চাপ এবং মহাসড়কের ওপর যত্রতত্র গাড়ি থামিয়ে যাত্রী তোলার কারণে ঢাকা-টাঙ্গাইল ও চন্দ্রা-নবীনগর মহাসড়কে সৃষ্টি হয়েছে তীব্র যানজট। দুই মহাসড়ক মিলিয়ে প্রায় ১৫ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে এখন থমকে আছে শত শত যাত্রীবাহী বাস, মিনিবাস ও দূরপাল্লার পরিবহন।
সোমবার (২৫ মে) দুপুরের পর থেকে শুরু হওয়া এই যানজট বিকেলের দিকে আরও ঘনীভূত রূপ নেয়। এর ওপর যোগ হয়েছে মে মাসের গুমোট আবহাওয়ার মাঝে থেমে থেমে আসা গুড়িগুড়ি বৃষ্টি। কাদা, জল আর দীর্ঘ প্রতীক্ষায় মহাসড়কেই আটকে আছে হাজারো মানুষের ঈদের আনন্দ।
চন্দ্রা ত্রিমোড়কে কেন্দ্র করে স্থবিরতা
বিকেল চারটার দিকে সরেজমিনে চন্দ্রা ত্রিমোড় এলাকা ঘুরে দেখা যায়, উত্তরবঙ্গগামী লেনে যানবাহনের সারি মাইলের পর মাইল ছাড়িয়ে গেছে। ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের সফিপুর এলাকা থেকে শুরু করে চন্দ্রা উড়াল সড়ক পর্যন্ত কোনো গাড়িই সহজে নড়তে পারছে না।
একই চিত্র দেখা গেছে চন্দ্রা-নবীনগর সড়কেও। ঢাকার সাভার ও নবীনগর থেকে ছেড়ে আসা উত্তরবঙ্গগামী দূরপাল্লার বাসগুলো কবিরপুর এলাকাতেই আটকে পড়েছে। কবিরপুর থেকে চন্দ্রা ত্রিমোড় পর্যন্ত সড়কে সৃষ্টি হয়েছে এক বিশাল জটলা, যা ভাঙার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।
কারখানা শ্রমিকদের বড় অংশ দুপুরের পর একযোগে মহাসড়কে নেমে আসায় গণপরিবহনের সংকট দেখা দিয়েছে। বাসে সিট না পেয়ে অনেকেই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ট্রাক, পিকআপ ভ্যান কিংবা দূরপাল্লার বাসের ছাদে চড়ে বসার চেষ্টা করছেন। এতে উসকে উঠছে সড়কের বিশৃঙ্খলা।
মহাসড়কে শত শৃঙ্খলার চেষ্টা, তবুও পুলিশ অসহায়
এদিকে মহাসড়কের এই তীব্র যানজট নিরসন এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ব্যাপক তৎপরতা চোখে পড়েছে। চন্দ্রা ত্রিমোড় ও এর আশপাশের সংযোগ সড়কগুলোতে হাইওয়ে এবং জেলা ট্রাফিক পুলিশের শতাধিক সদস্যকে লাঠি হাতে টহল দিতে দেখা গেছে।
পুলিশের পক্ষ থেকে হ্যান্ডমাইকে অনবরত ঘোষণা দিয়ে চালকদের নির্দিষ্ট লেনে গাড়ি চালানোর তাগিদ দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু চন্দ্রার মূল গোলচত্বর এলাকায় গাড়ির গতি কমে যাওয়ায় পিছনের দিকে যানজটের দৈর্ঘ্য প্রতি মুহূর্তেই জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
মাঠের ট্রাফিক কর্মকর্তারা জানান, সোমবার গাজীপুরের প্রায় ৪০ শতাংশ পোশাক ও শিল্প কারখানা একযোগে ছুটি ঘোষণা করেছে। লাখ লাখ শ্রমিক একসঙ্গে রাস্তায় নামার কারণে সড়কের ধারণক্ষমতার চেয়ে গাড়ির সংখ্যা বহুগুণ বেড়ে গেছে, যা সামলানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
কাদার ভেতর বাসের চালকদের ক্ষোভ
ভোগান্তির শিকার কেবল সাধারণ যাত্রীরাই নন, ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্টিয়ারিং ধরে বসে থাকা বাসচালকেরাও পড়েছেন চরম মানসিক ও শারীরিক চাপে। সড়কের এই অচলাবস্থার জন্য তারা একে অপরের অনিয়ম এবং অব্যবস্থাপনাকেই প্রধান কারণ হিসেবে দায়ী করছেন।
ঢাকা থেকে ছাড়ে যাওয়া জেনিন পরিবহনের চালক আমজাদ সরদার জানান, অন্য সময়ে যে রাস্তা পার হতে মাত্র কয়েক মিনিট লাগে, আজ সেখানে তার চিরদিনের চেনা রুটই যেন অচেনা ঠেকছে। জিরানী থেকে মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরের চন্দ্রা স্টেশনে পৌঁছাতে তার সময় লেগেছে প্রায় দেড় ঘণ্টা।
আমজাদ সরদার আক্ষেপ করে বলেন, “চন্দ্রা এলাকায় শত শত যাত্রীবাহী বাসের জটলা লেগে আছে। কোনো চালকই কোনো নিয়ম-কানুন মানছেন না। একদম সড়কের মাঝখানে হুট করে গাড়ি থামিয়ে যাত্রী তোলা হচ্ছে। এর ফলে পিছনের কোনো গাড়ি আর সরার জায়গা পাচ্ছে না।”
সন্ধ্যার পর পরিস্থিতি আরও অবনতির আশঙ্কা
সিরাজগঞ্জ রুটে চলাচলকারী সিরাজগঞ্জ পরিবহনের বাসচালক রফিকুল মিয়াও একই ধরণের বাস্তবতার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “আজ থেকে মূলত ঈদের আসল চাপ শুরু হলো। বিকেলের মধ্যেই যদি রাস্তার এই দশা হয়, তবে সন্ধ্যার পর যখন বাকি কারখানাগুলো ছুটি হবে, তখন পরিস্থিতি যে কী হবে তা ভাবলেই ভয় লাগছে।”
রফিকুল মিয়া নিজের পেশার মানুষের ভুল স্বীকার করে বলেন, “বিশেষ করে আমরা যারা চন্দ্রা এলাকায় যাত্রীর জন্য অপেক্ষা করি, আমাদের মধ্যে প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যায়। কেউই নিয়ম মেনে নির্দিষ্ট কাউন্টারে গাড়ি দাঁড়া করাই না। এই এক কিলোমিটারের প্রভাব পড়ে পেছনের ১০ কিলোমিটারে।”
সড়কে যানবাহনের এই মন্থর গতির কারণে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন নারী, শিশু ও প্রবীণ যাত্রীরা। অনেককে দীর্ঘ সময় বাসের ভেতর বসে থেকে ক্লান্ত হয়ে মহাসড়কের পাশে কাদার মধ্যেই দাঁড়িয়ে বাতাস খেতে দেখা গেছে। তীব্র গরমে শিশুদের কান্নার আওয়াজে চারপাশের পরিবেশ ভারী হয়ে উঠছে।
স্টেশনে দীর্ঘ প্রতীক্ষায় যাত্রীরা
মহাসড়কের পাশে এক ব্যাগ কাপড় আর কোলের শিশুকে নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন তোফাজ্জল হোসেন নামের এক পোশাক কর্মী। তিনি উত্তরবঙ্গের সিরাজগঞ্জ যাওয়ার জন্য চন্দ্রা কাউন্টারে অপেক্ষা করছেন। কিন্তু এক ঘণ্টারও বেশি সময় দাঁড়িয়ে থেকেও তিনি কোনো বাসের নাগাল পাননি।
তোফাজ্জল হোসেন বলেন, “আমার ছোট ভাই ঢাকা থেকে একটি বাসে করে আসছে। সেই গাড়িতেই আমারও ওঠার কথা রয়েছে। কিন্তু ভাই ফোনে জানাল, জ্যামের কারণে গাড়ি নবীনগর পার হতেই পারছে না। কখন গাড়ি আসবে আর কখন বাড়ি পৌঁছাব, আল্লাহই ভালো জানেন।”
পবিত্র ঈদুল আজহার এই আনন্দ যাত্রায় প্রতি বছরই ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক এমন ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তবে এবার কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে যানজটমুক্ত ঈদযাত্রার যে আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল, চন্দ্রার এই দুপুরের চিত্র তার উল্টো কথা বলছে।
নীরব স্বাস্থ্য ও হাইওয়ে প্রশাসন
মহাসড়কে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থাকা মানুষের এই সীমাহীন দুর্ভোগ এবং রাত বাড়ার সাথে সাথে যানজট পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে হাইওয়ে পুলিশের পরবর্তী কর্মপরিকল্পনা কী, তা জানতে প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়।
গাজীপুর রিজিয়নের নাওজোড় হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাউগাতুল আলমের সরকারি মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। পরবর্তীতে তথ্যের সত্যতা ও পুলিশের বক্তব্য জানতে তার ব্যবহৃত হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে লিখিত বার্তা পাঠানো হলেও তার কোনো উত্তর বা প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
নদী ও সড়ক যোগাযোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মে মাসের এই তীব্র গরম এবং বর্ষার শুরুতে যেকোনো সময় বড় ধরণের কালবৈশাখী ঝড় বা ভারী বৃষ্টিপাত হতে পারে। আবহাওয়ার এমন বৈরী পরিস্থিতিতে যদি মহাসড়কের ১৫ কিলোমিটার জ্যাম দ্রুত ছোট করা না যায়, তবে রাতের দিকে উত্তরের এই ঈদযাত্রা সম্পূর্ণ বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে। উত্তরবঙ্গের প্রায় ২৬টি জেলার মানুষের একমাত্র ভরসা এই রুটটি সচল রাখতে এখনই সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

