তপ্ত দুপুরের কড়া রোদ মাড়িয়ে পিচঢালা রাজপথে নেমে আসেন একদল বিক্ষুব্ধ মানুষ। কোনো স্লোগান নেই, নেই কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি। ক্ষোভের প্রকাশ হিসেবে তারা বেছে নিলেন অভিনব এক পন্থা। জনগুরুত্বপূর্ণ জামালপুর-টাঙ্গাইল মহাসড়কের ওপর স্ট্যাম্প গেঁড়ে শুরু হলো ক্রিকেট খেলা।
টানা উনিশ বছর ধরে জমে থাকা ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটল খেলার ছলে, যা রূপ নিল এক তীব্র নাগরিক আন্দোলনে। জামালপুর পৌর শহরের বাইপাস এলাকায় স্থানীয় বাসিন্দাদের এই মহাসড়ক অবরোধ কর্মসূচির কারণে টানা তিন ঘণ্টা স্থবির হয়ে রইল যান চলাচল।
সোমবার (২৫ মে) দুপুর ১টার দিকে শুরু হওয়া এই আকস্মিক অবরোধের জেরে মহাসড়কের দুই পাশে আটকা পড়ে শত শত যানবাহন। মে মাসের এই তীব্র গরমে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হওয়ায় চরম ভোগান্তিতে পড়েন ঢাকা থেকে আসা এবং ঢাকাগামী সাধারণ যাত্রীরা। পরে বিকেল ৩টার দিকে প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের আশ্বাসে স্থানীয়রা অবরোধ প্রত্যাহার করে নেন।
উনিশ বছরের জমাট বাঁধা ক্ষোভ
পৌরসভার দড়িপাড়া ও দাপুনিয়াসহ আশপাশের কয়েকটি এলাকার বাসিন্দাদের অভিযোগ, প্রায় দুই দশক ধরে তারা এক ভয়াবহ ও স্থায়ী জলাবদ্ধতা নিরসন সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। একটু বৃষ্টি হলেই তলিয়ে যায় বসতভিটা, রাস্তাঘাট আর শত শত একর ফসলি জমি।
স্থানীয়রা জানান, প্রতি বছরই বর্ষা মৌসুমে তাদের ঘরবাড়ির ভেতরে পানি ঢুকে পড়ে। নোংরা পানির কারণে চর্মরোগসহ বিভিন্ন পানিবাহিত রোগ এখন এই অঞ্চলের মানুষের নিত্যদিনের সঙ্গী। নষ্ট হচ্ছে কোটি কোটি টাকার ফসল, কিন্তু স্থায়ী ড্রেনেজ ব্যবস্থার কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেয়নি কর্তৃপক্ষ।
অবরোধকারীদের দাবি, রোববারও তারা একই দাবিতে রাস্তা বন্ধ করেছিলেন। তখন পৌরসভা ও পুলিশের কর্মকর্তারা এসে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে স্থায়ী ড্রেন নির্মাণের আশ্বাস দিয়েছিলেন। কিন্তু সোমবার সকাল গড়িয়ে দুপুর হলেও মাঠ পর্যায়ে কাজের কোনো লক্ষণ না দেখায় তারা দ্বিতীয় দিনের মতো রাস্তায় নামতে বাধ্য হন।
রাজপথে ক্রিকেট ও অচল মহাসড়ক
সোমবার দুপুরের দিকে বাইপাস মোড়ে লাঠিসোটা ও বাঁশ নিয়ে অবস্থান নেন কয়েকশ নারী-পুরুষ। যুবকেরা রাস্তার মাঝখানে উইকেট পুঁতে ক্রিকেট খেলা শুরু করলে মুহূর্তের মধ্যে বন্ধ হয়ে যায় সব ধরণের দূরপাল্লার ও লোকাল যানবাহন চলাচল।
ঈদুল আজহার এই মৌসুমে মহাসড়কে এমনিতেই গাড়ির চাপ বেশি। তার ওপর এই অবরোধের ফলে মাত্র এক ঘণ্টার মধ্যে যানজটের দৈর্ঘ্য কয়েক কিলোমিটার ছাড়িয়ে যায়। গণপরিবহনের ভেতরে থাকা নারী, শিশু ও বৃদ্ধ যাত্রীরা তীব্র গরমে হাঁসফাঁশ করতে থাকেন। অনেকেই নিরুপায় হয়ে বাস থেকে নেমে হেঁটেই গন্তব্যের দিকে রওনা হন।
ঢাকাগামী এক বাসযাত্রী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “এলাকাবাসীর দাবি যৌক্তিক হতে পারে, কিন্তু এভাবে হাজার হাজার মানুষকে জিম্মি করে রাস্তা বন্ধ করা কোনো সমাধান নয়। প্রশাসনের উদাসীনতার মাশুল দিতে হচ্ছে আমাদের মতো সাধারণ মানুষকে।”
প্রশাসনের দফায় দফায় বৈঠক ও আশ্বাস
পরিস্থিতি বেগতিক দেখে দুপুর আড়াইটার দিকে ঘটনাস্থলে ছুটে যান জামালপুর সদর থানা পুলিশ ও পৌরসভার প্রকৌশল বিভাগের একটি প্রতিনিধি দল। তারা উত্তেজিত আন্দোলনকারীদের সাথে রাস্তার ওপরেই এক উন্মুক্ত বৈঠকে বসেন।
অবরোধে অংশ নেওয়া স্থানীয় বাসিন্দা মো. ইসমাইল বলেন, “আমরা শখ করে রাস্তায় নামিনি। কালকে প্রশাসনের লোকজন এসে আমাদের বলেছিল আজকের মধ্যেই জলাবদ্ধতা নিরসন করা হবে। কিন্তু তারা কথা রাখেনি, তাই আমরা আবারও রাস্তা অবরোধ করতে বাধ্য হয়েছিলাম।”
তিনি আরও জানান, পরবর্তীতে পুলিশ ও পৌরসভার কর্মকর্তারা আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে তাৎক্ষণিকভাবে একটি অস্থায়ী ড্রেন নির্মাণের কাজ শুরু করার নির্দেশ দেন। একই সাথে একটি স্থায়ী বড় ড্রেন নির্মাণের লিখিত প্রতিশ্রুতি দিলে তারা বিকেল ৩টার দিকে অবরোধ তুলে নেন।
আইনি ও কারিগরি ব্যাখ্যা
এ বিষয়ে জানতে চাইলে জামালপুর পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী সোহেল মিয়া বলেন, “এলাকাবাসীর দীর্ঘদিনের সমস্যাটি আমরা গুরুত্বের সাথে দেখছি। কালকের পর আজও তারা রাস্তা অবরোধ করেছিল। আমরা তাদের সাথে দীর্ঘ সময় কথা বলেছি এবং তাদের বুঝিয়ে অবরোধ তুলে নিতে সক্ষম হয়েছি।”
পৌরসভা সূত্রে জানা গেছে, অপরিকল্পিতভাবে বাড়িঘর নির্মাণ এবং প্রাকৃতিক খালগুলো ভরাট হয়ে যাওয়ার কারণেই এই দীর্ঘমেয়াদী জলাবদ্ধতা নিরসন সম্ভব হচ্ছে না। তবে মেগা প্রকল্পের আওতায় এই বাইপাস এলাকায় একটি আধুনিক ড্রেনেজ নেটওয়ার্ক তৈরির পরিকল্পনা সরকারের বিবেচনাধীন রয়েছে।
জামালপুর সদর ও মহাসড়কের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলেন সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মিজানুর রহমান। তিনি জানান, জলাবদ্ধতা নিরসনের দাবিতে এলাকাবাসী দুই দিন ধরে সড়ক অবরোধ করে আসছিল, যা সাধারণ মানুষের চলাচলেই বিঘ্ন ঘটিয়েছে।
স্বাভাবিক গতিতে ফিরছে যান চলাচল
ওসি মিজানুর রহমান বলেন, “আজকে আমরা ঘটনাস্থলে গিয়ে পৌরসভার সাথে সমন্বয় করে তাদের একটি স্থায়ী ড্রেনের ব্যবস্থা করার সুনির্দিষ্ট আশ্বাস দিয়েছি। এরপর এলাকাবাসী শান্ত হয়ে অবরোধ প্রত্যাহার করে নেয়। বর্তমানে মহাসড়কে যান চলাচল সম্পূর্ণ স্বাভাবিক রয়েছে।”
অবরোধ তুলে নেওয়ার পর পুলিশ সদস্যরা দ্রুত মাঠে নেমে ধীরগতিতে থাকা গাড়িগুলোকে সারিবদ্ধভাবে পার করে দেওয়ার কাজ শুরু করেন। বিকেল ৪টার দিকে এই রুটের ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক আবার তার চেনা ছন্দে ফিরে আসে এবং যানজট পুরোপুরি কেটে যায়।
তবে স্থানীয় বাসিন্দারা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, এবারও যদি প্রশাসনের এই আশ্বাস কেবল কাগজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, তবে আগামীতে আরও বড় ধরণের কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে। উনিশ বছরের এই বঞ্চনার অবসান না হওয়া পর্যন্ত তারা ঘরে ফিরবেন না।

