গত ২৮শে ফেব্রুয়ারি যখন মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের দামামা বেজে উঠেছিল, তখন অনেক সামরিক বিশ্লেষকই ধারণা করেছিলেন যে মার্কিন ও ইসরায়েলি বিমানশক্তির সামনে ইরান হয়তো খুব বেশি দিন টিকতে পারবে না। কিন্তু টানা কয়েক সপ্তাহের রক্তক্ষয়ী সংঘাত শেষে আজ যখন বিশ্বজুড়ে আলোচনার টেবিলে সমাধানের পথ খোঁজা হচ্ছে, তখন একটি সত্য সবার সামনে স্পষ্ট— ইরান কোনো ‘কাগুজে বাঘ’ নয়।
সম্প্রতি ‘নিউ আরব’ ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক নিবন্ধে মধ্যপ্রাচ্যের এই পরিবর্তিত পরিস্থিতির চুলচেরা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, এই যুদ্ধের ফলে ইরানের অবকাঠামো এবং অর্থনীতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও দেশটি যেভাবে টিকে আছে, তা অনেক সামরিক পর্যবেক্ষকের পূর্বানুমানকে ভুল প্রমাণ করেছে। তেহরান তার সামরিক সক্ষমতা এবং কৌশলগত ধৈর্য দিয়ে প্রমাণ করেছে যে, চরম সংকটেও তারা বড় শক্তির মুখোমুখি হওয়ার ক্ষমতা রাখে।
বর্তমানে পাকিস্তান ও ওমানের মধ্যস্থতায় যে যুদ্ধবিরতি চলছে, তার ভবিষ্যৎ নিয়ে অবশ্য গভীর সংশয় রয়েছে। ওয়াশিংটন ও তেহরান কি একটি স্থায়ী শান্তির পথে হাঁটছে, নাকি এটি কেবল আরও বড় কোনো ঝড়ের আগের নিস্তব্ধতা— তা নিয়ে বিশ্লেষকরা দ্বিধাবিভক্ত। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালীতে ইরানের নতুন করে জারি করা অবরোধ এবং দেশটির বন্দরগুলোতে মার্কিন নৌ-অবরোধ পরিস্থিতিকে দিন দিন আরও জটিল করে তুলছে।
যুদ্ধের খতিয়ান বলছে, গত কয়েক সপ্তাহে ইরান কয়েক দশকের অর্জিত অনেক সম্পদ হারিয়েছে। মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলায় দেশটির গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো, তেল শোধনাগার এবং প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এক হাজারেরও বেশি প্রাণহানি এবং অর্থনীতির চাকা থমকে যাওয়া সত্ত্বেও ইরান যেভাবে পাল্টা আঘাত হেনেছে, তা আন্তর্জাতিক মহলে বিস্ময় জাগিয়েছে। ইসরায়েলের হাইফা ও তেল আবিবের সামরিক ঘাঁটিগুলোতে তেহরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা প্রমাণ করেছে যে, আঘাত সইবার পাশাপাশি তারা আঘাত করার ক্ষমতাও সমানভাবে ধরে রেখেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই যুদ্ধ যখনই থামুক না কেন, তা একটি ‘পরিবর্তিত মধ্যপ্রাচ্য’ রেখে যাবে। আগে যেখানে ইরানকে কেবল আঞ্চলিক শক্তির আধারে দেখা হতো, এখন সেখানে তাদের একটি অপ্রতিরোধ্য পক্ষ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। তেহরানের এই ‘দৃঢ়তা’ কেবল সামরিক অস্ত্রের জোরে নয়, বরং তাদের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানের কারণেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হরমুজ প্রণালীর চাবিকাঠি হাতে থাকায় তারা বিশ্ব বাণিজ্যকে যেকোনো সময় স্থবির করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।
তবে এই ধ্বংসাত্মক যুদ্ধের পর ইরান তার অর্থনীতিকে কীভাবে পুনর্গঠন করবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। কয়েক সপ্তাহের যুদ্ধ কয়েক বছরের উন্নয়নকে পিছিয়ে দিয়েছে। তা সত্ত্বেও ইরানের সামরিক কমান্ডারদের দাবি, তারা এই যুদ্ধের মাধ্যমে নিজেদের সক্ষমতার পরীক্ষা দিতে পেরেছেন এবং শত্রুপক্ষকে বুঝিয়ে দিয়েছেন যে পারস্য উপসাগরে তাদের আধিপত্য খর্ব করা সহজ হবে না।
আপাতত ইসলামাবাদে হতে যাওয়া ২০ এপ্রিলের দ্বিতীয় দফা সংলাপের দিকেই সবার চোখ। ডোনাল্ড ট্রাম্পের ২২ এপ্রিলের সময়সীমা শেষ হওয়ার আগে যদি কোনো টেকসই চুক্তি না হয়, তবে এই ‘ভঙ্গুর শান্তি’ খুব দ্রুতই আবার যুদ্ধে রূপ নিতে পারে। বিশ্ব রাজনীতিতে এখন এক অদ্ভুত অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে— যেখানে একদিকে রয়েছে কূটনৈতিক আলোচনার টেবিলে হাসিমুখের চেষ্টা, আর অন্যদিকে রয়েছে সমুদ্রসীমায় যুদ্ধজাহাজের রণসজ্জা।
মধ্যপ্রাচ্যের এই পরিবর্তিত সমীকরণে ইরান নিজেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় হিসেবে পুনরায় প্রতিষ্ঠিত করেছে। তারা বুঝিয়ে দিয়েছে যে, কেবল অবরোধ বা বিমান হামলা দিয়ে তাদের পুরোপুরি স্তব্ধ করা সম্ভব নয়। এখন দেখার বিষয়, ওয়াশিংটন তেহরানের এই নতুন রূপকে মেনে নিয়ে কোনো বাস্তবসম্মত চুক্তিতে আসে কি না, নাকি মধ্যপ্রাচ্য আরও এক দীর্ঘস্থায়ী ও বিধ্বংসী সংঘাতের পথে পা বাড়ায়।

