কোরবানির ঈদের বাকি আর মাত্র কিছুদিন। এই সময়ে বাংলাদেশের পশুর হাট ও খামারগুলোতে বিচিত্র সব নামের পশু নিয়ে আলোচনা নতুন কিছু নয়। তবে এবার নারায়ণগঞ্জের একটি খামারে থাকা বিশেষ এক মহিষকে নিয়ে যে উন্মাদনা তৈরি হয়েছে, তা রীতিমতো নজিরবিহীন।
যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নাম অনুসারে বাংলাদেশে একটি মহিষের নামকরণ করা হয়েছে। এরপর থেকেই এটি দেশের অন্যতম আলোচিত বিষয়ে পরিণত হয়। তবে এই আলোচনা এখন আর কেবল দেশের গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, তা ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বের নানা প্রান্তে।
সোশ্যাল মিডিয়ার দেওয়াল পেরিয়ে আন্তর্জাতিক মূল ধারার গণমাধ্যমগুলোতেও এখন জায়গা করে নিয়েছে বাংলাদেশের এই ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’ মহিষ। বিশেষ করে প্রতিবেশী দেশ ভারত ও পাকিস্তানে এই মহিষটিকে নিয়ে তৈরি হওয়া খবর এবং ভিডিও ক্লিপগুলো ব্যাপক ভাইরাল হয়েছে।
কেবল দক্ষিণ এশিয়াই নয়, দূরপ্রাচ্য থেকে শুরু করে মধ্যপ্রাচ্য এবং পশ্চিমা বিশ্বের সংবাদমাধ্যমগুলোও এই খবর বেশ গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, থাইল্যান্ড, জর্ডান এবং যুক্তরাজ্যের মতো দেশের প্রভাবশালী সব সংবাদ আউটলেট।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট’ তাদের এক বিশেষ প্রতিবেদনে শিরোনাম করেছে, “বাংলাদেশে ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু মহিষ দেখতে মানুষের ভিড়।” তাদের এই প্রতিবেদনে বাংলাদেশের কোরবানির হাটের ঐতিহ্য এবং পশু নিয়ে মানুষের আবেগ ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
অন্যদিকে থাইল্যান্ডের জনপ্রিয় দৈনিক ‘ব্যাংকক পোস্ট’ তাদের আন্তর্জাতিক পাতায় লিখেছে, “বাংলাদেশে ডোনাল্ড ট্রাম্প নামের মহিষ ভাইরাল।” দূরপ্রাচ্যের এই দেশটির পাঠকদের কাছেও বাংলাদেশের এই খবরটি বেশ সাড়া জাগিয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের দেশ জর্ডানের অন্যতম প্রধান সংবাদমাধ্যম ‘রয়া নিউজ’ তাদের প্রতিবেদনে ভিন্ন এক কোণ থেকে বিষয়টি তুলে ধরেছে। তারা তাদের শিরোনামে লিখেছে, “বাংলাদেশে ডোনাল্ড ট্রাম্প নামের মহিষ নজর কেড়েছে সবার।”
যুক্তরাষ্ট্রের মূল ধারার সংবাদ সংগ্রাহক প্ল্যাটফর্ম ‘এমএসএন’ তাদের শিরোনামে লিখেছে, “বাংলাদেশে ডোনাল্ড ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর মতো দেখতে মহিষ নজর কেড়েছে সবার।” খোদ আমেরিকার মানুষের কাছেও তাদের সাবেক প্রেসিডেন্টের নামের এই মহিষটি বেশ কৌতূহল তৈরি করেছে।
দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম প্রভাবশালী ও বৃহৎ সংবাদমাধ্যম ভারতের ‘দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়া’ এই বিষয়ে একটি বিশেষ ফিচার প্রকাশ করেছে। তারা লিখেছে, “ঈদের আগে নেট দুনিয়ায় আলোড়ন তুলেছে বাংলাদেশের ডোনাল্ড ট্রাম্প নামের মহিষ।”
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, সাধারণ একটি পশুকে ঘিরে কেন বিশ্বজুড়ে এত বড় আলোড়ন তৈরি হলো? কেন এই ডোনাল্ড ট্রাম্প মহিষ রাতারাতি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের শিরোনামে চলে এলো? এর পেছনে রয়েছে মহিষটির অদ্ভুত শারীরিক গঠন এবং এর নামকরণের পেছনের গল্প।
খামার কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, প্রায় ৭০০ কেজি ওজনের এই মহিষটি সাধারণ কোনো জাতের নয়, এটি বিরল এলবিনো জাতের মহিষ। তবে শুধু এর বিশাল আকৃতির ওজন বা নামের কারণেই এটি এত মানুষের নজর কাড়েনি, এর পেছনে রয়েছে এক অদ্ভুত দৃশ্যমান সাদৃশ্য।
সরেজমিনে দেখা গেছে, এই মহিষটির মাথার সামনের দিকে রয়েছে একগুচ্ছ লম্বা লালচে-সোনালি রঙের চুল। আর এই চুলের ধরণ এবং স্টাইলটিই অবিকল যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিখ্যাত চুলের স্টাইলের কথা মনে করিয়ে দেয়।
সোনালি চুলের সেই অদ্ভুত মিল থেকেই খামার কর্তৃপক্ষ আদর করে এই বিরল পশুর নাম দিয়েছে ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’। আর এই নামের কারণেই মহিষটি সাধারণ মানুষের কাছে এক বিশাল আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
নারায়ণগঞ্জ শহরের পাইকপাড়া এলাকার ‘রাবেয়া অ্যাগ্রো ফার্ম’ নামের একটি বেসরকারি খামারে এই মহিষটিকে লালন-পালন করা হচ্ছে। খামারে আসার পর থেকেই মহিষটি স্থানীয় সাধারণ মানুষের নজরে আসে এবং দ্রুতই তা ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়ে।
এখন প্রতিদিন সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত রাবেয়া অ্যাগ্রো ফার্মে উৎসুক মানুষের ভিড় জমছে। কেবল নারায়ণগঞ্জ বা ঢাকা নয়, দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ আসছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প নামের এই মহিষটিকে এক নজর চোখের দেখা দেখতে।
দর্শনার্থীদের অনেকে এসে মহিষটির সাথে সেলফি তুলছেন, আবার কেউ কেউ ভিডিও করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করছেন। খামারের কর্মচারীরা জানান, মানুষের সামলাতে তাদের রীতিমতো হিমশিম খেতে হচ্ছে।
খামারের মালিক জানান, তারা কেবল শখের বশেই এই এলবিনো জাতের মহিষটি এনেছিলেন। কিন্তু এর মাথার চুল এবং গায়ের রঙের কারণে যখন সবাই একে ট্রাম্পের সাথে তুলনা করতে শুরু করে, তখন তারা আনুষ্ঠানিকভাবেই এই নামকরণ করেন।
একই খামারে আরেকটি মহিষের নাম রাখা হয়েছে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর নাম অনুসারে ‘নেতানিয়াহু’। তবে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে ডোনাল্ড ট্রাম্প মহিষটিকে নিয়েই আলোচনা এবং কৌতূহল সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, পশ্চিমা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের নামের সাথে মিলিয়ে পশুর নামকরণ এবং তা নিয়ে মানুষের এই তুমুল কৌতূহল এক ধরণের লোকজ বিনোদন বা ব্যাঙ্গাত্মক সংস্কৃতির অংশ। যা বিশ্ব মিডিয়াকে বেশ আকর্ষণ করেছে।
কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে বাংলাদেশের পশু খামারিরা প্রায়শই তাদের সবচেয়ে বড় বা আকর্ষণীয় পশুর বিভিন্ন সেলিব্রেটির নামে নামকরণ করে থাকেন। এর আগে ‘জায়েদ খান’, ‘পাঠান’ বা ‘টাইগার’ নামের গরু-মহিষ বেশ পরিচিতি পেয়েছিল।
তবে এবারকার এই ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’ মহিষ পূর্বের সব রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে। দেশের সীমানা পেরিয়ে যেভাবে বৈশ্বিক সংবাদমাধ্যমে এই পশুর গল্প জায়গা করে নিয়েছে, তা বাংলাদেশের পশুর হাটের ইতিহাসে বেশ বিরল একটি ঘটনা।
খামার কর্তৃপক্ষ আশা করছেন, এই আন্তর্জাতিক প্রচারের কারণে তাদের মহিষটি বেশ ভালো দামে বিক্রি হবে। ইতিমধ্যেই দেশের বড় বড় ব্যবসায়ী এবং সৌখিন ক্রেতারা মহিষটি কেনার জন্য খামারে যোগাযোগ শুরু করেছেন।
তবে সাধারণ মানুষের কাছে বিক্রির চেয়েও বড় বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে মহিষটির রূপ। সোনালি চুলের এই মহিষটি দেখতে আসা এক দর্শনার্থী জানান, “ফেসবুকে ভিডিও দেখে বিশ্বাস করতে পারিনি, তাই সরাসরি দেখতে এলাম। আসলেই এর চুলগুলো দেখতে ট্রাম্পের মতোই।”
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষ এখন ইন্টারনেটে সার্চ করে বাংলাদেশের এই ভাইরাল মহিষের খবর পড়ছেন। একটি সাধারণ খামারের পশু কীভাবে আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতির শীর্ষ নেতাদের নামের কল্যাণে বিশ্বমঞ্চে জায়গা করে নিল, তা সত্যিই এক অদ্ভুত সামাজিক বাস্তবতার বহিঃপ্রকাশ।

