ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলের চালানো সামরিক অভিযানকে ‘গণহত্যা’ আখ্যা দিয়ে বিশ্বজুড়ে যখন তীব্র নিন্দা চলছে, ঠিক তখনই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরার মাসব্যাপী এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, জাতিসংঘের সর্বোচ্চ আদালত ‘আন্তর্জাতিক বিচার আদালত’ (আইসিজে) গাজায় গণহত্যার বাস্তব ঝুঁকি রয়েছে বলে সতর্ক করার পরও অন্তত ৫১টি দেশ ও স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল থেকে উৎপাদিত সামরিক সরঞ্জাম ইসরায়েলে প্রবেশ অব্যাহত ছিল।
২০২২ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যকার ইসরায়েলি কর কর্তৃপক্ষের (আইটিএ) আমদানি তথ্যের বিশদ বিশ্লেষণের ওপর ভিত্তি করে এই অনুসন্ধানটি চালানো হয়েছে। শুল্ক রেকর্ড ও তথ্য অধিকার আইনের আওতায় পাওয়া তথ্যের সাহায্যে তৈরি এই প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ইউরোপ, এশিয়া, উত্তর আমেরিকা ও দক্ষিণ আমেরিকার একাধিক দেশ এই সামরিক সরবরাহ শৃঙ্খলের সাথে যুক্ত, যাদের অনেকেই আবার আন্তর্জাতিক গণহত্যা কনভেনশনে স্বাক্ষরকারী দেশ।
আইসিজের নির্দেশ ও পরবর্তী ২২ মাসের বাস্তবতা
২০২৪ সালের জানুয়ারিতে দক্ষিণ আফ্রিকার আবেদনের প্রেক্ষিতে আইসিজে রায় দিয়েছিল যে, গাজায় গণহত্যার একটি বাস্তব ঝুঁকি রয়েছে এবং তা প্রতিরোধে সাময়িক পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। আদালত গণহত্যা কনভেনশনের পক্ষভুক্ত ১৫৩টি দেশের সবকটিকে তাদের আইনি দায়িত্বের কথা মনে করিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু বাস্তবতা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। পরবর্তী ২২ মাস ধরে হত্যাকাণ্ড চলতেই থাকে এবং ২০২৫ সালের অক্টোবরে যখন একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি অর্জিত হয়, ততদিনে ৭০ হাজারের বেশি মানুষ নিহত এবং ১ লাখ ৭১ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি আহত হন।
লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিক্সের আন্তর্জাতিক আইনের অধ্যাপক স্টিফেন হামফ্রেস এই প্রসঙ্গে বলেন, “রায়ের আগেই প্রচুর প্রমাণ ছিল যে ইসরায়েলকে অস্ত্র সরবরাহকারী দেশগুলো যুদ্ধাপরাধ এবং মানবতাবিরোধী অপরাধসহ আন্তর্জাতিক অপরাধে জড়িত থাকতে পারে।” আইনি বিশেষজ্ঞদের মতে, আদালতের রায়ের পরও যেসব দেশের সরকার ইসরায়েলকে অস্ত্র দেওয়া অব্যাহত রেখেছে, তারা আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী গণহত্যায় সহযোগিতার জন্য দায়ী হতে পারে।
শীর্ষ পাঁচ অস্ত্র সরবরাহকারী দেশ
আল-জাজিরার অনুসন্ধানে ইসরায়েলে সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহে শীর্ষ পাঁচটি উৎস দেশ শনাক্ত করা হয়েছে। এই তালিকায় রয়েছে:
-
যুক্তরাষ্ট্র (মোট ঘোষিত মূল্যের ৪২ শতাংশের জন্য দায়ী)
-
ভারত (মোট অস্ত্রের প্রায় ২৬ শতাংশের জোগানদাতা)
-
রোমানিয়া (৮ শতাংশ)
-
তাইওয়ান (৪ শতাংশ)
-
চেক প্রজাতন্ত্র (৩ শতাংশ)
আইটিএর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের অক্টোবরের মধ্যে সামরিক সরঞ্জামবাহী ২,৬০৩টি চালান ইসরায়েলে প্রবেশ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে গোলাবারুদ, বিস্ফোরক যুদ্ধাস্ত্র, অস্ত্রের অংশ এবং সাঁজোয়া যানের যন্ত্রাংশ। এই আমদানির মোট মূল্য ছিল ৩.২২ বিলিয়ন ইসরায়েলি শেকেল (প্রায় ৮৮৫.৬ মিলিয়ন ডলার), যার ৯১ শতাংশ মূল্যই রেকর্ড করা হয়েছে আইসিজের রায়ের পর।
ভারতীয় শুল্ক নথি ও গোপন চালানের তথ্য
অনুসন্ধানে ২০৪টি অস্ত্র-সম্পর্কিত চালানের ভারতীয় শুল্ক রপ্তানি নথি পাওয়া গেছে, যা ২০২৪ সালে ইসরায়েলে পাঠানো হয়েছিল ‘৯৩০৬৯০০০’ শুল্ক কোডের অধীনে। এই কোডটি মূলত “বোমা, গ্রেনেড, টর্পেডো, মাইন, মিসাইল এবং অনুরূপ যুদ্ধাস্ত্র” নির্দেশ করে।
নথিতে দেখা যায়, ভারতের ‘কল্যাণী রাফায়েল অ্যাডভান্সড সিস্টেমস’ (কেআরএএস) নামক যৌথ উদ্যোগটি ইসরায়েলের রাফায়েল অ্যাডভান্সড ডিফেন্স সিস্টেমসের কাছে ‘হেভি ফ্রাগ উপাদান’ হিসেবে বর্ণিত মোট ৫ লাখ ৫৪ হাজার ১২০টি ইউনিট রপ্তানি করেছে। এ ছাড়া আরেকটি ভারতীয় সংস্থা আইএমআই সিস্টেমসের কাছে ১৫৫ মিলিমিটার প্রজেক্টাইল বডি (কামানের গোলার মূল কাঠামো) সরবরাহ করেছে। এই বিষয়ে মন্তব্য জানতে ভারতের ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তাদের কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
মুখে নিষেধাজ্ঞা, অন্তরালে ভিন্ন চিত্র
কিছু দেশের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, তারা আনুষ্ঠানিকভাবে ইসরায়েলের ওপর অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা জারি বা আংশিক স্থগিত করলেও শুল্ক রেকর্ড বলছে ভিন্ন কথা। চীনের মতো দেশ, যারা জনসমক্ষে আইসিজের নির্দেশকে সমর্থন করেছিল, তাদের উৎপাদিত ৭১.১ মিলিয়ন শেকেল মূল্যের সামরিক চালানও ইসরায়েলে প্রবেশ করেছে, যার ৮৩ শতাংশই গেছে আদালতের রায়ের পর।
একইভাবে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ান ইসরায়েলি হামলার তীব্র বিরোধিতা করলেও দেশটির উৎপাদিত ৭.৫ মিলিয়ন শেকেল মূল্যের সামরিক পণ্য ইসরায়েলে গেছে। তবে তুরস্ক সরকার এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ২০২৪ সালের মে মাসের পর থেকে ইসরায়েলের সঙ্গে সব ধরনের বাণিজ্য সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করা হয়েছে। কিন্তু শুল্ক তথ্য বলছে, মে মাসের পর স্থল বা সমুদ্রপথ বন্ধ হলেও বেন গুরিয়ন বিমানবন্দর এবং হাইফা বন্দরের মাধ্যমে কিছু পণ্য প্রবেশ করেছে। ব্রাজিলের ক্ষেত্রেও একই রকম বৈপরীত্য দেখা গেছে, যেখানে তাদের দেওয়া বিবৃতির পরও শুল্ক রেকর্ডে চালানের উপস্থিতি মিলেছে।
আইনি বাধ্যবাধকতা ও সরবরাহ শৃঙ্খলের জটিলতা
ইউনিভার্সিটি অব দ্য ওয়েস্ট অব ইংল্যান্ডের ফৌজদারি আইনের অধ্যাপক গেরহার্ড কেম্প জানান, গণহত্যা কনভেনশনের আওতায় রাষ্ট্রগুলোর দায়িত্ব কেবল গণহত্যার শাস্তি দেওয়া নয়, মারাত্মক ঝুঁকির কথা জানার পর থেকেই তা প্রতিরোধ করা। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের একটি স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশনও সিদ্ধান্তে পৌঁছায় যে, ইসরায়েল গাজায় গণহত্যা চালিয়েছে।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের গবেষক প্যাট্রিক উইলকেন বলেন, “এমন কোনো উপায় নেই যে ইসরায়েল একাই গাজা উপত্যকাজুড়ে তার ব্যাপক বোমাবর্ষণের তীব্রতা বজায় রাখতে পারত। ইসরায়েল মূলত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্যান্য দেশের অস্ত্র ও গোলাবারুদের এক বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলের ওপর নির্ভর করেছে।” আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনেক দেশ রাজনৈতিক চাপ ও অভ্যন্তরীণ আইনি বাধ্যবাধকতার কারণে মুখে নিষেধাজ্ঞার কথা বললেও বহুবছর মোদী বাণিজ্যিক চুক্তি ও সামরিক অংশীদারিত্বের স্বার্থে পুরোপুরি অস্ত্র সরবরাহ বন্ধ করতে পারেনি।

