হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিস থেকে পেন্টাগনের করিডোর—সবখানেই এখন এক চাপা অস্বস্তি। প্রশ্নটা বেশ কিছুদিন ধরেই ওয়াশিংটনের নীতিনির্ধারকদের মনে ঘুরপাক খাচ্ছিল। তবে এবার তা প্রাতিষ্ঠানিক উদ্বেগের রূপ নিয়েছে। দীর্ঘদিনের সবচেয়ে বিশ্বস্ত মিত্র ইসরায়েল কি খোদ মার্কিন প্রশাসনের শীর্ষ কর্তাদের ওপর গোপন নজরদারি চালাচ্ছে? মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক সমীকরণ যখন ওলটপালট হচ্ছে, ঠিক তখনই দুই দেশের সম্পর্কের অন্দরে তৈরি হয়েছে এক বড় ফাটল।
ইরান সংঘাতের ভবিষ্যৎ নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর মধ্যকার দূরত্ব এখন আর গোপন কোনো বিষয় নয়। তেহরানের সঙ্গে ডোনাল্ড ট্রাম্পের কূটনৈতিক দরকষাকষির প্রচেষ্টা তেল আবিবকে ক্ষুব্ধ করেছে। আর এই দ্বন্দের জের ধরেই মার্কিন নীতিনির্ধারণী মহলের গোপন তথ্য হাতিয়ে নিতে মরিয়া হয়ে উঠেছে ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। পেন্টাগনের অভ্যন্তরে এখন এই আশঙ্কাই সবচেয়ে তীব্র।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম এনবিসি নিউজের এক চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদনে এই গুপ্তচরবৃত্তির ভেতরের চিত্রটি সামনে আনা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থা বা ডিআইএ পরিস্থিতি বিবেচনা করে ওয়াশিংটনের জন্য একটি বড় সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তারা ইসরায়েলের কাউন্টার-ইন্টেলিজেন্স হুমকির স্তরকে তাদের অভ্যন্তরীণ মূল্যায়ন কাঠামোর সর্বোচ্চ পর্যায় বা ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। বর্তমান ও সাবেক একাধিক মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তা এই তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।
তেল আবিব সফরে ‘বার্নার ফোন’ ও কঠোর প্রোটোকল
এই নতুন মূল্যায়নের পর মার্কিন কর্মকর্তাদের ইসরায়েল সফরের ক্ষেত্রে এক অভূতপূর্ব সতর্কবার্তা জারি করা হয়েছে। কূটনৈতিক এবং সামরিক মিশনগুলোতে যোগ দিতে যারা তেল আবিব বা জেরুজালেমে যাচ্ছেন, তাদের কঠোর যোগাযোগ প্রোটোকল মেনে চলতে বলা হচ্ছে। সাধারণ স্মার্টফোনের বদলে তাদের দেওয়া হচ্ছে ‘বার্নার ফোন’ বা একবার ব্যবহারযোগ্য বিশেষ মোবাইল সেট, যা ট্র্যাকিং করা কঠিন।
একই সঙ্গে পেন্টাগনের কর্মকর্তারা সফরের সময় সাময়িক এবং উচ্চ সুরক্ষিত কম্পিউটার ব্যবহার করছেন। বার্তা আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের সাধারণ নেটওয়ার্ক ব্যবহার না করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মার্কিন এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে ইসরায়েলি গোয়েন্দারা সবসময়ই অত্যন্ত আগ্রাসী। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে তাদের এই তৎপরতা আমাদের নিজেদের নিরাপত্তার জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।”
প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, ইসরায়েলের মাটিতে পা রাখার পর থেকেই মার্কিন প্রতিনিধিরা এক ধরনের অদৃশ্য নজরদারির মধ্যে থাকেন। সাবেক মার্কিন কূটনীতিক এবং নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা জানিয়েছেন, ইসরায়েলের হোটেল কক্ষ বা অন্য কোনো স্থানে বসে তারা এখন আর কোনো স্পর্শকাতর রাষ্ট্রীয় বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন না। কারণ তারা জানেন, ঘরের দেয়ালেরও কান থাকতে পারে এবং সেই কানটি হয়তো মোসাদের।
সাত পৃষ্ঠার গোপন নথি এবং পেন্টাগনের মূল্যায়ন
পেন্টাগনের এই উদ্বেগের পেছনে রয়েছে সাত পৃষ্ঠার একটি গোপন মূল্যায়ন নথি, যা সম্প্রতি ডিআইএ তাদের অভ্যন্তরীণ নোটিশের সঙ্গে যুক্ত করে প্রচার করেছে। এই নথিতে ইসরায়েলের সাইবার ও মাঠ পর্যায়ের তথ্য সংগ্রহের অভাবনীয় সক্ষমতার বিশদ বিবরণ রয়েছে। মার্কিন কর্মকর্তারা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসন ঠিক কী ভাবছে, তার আগাম খবর পেতেই ইসরায়েল এই আগ্রাসী পথ বেছে নিয়েছে।
নথিতে নির্দিষ্ট কোনো একক ঘটনার কথা উল্লেখ না থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া বেশ কিছু সন্দেহজনক তৎপরতার ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। মার্কিন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার একটি বড় অংশ মনে করছে, ইসরায়েলের হ্যাকিং এবং প্রথাগত গুপ্তচরবৃত্তির ক্ষমতা এখন এতটাই উন্নত যে, তাদের মিত্র ভাবার পাশাপাশি কাউন্টার-ইন্টেলিজেন্সের তালিকায় শীর্ষে রাখা ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না।
তবে এই টানাপোড়েনের মধ্যেও একটি বিষয় স্পষ্ট করা হয়েছে। দুই দেশের মধ্যে গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদানের যে প্রাতিষ্ঠানিক চুক্তি রয়েছে, তা এখনো আগের মতোই সচল। অর্থাৎ, শত্রুপক্ষ বা সাধারণ সন্ত্রাসবাদ দমনের ক্ষেত্রে দুই দেশ তথ্য শেয়ার করলেও, নিজেদের ভেতরের কৌশলগত সিদ্ধান্তগুলো গোপন রাখতে ওয়াশিংটন এখন ইসরায়েলকে আর বিশ্বাস করতে পারছে না।
‘অতি-আগ্রাসী’ মিত্র ও ওয়াশিংটনের অস্বস্তি
মিত্র দেশগুলোর একে অপরের ওপর নজরদারি রাখা আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে সম্পূর্ণ নতুন কিছু নয়। কিন্তু ইসরায়েলের বর্তমান তৎপরতা সেই প্রথাগত সীমারেখা অতিক্রম করেছে বলে মনে করছেন ওয়াশিংটনের প্রবীণ কর্মকর্তারা। সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা বিভাগের ভাইস প্রেসিডেন্ট এমিলি হার্ডিং ইসরায়েলের এই ভূমিকাকে ‘অতি-আগ্রাসী’ বলে বর্ণনা করেছেন।
হার্ডিংয়ের মতে, মার্কিন প্রশাসন মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ মানচিত্র কীভাবে আঁকছে, তা জানতে তেল আবিবের আগ্রহ এখন আকাশচুম্বী। তারা ওয়াশিংটনের সিদ্ধান্তের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে চায়। আর সেই প্রভাব খাটানোর জন্য তাদের প্রয়োজন মার্কিন নীতিনির্ধারকদের ভেতরের আলোচনা এবং ট্রাম্পের ব্যক্তিগত মতামতের হুবহু তথ্য। এই অতি-আগ্রহই দুই দেশের চিরচেনা সম্পর্কে সন্দেহের বিষ বাষ্প ছড়িয়ে দিয়েছে।
অবশ্য ওয়াশিংটনে নিযুক্ত ইসরায়েলি দূতাবাস এই পুরো অভিযোগকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও অসত্য বলে উড়িয়ে দিয়েছে। দূতাবাসের একজন মুখপাত্র এক বিবৃতিতে বলেন, “এই দাবি সম্পূর্ণ মিথ্যা। ইসরায়েল কখনো আমেরিকার কোনো সরকারি কর্মকর্তা বা প্রতিষ্ঠানের ওপর গোয়েন্দা নজরদারি চালায় না। আমাদের সব অভিযান শত্রুদের বিরুদ্ধে, মিত্রদের বিরুদ্ধে নয়।” হোয়াইট হাউসের একটি অংশও এই প্রতিবেদনকে কাল্পনিক বলে দাবি করেছে।
ইরান কৌশল এবং ট্রাম্প-নেতানিয়াহুর ব্যক্তিগত ফাটল
এই গোয়েন্দা যুদ্ধের নেপথ্যে রয়েছে ইরানকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা গভীর রাজনৈতিক সংকট। গত এপ্রিল মাসে মধ্যপ্রাচ্যে একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তেহরানের সঙ্গে একটি বড় এবং স্থায়ী চুক্তিতে পৌঁছাতে চাইছেন। তিনি চান না মার্কিন সেনারা মধ্যপ্রাচ্যের কোনো দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ুক।
কিন্তু বেজ্জামান নেতানিয়াহুর হিসাব সম্পূর্ণ আলাদা। তিনি প্রকাশ্যে ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই কূটনৈতিক উদ্যোগের সমালোচনা করেছেন। ইসরায়েলের দাবি, তেহরানের ওপর অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপ না বাড়িয়ে আলোচনা করা মানে তাদের পারমাণবিক কর্মসূচির পথ আরও সুগম করে দেওয়া। এই মৌলিক মতপার্থক্যই দুই নেতার ব্যক্তিগত সম্পর্কে চরম তিক্ততা তৈরি করেছে।
এনবিসি নিউজের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, সম্প্রতি এক উত্তপ্ত ফোনালাপে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ধৈর্যচ্যুতি ঘটে। পরে ট্রাম্প নিজের ঘনিষ্ঠ মহলে নেতানিয়াহুকে ‘পাগল’ বলে সম্বোধন করেন, যা পরবর্তীতে জানাজানি হয়ে যায়। দুই দেশের শীর্ষ পদের এই ব্যক্তিগত সংঘাতই এখন গোয়েন্দা নজরদারির মতো বিপজ্জনক মোড় নিয়েছে, যা আগামী দিনে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।

