মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে বারুদের গন্ধ আরও তীব্র করে তুলে ইরানকে সরাসরি যুদ্ধের হুমকি দিল যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটন স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, তেহরান যদি অবিলম্বে একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে সম্মত না হয়, তবে মার্কিন সামরিক বাহিনী পুনরায় সর্বাত্মক যুদ্ধ শুরু করতে পুরোপুরি প্রস্তুত।
বৃহস্পতিবার (১৬ এপ্রিল) ওয়াশিংটন ডিসিতে আয়োজিত এক বিশেষ ব্রিফিংয়ে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ এই হুঁশিয়ারি দেন। তিনি দাবি করেন, যুদ্ধের এই পর্যায়ে ইরানের নৌবাহিনী কার্যত অস্তিত্বহীন। ফলে বর্তমানে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালির সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ এখন মার্কিন নৌবাহিনীর হাতে।
হেগসেথ সাংবাদিকদের বলেন, “ইরানকে হয় একটি সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ বেছে নিতে হবে, না হয় ধ্বংসের মুখোমুখি হতে হবে। যতদিন প্রয়োজন, ইরানের ওপর আমাদের নৌ-অবরোধ জারি থাকবে।” তিনি সতর্ক করে বলেন, ইরান যদি আলোচনায় না ফিরে ‘ভুল পথ’ বেছে নেয়, তবে তাদের জাতীয় গ্রিড, বিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং জ্বালানি অবকাঠামোতে ভয়াবহ বোমা হামলা চালানো হবে।
এই ব্রিফিংয়ে ইরানের সর্বোচ্চ নেতৃত্ব নিয়েও চাঞ্চল্যকর তথ্য দেন হেগসেথ। তিনি জানান, যুদ্ধের শুরুর দিকে বিমান হামলায় আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হওয়ার পর তার ছেলে মোজতবা খামেনি বর্তমানে সর্বোচ্চ নেতার দায়িত্বে আছেন। মোজতবা নিজেও সেই হামলায় গুরুতর আহত হয়েছিলেন, তবে মার্কিন গোয়েন্দা তথ্যানুযায়ী তিনি বর্তমানে বেঁচে আছেন এবং সেরে উঠছেন।
এদিকে, তেহরানকে কোণঠাসা করতে মার্কিন সামরিক বাহিনী ইরানের বন্দরগুলোতে কড়া নজরদারি চালাচ্ছে। ইরান থেকে ছেড়ে আসা বা সেখানে প্রবেশ করতে চাওয়া প্রতিটি জাহাজের ওপর কড়া অবরোধ জারি করা হয়েছে। ওয়াশিংটন এটিকে তাদের ‘প্রেশার ট্যাকটিক’ বা চাপের কৌশল হিসেবে অভিহিত করছে।
মার্কিন জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন এই ব্রিফিংয়ে যোগ দিয়ে বলেন, এটি কোনো সমান শক্তির লড়াই নয়। তিনি দাবি করেন, ইরানি বাহিনী কখন কোথায় তাদের সামরিক সরঞ্জাম সরাচ্ছে, তার প্রতিটি মুহূর্তের খবর পেন্টাগনের কাছে রয়েছে। কেইন হুঁশিয়ারি দেন যে, অবরোধ ভাঙার চেষ্টা করলে আন্তর্জাতিক বা আঞ্চলিক জলসীমা—উভয় ক্ষেত্রেই শক্তি প্রয়োগ করবে মার্কিন নৌবাহিনী।
জেনারেল কেইন আরও জানান, এখন পর্যন্ত ১৩টি জাহাজ মার্কিন নৌবাহিনীর নির্দেশ মেনে অবরোধ না ভেঙে ফিরে গেছে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো জাহাজে জোরপূর্বক তল্লাশি বা আক্রমণ করার প্রয়োজন পড়েনি। যুক্তরাষ্ট্র চায় ইরান স্বেচ্ছায় আলোচনার টেবিলে আসুক, নতুবা সামরিক উপায়ে তাদের বাধ্য করা হবে।
ট্রাম্প প্রশাসন বুধবার চুক্তির বিষয়ে কিছুটা ইতিবাচক মনোভাব দেখালেও আজকের এই সামরিক হুঁশিয়ারি পরিস্থিতিকে আবারও জটিল করে তুলেছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্র একদিকে কূটনীতির দরজা খোলা রাখছে, অন্যদিকে সামরিক শক্তির চূড়ান্ত ভয় দেখিয়ে তেহরানকে একতরফা শর্ত মানতে বাধ্য করতে চাইছে।
রয়টার্স ও আল জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্কিন এই কঠোর অবস্থানের পর তেহরানের পরবর্তী পদক্ষেপ কী হয়, তার ওপর নির্ভর করছে পুরো অঞ্চলের ভবিষ্যৎ। একদিকে চীনের মধ্যস্থতার আহ্বান, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের এই ‘ডু অর ডাই’ আলটিমেটাম—সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্য এখন এক মহাসংকটের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে।

