ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্কের জের ধরে চীনা ব্যাংকগুলোর ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞার হুমকির ঘটনায় এবার সরাসরি সংঘাতে জড়াল বিশ্বের দুই প্রধান অর্থনৈতিক পরাশক্তি। ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে দেওয়া কড়া হুঁশিয়ারিকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে বেইজিং জানিয়ে দিয়েছে, জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদনহীন কোনো একতরফা এবং ‘অবৈধ’ নিষেধাজ্ঞা তারা মেনে নেবে না।
বৃহস্পতিবার (১৬ এপ্রিল) বিকেলে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে মুখপাত্র গোও জিয়াকুন যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপের তীব্র নিন্দা জানান। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে কোনো সার্বভৌম রাষ্ট্রের ওপর চাপিয়ে দেওয়া এমন খবরদারি চীন অতীতেও মানেনি এবং ভবিষ্যতেও মানবে না।
গত বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট জানিয়েছিলেন, ইরানের সঙ্গে গোপনে অর্থ লেনদেনের আশঙ্কায় চীনের দুটি বড় ব্যাংককে আনুষ্ঠানিক সতর্কবার্তা দিয়েছে হোয়াইট হাউস। বেসেন্ট হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন যে, লেনদেনের প্রমাণ পাওয়া গেলেই ওই ব্যাংকগুলোর ওপর ‘সেকেন্ডারি স্যাংশন’ বা দ্বিতীয় পর্যায়ের কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হবে।
মার্কিন এই হুমকির জবাবে গোও জিয়াকুন বলেন, “যুক্তরাষ্ট্র প্রায়ই আন্তর্জাতিক রীতিনীতি উপেক্ষা করে নিজেদের অভ্যন্তরীণ আইন অন্য দেশের ওপর চাপিয়ে দিতে চায়। চীন এই ‘লং-আর্ম জুরিসডিকশন’ বা অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অনধিকার হস্তক্ষেপের ঘোর বিরোধী। চীনা ব্যাংকগুলো আন্তর্জাতিক আইন মেনেই তাদের স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনা করছে।”
জ্বালানি নিরাপত্তার প্রশ্নে চীনের অবস্থান যে কতটা অনড়, তা জিয়াকুনের বক্তব্যে ফুটে ওঠে। তিনি মনে করিয়ে দেন যে, চীনের মোট জ্বালানি চাহিদার একটি বড় অংশ পূরণ হয় ইরান থেকে আসা তেল দিয়ে। গত সপ্তাহে পাকিস্তানে অনুষ্ঠিত যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর থেকেই ওয়াশিংটন তেহরানের অর্থনীতির শ্বাসরোধ করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে।
মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি দাবি করেছিলেন, হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন নৌবাহিনীর অবরোধের ফলে চীন সম্ভবত ইরানের কাছ থেকে তেল কেনা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখবে। তবে বেইজিংয়ের আজকের কড়া বার্তা প্রমাণ করছে যে, তারা সহজে পিছু হটতে রাজি নয়। বিশ্লেষকদের মতে, চীন তার নিজের অর্থনীতি ও জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে প্রয়োজনে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বড় ধরনের বাণিজ্যিক দ্বন্দ্বে জড়াতেও দ্বিধা করবে না।
এদিকে, দক্ষিণ লেবানন ও ইরানি অবকাঠামোতে ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলার প্রেক্ষাপটে এই কূটনৈতিক লড়াই নতুন মাত্রা পেয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র একদিকে অবরোধের মাধ্যমে ইরানকে কাবু করার চেষ্টা করছে, অন্যদিকে চীন সেই অবরোধকে অবৈধ আখ্যা দিয়ে তেহরানের পাশে দাঁড়িয়েছে।
পেন্টাগন যখন অস্ত্র উৎপাদন বাড়াতে গাড়ি নির্মাতাদের সঙ্গে আলোচনা করছে, তখন বেইজিংয়ের এই পাল্টাপাল্টি হুঁশিয়ারি বিশ্ব বাজারে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি করেছে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যদি সত্যি সত্যিই যুক্তরাষ্ট্র চীনা ব্যাংকগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করে, তবে তা কেবল ইরান ইস্যুতে সীমাবদ্ধ থাকবে না—বরং এটি একটি সর্বাত্মক বিশ্ব অর্থনৈতিক যুদ্ধের সূচনা করতে পারে।
আপাতত দুই পক্ষই নিজ নিজ অবস্থানে অনড়। বেইজিংয়ের এই সাহসী জবাবের পর ওয়াশিংটন এখন তাদের পরবর্তী পদক্ষেপে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করে কি না, সেদিকেই তাকিয়ে আছে বিশ্ব সম্প্রদায়। তবে একটি বিষয় পরিষ্কার, মধ্যপ্রাচ্যের এই আগুনের আঁচ এখন সরাসরি প্রশান্ত মহাসাগরের দুই তীরের কূটনৈতিক টেবিলে গিয়ে লেগেছে।

