ইউক্রেন-রাশিয়া সংঘাতের মধ্যে কিয়েভের সবচেয়ে বড় মিত্র যুক্তরাষ্ট্রের নীতিতে সম্প্রতি যে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে, তার কারণ ব্যাখ্যা করলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, ইউক্রেনের চলমান পরিস্থিতির জন্য সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো ব্যাপক দুর্নীতি, যা কিয়েভ সরকার থামাতে পারছে না। এই দুর্নীতির কারণেই তিনি ইউক্রেনকে মস্কোর সঙ্গে আপস করার অথবা মার্কিন সামরিক ও আর্থিক সহায়তা বন্ধ হওয়ার কঠিন শর্ত দিয়েছেন।
রবিবার (১ ডিসেম্বর) মার্কিন প্রেসিডেন্টের সরকারি বিমান ‘এয়ারফোর্স ওয়ান’-এর ফ্লাইটে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে ট্রাম্প ইউক্রেনকে শর্ত দেওয়ার কারণ সংক্রান্ত এক প্রশ্নের উত্তরে এই মন্তব্য করেন। তাঁর এই কঠোর অবস্থান ইউক্রেনের যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে এক নতুন এবং গভীর রাজনৈতিক সংকট সৃষ্টি করেছে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেন, “ইউক্রেনের কিছু গুরুতর সমস্যা রয়েছে। কিন্তু সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো দুর্নীতি। কিয়েভ কিছুতেই সেই দুর্নীতি বন্ধ করতে পারছে না। ইউক্রেনের বর্তমান বেকায়দা পরিস্থিতির জন্য প্রধানত দায়ী এই লাগামহীন দুর্নীতি।”
ট্রাম্পের এই মন্তব্য এমন এক সময়ে এলো, যখন ইউক্রেন রাশিয়ার আগ্রাসনের বিরুদ্ধে টিকে থাকতে পশ্চিমা বিশ্বের সামরিক ও অর্থনৈতিক সহায়তার ওপর সম্পূর্ণভাবে নির্ভরশীল। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে গত তিন বছরে যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, জার্মানি সহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশ ইউক্রেনকে হাজার হাজার কোটি ডলারের অর্থ ও অস্ত্র সহায়তা দিয়েছে।
তবে, আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন এবং অভ্যন্তরীণ তদন্তে বারবার অভিযোগ উঠেছে যে, এই বিশাল সহায়তার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ দেশটির ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তা ও সামরিক বাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা লুটপাট করেছেন। ট্রাম্পের এই সাম্প্রতিক মন্তব্যে সেই অভিযোগগুলোই যেন আরও শক্তিশালী ভিত্তি পেল।
ট্রাম্প প্রশাসন ইউক্রেনকে শর্ত দিয়েছে যে, কিয়েভকে হয় মস্কোর সঙ্গে একটি শান্তি চুক্তিতে আসতে হবে, অথবা যদি তারা যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রাপ্ত যাবতীয় সামরিক ও আর্থিক সহায়তা বন্ধ করে দেওয়া হবে। ট্রাম্পের বক্তব্য অনুযায়ী, এই শর্ত দেওয়ার মূল কারণ হলো, দুর্নীতিগ্রস্ত প্রশাসনের হাতে মার্কিন করদাতাদের অর্থ তুলে দেওয়া বা সেই অর্থের অপব্যবহার হতে দেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের পরিপন্থী।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের কঠোর মন্তব্য এমন একটি সময়ে এলো, যখন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি নিজেই দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভ্যন্তরীণভাবে কঠিন পদক্ষেপ নিচ্ছেন।
গত নভেম্বরের প্রথম দিকে দেশটির জ্বালানি খাতে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ ওঠার কারণে প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি তার মন্ত্রিসভার দুই গুরুত্বপূর্ণ সদস্যকে বরখাস্ত করেন। বরখাস্ত হওয়া মন্ত্রীরা হলেন জ্বালানিমন্ত্রী ভিতলানা গ্রিনচুক এবং আইনমন্ত্রী হারম্যান হালুশোঙ্কো। তাদের বিরুদ্ধে অন্তত ১০ কোটি ডলারের ঘুষ লেনদেন চক্রের সঙ্গে জড়িত থাকার গুরুতর অভিযোগ ওঠে।
এই দুই মন্ত্রী ছাড়াও প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি তার ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও সাবেক ব্যবসায়িক অংশীদার তিমুর মিনদিচের বিরুদ্ধেও ব্যক্তিগত নিষেধাজ্ঞা আরোপের ঘোষণা দেন। অভিযোগ উঠেছিল যে, মিনদিচ এই পুরো ঘুষ চক্রের সমন্বয়ের দায়িত্বে ছিলেন।
নিজের প্রশাসনের ভেতর থেকে দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গিয়ে প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি যে গভীর রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত সংকটের সম্মুখীন হয়েছেন, তা আন্তর্জাতিক মহল স্বীকার করে।
দুর্নীতি নিয়ে দেশের অভ্যন্তরে সৃষ্ট জনরোষ এবং আন্তর্জাতিক চাপ স্বীকার করে জেলেনস্কি তখন বলেছিলেন, “জ্বালানি খাতের সব কাজে সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা থাকা উচিত। আমি দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং দুর্নীতিবিরোধী কর্মকর্তাদের প্রতিটি তদন্তকে সম্পূর্ণরূপে সমর্থন করি।”
তবে, এই ঘটনাটিকে প্রেসিডেন্টের জন্য একটি বড় ধরনের রাজনৈতিক সংকট হিসেবে দেখা হচ্ছে। দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনকর্মী, বিরোধীদলীয় নেতা এবং সাবেক সেনা কর্মকর্তারা প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কির প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, দেশের বৃহত্তর স্বার্থে তিনি যেন তার ঘনিষ্ঠজনদের বরখাস্ত বা কারাবন্দী করার মতো কষ্টকর কাজ করতেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে দ্বিধা না করেন। দেশের জাতীয় নিরাপত্তা ও যুদ্ধের স্থিতিশীলতার জন্য এই দুর্নীতি দমনকে তারা অপরিহার্য বলে মনে করছেন।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রকাশ্যে দুর্নীতির অভিযোগ উত্থাপন কিয়েভ সরকারের জন্য দ্বিমুখী চাপ সৃষ্টি করেছে— একদিকে যেমন রাশিয়ার সঙ্গে সামরিক সংঘাত চলছে, তেমনি অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ দুর্নীতির কারণে তাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মিত্রের আস্থা হারাতে হচ্ছে। ট্রাম্পের এই মন্তব্য প্রমাণ করে যে, পশ্চিমা সহায়তা অব্যাহত রাখার ক্ষেত্রে সামরিক সাফল্য বা রাশিয়ার আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ার চেয়েও ইউক্রেনের জন্য এখন সুশাসন ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা একটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই ঘোষণা ইউক্রেনকে এক কঠিন কূটনৈতিক উভয় সংকটে ফেলে দিয়েছে। হয় দ্রুত দুর্নীতি দমন করে যুক্তরাষ্ট্রের আস্থা পুনরুদ্ধার করতে হবে, যা যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে অত্যন্ত কঠিন; অথবা সামরিক সহায়তার অভাবের মুখে রাশিয়ার শর্ত মেনে আপসের পথে যেতে হবে।
ট্রাম্পের মন্তব্য কেবল ইউক্রেনকেই নয়, বরং ইউরোপীয় মিত্র দেশগুলোকেও সতর্ক বার্তা দিয়েছে যে, মার্কিন সমর্থন আর শর্তহীন থাকবে না। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে ইউক্রেনের আবেদন এবং তার নেতৃত্বের বিশ্বাসযোগ্যতা এখন এই দুর্নীতির ইস্যুটির সফল মোকাবেলার ওপর বহুলাংশে নির্ভরশীল।

