ইরানে চলমান নজিরবিহীন গণবিক্ষোভ দমনে তেহরানের কঠোর অবস্থানের প্রেক্ষাপটে দেশটিতে মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা প্রবল হয়ে উঠেছে। মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বা পেন্টাগনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে সম্ভাব্য অভিযানের বিভিন্ন কৌশলগত বিকল্প সম্পর্কে বিস্তারিত অবহিত করেছেন। মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি) মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিবিএস নিউজ মন্ত্রণালয়ের দুজন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য নিশ্চিত করেছে।
প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কাছে পেন্টাগন যে পরিকল্পনাগুলো উত্থাপন করেছে, তাতে সরাসরি যুদ্ধের পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর হামলার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। এই পরিকল্পনার মূল তিনটি স্তম্ভ হলো— দূরপাল্লার মিসাইল হামলা, ব্যাপকভিত্তিক সাইবার অপারেশন এবং মনস্তাত্ত্বিক প্রচারণা বা সাইকোলজিক্যাল ক্যাম্পেইন। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কেবল প্রথাগত বিমান হামলা নয়, বরং ইরানের কমান্ড স্ট্রাকচার, যোগাযোগ নেটওয়ার্ক এবং রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমগুলোকে অচল করে দেওয়ার মতো সাইবার যুদ্ধের প্রস্তুতিও চূড়ান্ত করা হয়েছে।
ইরানে গত ২৮ ডিসেম্বর থেকে শুরু হওয়া দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক সংকটের বিক্ষোভ এখন সরকার পতনের এক দফা আন্দোলনে রূপ নিয়েছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্যমতে, ১৬ দিনের এই বিক্ষোভে নিহতের সংখ্যা ৬৪৫ ছাড়িয়েছে এবং ১০ হাজারেরও বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প শুরু থেকেই হুঁশিয়ারি দিয়ে আসছিলেন যে, ইরান সরকার যদি শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের ওপর গতবারের মতো নৃশংসতা চালায়, তবে যুক্তরাষ্ট্র হাত গুটিয়ে বসে থাকবে না। শুক্রবার হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের ট্রাম্প স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “আমরা এমন জায়গায় আঘাত করব, যেখানে তাদের সবচেয়ে বেশি কষ্ট হবে। এর অর্থ সরাসরি স্থল সেনা পাঠানো নয়, তবে আঘাত হবে অত্যন্ত ভয়াবহ।”
কেবল সামরিক নয়, ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করতে এক অভিনব ও কঠোর পদক্ষেপের ঘোষণা দিয়েছেন ট্রাম্প। সোমবার নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্ম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ এক ঘোষণায় তিনি বলেন, যে সমস্ত দেশ বা কোম্পানি ইরানের সাথে কোনো ধরনের ব্যবসা বা বাণিজ্য চালিয়ে যাবে, তাদের প্রতিটি পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের ক্ষেত্রে ২৫ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক (Tariff) আরোপ করা হবে। এই আদেশ তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর করার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। বিশ্লেষকদের মতে, এই পদক্ষেপের ফলে চীন, ভারত, ব্রাজিল ও রাশিয়ার মতো দেশগুলো যারা ইরানের বড় বাণিজ্য অংশীদার, তারা বিশাল অর্থনৈতিক ঝুঁকির মুখে পড়বে।
যুক্তরাষ্ট্রের এই মুহুর্মুহু হুমকির মুখে ইরানের পক্ষ থেকে মিশ্র প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেছে। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি সোমবার তেহরানে নিযুক্ত বিদেশি রাষ্ট্রদূতদের এক সভায় বলেন, “ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান কোনো যুদ্ধ চায় না, তবে আমরা যুদ্ধের জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত।” তিনি আরও যোগ করেন যে, সম্মান ও সমমর্যাদার ভিত্তিতে তারা ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনায় বসতে রাজি আছেন। তবে এর পেছনে তেহরান ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদকে দায়ী করে দাবি করেছে যে, বিক্ষোভ সহিংস করার পেছনে বিদেশি চক্রান্ত কাজ করছে।
এদিকে সংবাদমাধ্যম বিবিসি জানিয়েছে, মঙ্গলবার হোয়াইট হাউসের জাতীয় নিরাপত্তা দল একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে বসছে যেখানে ইরানের বিরুদ্ধে পরবর্তী পদক্ষেপের চূড়ান্ত খসড়া তৈরি হবে। ট্রাম্প নিজে এই বৈঠকে উপস্থিত না থাকলেও তার নির্দেশে একটি সমন্বিত সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপ তৈরির কৌশল গ্রহণ করা হচ্ছে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জানিয়েছেন, তেহরান আলোচনার প্রস্তাব দিলেও কোনো আলোচনা শুরুর আগেই যুক্তরাষ্ট্র দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিতে পারে। এর আগে ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে কাসেম সোলেইমানি হত্যাকাণ্ড এবং অতি সম্প্রতি ভেনেজুয়েলায় মার্কিন অপারেশনের উদাহরণ টেনে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন যে, তার হুমকি কেবল কথার কথা নয়। এখন দেখার বিষয়, বিশ্ব অর্থনীতি ও ভূ-রাজনীতিতে ভয়াবহ প্রভাব ফেলতে পারে এমন কোনো সরাসরি অভিযানে ট্রাম্প শেষ পর্যন্ত সবুজ সংকেত দেন কি না।

