রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যকার প্রলম্বিত যুদ্ধের আবহে কিয়েভের সামরিক শক্তি বৃদ্ধিতে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে যুক্তরাজ্য। রাশিয়ার আগ্রাসন মোকাবিলায় ইউক্রেনের জন্য সম্পূর্ণ নতুন প্রযুক্তির এবং শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির একটি বিশেষ প্রকল্প হাতে নিয়েছে ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়।
‘প্রজেক্ট নাইটফল’ নামক এই উদ্যোগের আওতায় এমন সব ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করা হচ্ছে, যা যুদ্ধক্ষেত্রে রাশিয়ার ভেতরের কৌশলগত লক্ষ্যবস্তুগুলোতে নিখুঁতভাবে আঘাত হানতে সক্ষম হবে। এই পদক্ষেপকে ক্রেমলিনের সাম্প্রতিক বর্ধিত হামলার পাল্টা জবাব হিসেবে দেখছেন আন্তর্জাতিক সামরিক বিশ্লেষকরা।
যুক্তরাজ্য সরকারের অফিসিয়াল ওয়েব পোর্টাল ‘গভ ডট ইউকে’ (gov.uk) সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, নাইটফল সিরিজের এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলো অত্যাধুনিক যুদ্ধপ্রযুক্তিতে ঠাসা। প্রতিটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রায় ২০০ কেজি ওজনের উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন বিস্ফোরক (ওয়্যারহেড) বহন করে ৫০০ কিলোমিটারেরও বেশি দূরবর্তী লক্ষ্যবস্তুতে নির্ভুলভাবে আঘাত হানতে পারবে।
এই প্রকল্পের আওতায় প্রতি মাসে ১০টি করে ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। অত্যন্ত ব্যয়বহুল এই প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের একেকটির নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৮ লাখ পাউন্ড, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ১৩ কোটি ১১ লাখ টাকারও বেশি।
নাইটফল সিরিজের এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর সবচেয়ে বড় বিশেষত্ব হলো এদের বহুমুখী ব্যবহারযোগ্যতা। এগুলো কেবল নির্দিষ্ট কোনো লঞ্চপ্যাড নয়, বরং বিভিন্ন ধরনের সামরিক যানবাহন থেকেও অনায়াসেই উৎক্ষেপণ করা যাবে। একই সময় একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার সক্ষমতা থাকায় এগুলো প্রতিপক্ষের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে (এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম) ফাঁকি দিতে বিশেষভাবে কার্যকর। ফলে রুশ বাহিনীর বিদ্যমান প্রতিরক্ষা বলয় ভেদ করে লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করা ইউক্রেনের জন্য অনেক সহজতর হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষামন্ত্রী জন হিলি এই প্রকল্পের ঘোষণা দিয়ে রাশিয়ার প্রতি কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। তিনি বলেন, “রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন সম্ভবত ধারণা করছেন যে তিনি যেকোনো অপরাধ করে পার পেয়ে যাবেন। এই ভুল ধারণা থেকেই রুশ বাহিনী সম্প্রতি ইউক্রেনের সামরিক স্থাপনার পাশাপাশি বেসামরিক জনপদেও নির্বিচারে বোমা হামলা চালাচ্ছে।” হিলি আরও যোগ করেন, পুতিনকে এই দায়মুক্তি দেওয়া হবে না। ইউক্রেনের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় যুক্তরাজ্যের সমর্থন ‘লৌহকঠিন’ এবং এই নতুন ক্ষেপণাস্ত্র প্রকল্প সেই প্রতিশ্রুতিরই একটি বাস্তব প্রতিফলন।
রয়টার্সসহ আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো বলছে, ব্রিটেনের এই সিদ্ধান্ত রাশিয়ার সাথে পশ্চিমা বিশ্বের উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। তবে ইউক্রেনের বর্তমান পরিস্থিতির কথা বিবেচনায় নিয়ে ব্রিটেন তার প্রতিরক্ষা উৎপাদন শিল্পকে যুদ্ধের প্রয়োজনীয়তা অনুযায়ী ঢেলে সাজাচ্ছে।
প্রজেক্ট নাইটফলের মাধ্যমে সরবরাহকৃত এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলো যুদ্ধক্ষেত্রে শক্তির ভারসাম্য ইউক্রেনের অনুকূলে আনতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। মূলত দূরপাল্লার হামলার সক্ষমতা অর্জন করলে ইউক্রেন রাশিয়ার সাপ্লাই চেইন এবং লজিস্টিক নেটওয়ার্ককে আরও কার্যকরভাবে বাধাগ্রস্ত করতে পারবে।
ব্রিটেনের এই সামরিক সহযোগিতা কেবল অস্ত্র সরবরাহের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি ইউক্রেনীয় বাহিনীর মনোবল বৃদ্ধিতেও সহায়ক হবে। আন্তর্জাতিক মহলে এই প্রকল্পকে পুতিনের ‘টোটাল ওয়ার’ কৌশলের বিরুদ্ধে পশ্চিমা বিশ্বের এক শক্তিশালী সংহতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। রাশিয়ার পক্ষ থেকে এই নতুন ক্ষেপণাস্ত্র প্রকল্পের বিষয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া না গেলেও, ক্রেমলিন বরাবরই ইউক্রেনে পশ্চিমা অস্ত্রের সরবরাহকে যুদ্ধের উসকানি হিসেবে বর্ণনা করে আসছে।

