সীমান্তের নিস্তব্ধ ধানক্ষেতে প্রতিদিনের মতোই গবাদিপশু চরাতে গিয়েছিলেন সাধারণ গ্রামবাসী। কিন্তু কে জানত যে শান্ত মাঠের সবুজ আইলের আড়ালে ওঁৎ পেতে আছে এক বিভীষিকাময় আতঙ্ক।
বিকেলের আলো যখন ধূলিমলিন হয়ে আসছিল, ঠিক তখনই আকস্মিক এক হিংস্র গর্জনে কেঁপে ওঠে পুরো আমঝোল সীমান্ত এলাকা। লোকালয়ে হানা দিয়ে বাঘের সরাসরি আক্রমণের শিকার হন নারীসহ তিনজন।
রোববার বিকেলে লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলার ৯০৫ নম্বর সীমান্ত পিলারের কাছে এই সীমান্ত ঘেঁষা প্রত্যন্ত গ্রামে মর্মান্তিক এই বন্যপ্রাণীর হামলার ঘটনাটি ঘটে।
বাঘের হামলায় আহতদের তীব্র চিৎকার ও সীমান্তবর্তী মানুষের ছোটাছুটিতে মুহূর্তে পুরো জনপদে মারাত্মক ভীতি ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি সামাল দিতে সীমান্ত রক্ষী বাহিনী বিজিবিকে ফাঁকা গুলি ছুড়তে হয়েছে।
আহতদের শরীর জুড়ে রয়েছে গভীর ক্ষত ও অনবরত রক্তপাতের দাগ। আশঙ্কাজনক অবস্থায় দুজনকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হলে পুরো হাতীবান্ধা উপজেলায় তৈরি হয় এক থমথমে পরিবেশ।
আহতদের পরিচয় নিশ্চিত করে হাতীবান্ধা উপজেলা প্রশাসন জানিয়েছে, আক্রান্তদের মধ্যে রয়েছেন হাতীবান্ধা উপজেলার গোতামারী ইউনিয়নের আমঝোল গ্রামের বাসিন্দা শরিফা বেগম (৩৪)।
শরিফার পাশাপাশি বাঘের থাবার শিকার হয়ে মারাত্মক জখম হয়েছেন একই এলাকার কৃষক নজরুল ইসলাম এবং তাঁর প্রতিবেশী আফসার আলী। তারা বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন।
প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় বাসিন্দারা সেই ভয়াল ঘটনার বর্ণনায় জানান যে বিকেলের দিকে নিজের পালিত ছাগল খোঁজার উদ্দেশ্যে সীমান্তের কাছের ধানক্ষেতের দিকে হেঁটে গিয়েছিলেন গৃহবধূ শরিফা বেগম।
সীমান্তের শূন্যরেখার অতি কাছাকাছি পৌঁছাতেই শরিফার চোখে পড়ে এক হাড়হিম করা দৃশ্য। ঘন কাশের জঙ্গল ঘেঁষে থাকা একটি ঝোপের আড়াল থেকে বাঘটি তাঁর ছাগলটির ওপর হঠাৎ ঝাঁপিয়ে পড়েছে।
চোখের সামনে বন্যপ্রাণীর সেই ভয়ংকর হিংস্রতা দেখে আতঙ্কে শরিফা বিকট চিৎকার শুরু করেন। প্রাণ বাঁচানোর তাড়নায় তিনি পেছনে হাঁটার চেষ্টা করতেই বাঘটি নিজের শিকার ছেড়ে তাঁর দিকে ধেয়ে আসে।
কিছু বুঝে ওঠার আগেই রক্তলোলুপ বাঘটি শরিফার ওপর চড়াও হয় এবং তীক্ষ্ণ নখ দিয়ে তাঁর মুখে ও গায়ে উপর্যুপরি আঘাত হানে। শরিফার কাতর আকুতি ও চিত্কার শুনে পাশের মাঠ থেকে ছুটে আসেন স্থানীয় কৃষকরা।
হাতে থাকা লাঠিসোঁটা আর ধান কাটার কাস্তে নিয়ে নজরুল ও আফসার আলীসহ একাধিক গ্রামবাসী শরিফাকে বাঁচাতে বাঘটির দিকে তেড়ে যান। এতে আরও বেশি ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে হিংস্র জন্তুটি।
নিজের অবস্থান রক্ষায় বাঘটি স্থান পরিবর্তন করে সরাসরি উদ্ধারকারীদের ওপর লাফিয়ে পড়ে। থাবার গভীর আঘাতে মুহূর্তের মধ্যে রক্তে ভেসে যান কৃষক নজরুল ইসলাম ও আফসার আলী।
সীমান্তের আইলে তখন শুরু হয় অবলা মানুষ আর হিংস্র পশুর এক অসম রক্তক্ষয়ী লড়াই। অভিজ্ঞ গ্রামবাসীদের সম্মিলিত চেঁচামেচি ও ধাওয়ার মুখে একপর্যায়ে বাঘটি রক্তচক্ষু দেখিয়ে সীমান্তের ওপারের জঙ্গলের দিকে পালিয়ে যায়।
ঘটনার পর রক্তাক্ত ও মারাত্মক জখম অবস্থায় তিনজনকে উদ্ধার করে গ্রামবাসী তড়িঘড়ি করে হাতীবান্ধা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগে নিয়ে ছোটেন।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হলেও শরিফা বেগম ও নজরুলের শরীর থেকে অনবরত রক্তক্ষরণ হতে থাকায় তাঁদের সেখানে ধরে রাখা অসম্ভব হয়ে পড়ে।
হাতীবান্ধা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগের কর্তব্যরত চিকিৎসক ডা. মামুন রহমান সাংবাদিকদের জানান, বাঘের আঁচড় ও কামড়ে আক্রান্ত রোগীদের শরীরে মারাত্মক ও গভীর ক্ষতের সৃষ্টি হয়েছে।
চিকিৎসক আরও জানান, প্রাথমিকভাবে রক্তক্ষরণ বন্ধের চেষ্টা এবং প্রতিষেধক ইনজেকশন দেওয়া হলেও দুজনের শারীরিক অবস্থা বেশ সংকটজনক। তাই তাদের সুচিকিৎসার জন্য রংপুর মেডিকেলে পাঠানো হয়।
আমঝোল গ্রামের এই রক্তক্ষয়ী বাঘের আক্রমণের খবর পৌঁছামাত্রই সীমান্তে কড়া টহল জোরদার করে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। বাঘটিকে সীমান্ত এলাকা থেকে তাড়াতে বিজিবি সদস্যরা দুই রাউন্ড ফাঁকা গুলি বর্ষণ করেন।
গুলির বিকট শব্দে পুরো সীমান্ত এলাকা থমথমে হয়ে পড়ে। বাঘটি পুনরায় লোকালয়ে ঢোকার চেষ্টা করছে কি না, তা নিয়ে কাঁটাতারের দুই প্রান্তে নজরদারি বাড়িয়ে দিয়েছে সীমান্ত রক্ষীরা।
হাতীবান্ধা থানা তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ (ওসি-তদন্ত) মোশাররফ হোসেন জানান, খবর পাওয়ার পরপরই পুলিশ দল অকুস্থলে পৌঁছায় এবং স্থানীয়দের সুরক্ষায় কড়া পদক্ষেপ গ্রহণ করে।
ওসি আরও যোগ করেন যে সীমান্ত এলাকায় পুলিশের বিশেষ টহল বাড়ানো হয়েছে। আহতদের স্বজনেরা তাঁদের উদ্ধার করে চিকিৎসার জন্য রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেছেন এবং বিজিবি বিএসএফের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে।
গ্রামবাসীর অভিযোগ, সীমান্তসংলগ্ন বনাঞ্চল ও ঝোপঝাড়ের নিরাপত্তা সুসংহত না থাকায় মাঝেমধ্যেই এমন ভয়াল বন্যপ্রাণী লোকালয়ে ঢুকে মানুষের মূল্যবান জীবন বিপন্ন করে তুলছে।
বিশেষ করে ধানক্ষেত ও পাটক্ষেতগুলোর কাছাকাছি সীমানা হওয়ায় ভারতের ভূখণ্ড থেকে কীভাবে বাঘটি কাঁটাতার বা সীমান্ত পেরিয়ে এলো, তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
আমঝোল গ্রামের এক জ্যেষ্ঠ অধিবাসী বলছিলেন, আমাদের এই অঞ্চলে শিয়াল কিংবা মেছোবাঘের উৎপাত থাকলেও এমন বড় হিংস্র বাঘের সরাসরি আক্রমণের ঘটনা এর আগে খুব একটা দেখা যায়নি।
তিনি জানান, বিকেলের এই মর্মান্তিক ঘটনার পর থেকে কোনো কৃষক আর একা একা নিজেদের জমিতে যেতে সাহস পাচ্ছেন না। ছোট ছোট সন্তানদের ঘরের ভেতর আটকে রাখা হয়েছে।
সীমান্তবর্তী গোতামারী ইউনিয়নের সাবেক ও বর্তমান জনপ্রতিনিধিরা এই বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের দাবি, সীমান্ত ঘেঁষা এই অঞ্চলগুলোতে বিজিবি ও বন বিভাগের যৌথ টহল অতি জরুরি।
তা না হলে রাত নামলে বাঘটি আবার কোনো বাড়িতে হানা দিতে পারে বলে গ্রামবাসীর মনে তীব্র শঙ্কা বিরাজ করছে। অনেক পরিবার রাতে গৃহপালিত পশুপাখি নিয়ে ঘরের ভেতর অবস্থান করছেন।
সীমান্তবর্তী এলাকার এই মানবিক ও সুরক্ষাজনিত সমস্যা কাটাতে বন দপ্তরের বিশেষজ্ঞদের নিয়ে আসার জন্য উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে দ্রুত যোগাযোগ শুরু করা হয়েছে।
রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন শরিফা ও নজরুলের অবস্থা এখনো আশঙ্কামুক্ত নয় বলে হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে। তাদের দ্রুত অস্ত্রোপচার ও উন্নত পর্যবেক্ষণ দরকার।
আমঝোল ৯০৫ নম্বর পিলারের চারপাশের সীমান্ত এলাকায় এখন শুধুই এক অজানা আতঙ্ক আর নিস্তব্ধতা। বিজিবির ফাঁকা গুলির শব্দ যেন সেই ভয়ের গভীরতাকেই উন্মোচিত করে দিয়ে গেছে।
সীমান্ত রক্ষা ও জননিরাপত্তার পাশাপাশি এমন বন্যপ্রাণীর আক্রমণ রোধে কাঁটাতারের কড়াকড়ি ও বন বিভাগের আধুনিক ট্র্যাপ ব্যবস্থা চালুর দাবি তুলেছেন ক্ষতিগ্রস্ত গ্রামবাসীরা।
বিকেলের সূর্যের আলো নিভে যাওয়ার পর থেকে আমঝোল গ্রাম এখন অনেকটাই নীরব। কেবল টহলরত গাড়ির শব্দ আর বিজিবির সতর্ক দূরবীন নজর রাখছে সীমান্তে, পাছে বাঘটি আবার ফিরে আসে।
লালমনিরহাটের এই সীমান্তবর্তী জনপদে কৃষিকাজ ও পশুপালনের ওপরই জীবিকা নির্বাহ করেন অধিকাংশ মানুষ। কাজের তাগিদেই তাদের প্রতিদিন সীমান্তে নামতে হয়।
কিন্তু যখন নিজেদের ভিটেমাটি কিংবা ছাগল চড়ানোর জমিতেই এমন ভয়ংকর জন্তুর মুখোমুখি হতে হয়, তখন জীবিকার পথ বন্ধ হওয়ার উপক্রম ঘটে।
বন বিভাগের স্থানীয় কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা জানান যে পার্শ্ববর্তী দেশের গভীর বন জঙ্গল থেকে খাবারের সন্ধানে বাঘটি ভারতের সীমানা টপকে বাংলাদেশে চলে আসতে পারে।
তবে বাঘটি রয়েল বেঙ্গল টাইগার নাকি মেছো বাঘ বা অন্য কোনো প্রজাতি, তা এখনো নিশ্চিত করা যায়নি। আলামত সংগ্রহ ও বাঘের পায়ের ছাপ খতিয়ে দেখতে বন বিভাগের টিম যাচ্ছে।
হাতীবান্ধা উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তাও এই মর্মান্তিক ঘটনার ওপর কড়া নজর রাখছেন। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে প্রশাসনিক সহায়তা প্রদানের পূর্ণ আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।
লালমনিরহাট জেলার সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে এর আগেও একাধিকবার বুনো শূকর ও হাতির আক্রমণের খবর পাওয়া গেলেও, সরাসরি বাঘের আক্রমণের ঘটনায় নতুন করে আতঙ্কের তৈরি হয়েছে।
সীমান্তের কৃষকদের নিরাপত্তা জোরদার না করা গেলে আগামী দিনগুলোতে পাকা ধান কাটার মওসুমে বড় ধরনের অর্থনৈতিক ধস নামতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তা ও সুশীল সমাজ।
বিজিবির পক্ষ থেকে সীমান্তবর্তী সাধারণ গ্রামবাসীকে একা একা শূন্যরেখার কাছাকাছি না যাওয়ার জন্য মাইকিং করে কড়া নির্দেশ ও সচেতনার বার্তা প্রদান করা হয়েছে।
বিশেষ করে শিশু ও বয়োবৃদ্ধদের সন্ধ্যার আগেই ঘরের নিরাপদ বেষ্টনীতে রাখার তাগিদ দেওয়া হয়েছে বিজিবির বিশেষ টহল দলের পক্ষ থেকে।
রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, বন্যপ্রাণীর হামলায় সংক্রমিত ক্ষত গভীর হওয়ায় তাদের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে।
হাতীবান্ধা থানার পরিদর্শক জানান, পুলিশ রাতভর পাহারা দেবে এবং বিজিবির সঙ্গে নিয়মিত তথ্য আদান-প্রদান অব্যাহত রাখবে যাতে এলাকার কেউ গুজবে কান না দেয়।
গ্রামের মানুষজনের একটাই দাবি, ওই হিংস্র বাঘটিকে অবিলম্বে খাঁচাবন্দি করে নিরাপদ অভয়ারণ্যে সরিয়ে নেওয়া হোক। তা না হলে সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক যাতায়াত থমকে থাকবে।
একদিকে চিকিৎসাধীন আহতদের জীবনের লড়াই, অন্যদিকে বাঘের লোকালয়ে ফেরার নতুন শঙ্কা—এই দুই মিলিয়ে পুরো গোতামারী ইউনিয়নের বাসিন্দাদের রাত কাটছে চরম অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগের মাঝে।
গ্রামের লোকালয়ে যে ভীতি জড়িয়ে পড়েছে, তা দূর করতে হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষগুলোকে যৌথ অভিযানে নামতে হবে বলে মনে করছেন স্থানীয় সচেতকেরা।
সীমান্তের শূন্যরেখার এই শান্ত প্রান্তরজুড়ে এখন শুধুই একটি দীর্ঘশ্বাসের অপেক্ষা, যেন ঘরের মানুষগুলো সুস্থ হয়ে ঘরে ফেরেন এবং সীমান্ত আবার নিরাপদ হয়ে ওঠে।

