পাবনার দোগাছী ইউনিয়নের কুলোনিয়া গ্রামের সবুজ শান্ত প্রান্তরজুড়ে এখন শুধুই পোড়া ক্ষোভের তপ্ত বাতাস। দশ বছরের এক নিস্পাপ শিশুর নির্মম রক্ত ও খণ্ডিত মরদেহের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা গ্রামীণ সমাজ নিজের হাতেই যেন তুলে নিয়েছে শাস্তির চূড়ান্ত বিধান।
তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী কামরুন্নাহার কলিকে ধর্ষণের পর নৃশংসভাবে হত্যা করার পর গ্রামবাসীর বুকের ভেতরের আগুন রূপ নিয়েছে এক ভয়াল ধ্বংসযজ্ঞে। অভিযুক্ত প্রধান আসামি মোস্তফা কামালের আস্তানা গুঁড়িয়ে দিয়েও শান্ত হয়নি কুলোনিয়া গ্রামের ক্ষুব্ধ মানুষ।
দোতলা পাকা ভিটেমাটি পিটিয়ে মাটির সাথে মিশিয়ে দেওয়ার পরও ক্ষান্ত হয়নি বিক্ষুব্ধ জনতা। এখন বেলচা ও কোদাল দিয়ে কেটে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে ওই বাড়ির ভিটের মাটি পর্যন্ত। যে মাটিতে পশুর মতো জঘন্য অপরাধ ঘটেছে, সেই মাটির প্রতিটি কণা মুছে ফেলাই যেন এখন পুরো জনপদের একমাত্র প্রতিজ্ঞা।
গত ১৮ সেপ্টেম্বর শুক্রবার জুমার নামাজ শেষ হতেই গ্রামের শত শত মানুষ লাঠিসোটা ও ভারি হাতুড়ি নিয়ে মোস্তফার দোতলা ভবনের ওপর চড়াও হন। দিন গড়িয়ে সপ্তাহ পার হয়ে ২৪ অক্টোবর শনিবার পর্যন্ত টানা চলেছে সেই ধ্বংসের তাণ্ডব।
শনিবার সকালে কুলোনিয়া গ্রামের সেই স্থানে গিয়ে দেখা যায় এক বিভীষিকাময় ধ্বংসস্তূপ। সেখানে যে কিছুদিন আগেও সুসজ্জিত একটি দোতলা বসতবাড়ি ছিল, তা বোঝার এখন আর কোনো ন্যূনতম সুযোগ নেই। পুরো বাড়িটি এখন ইট, বালি আর চূর্ণবিচূর্ণ কংক্রিটের এক বিরাট ধ্বংসস্তূপে রূপ নিয়েছে।
ধ্বংসের মাত্রা কতটা সুসংগঠিত ও গভীর, তা বোঝা যায় বাড়িটির ভিত্তিপ্রস্তর বা ফাউন্ডেশনের দিকে তাকালে। মাটির নিচে শক্ত করে প্রথিত থাকা রডের জালি পর্যন্ত বিশাল কাটার দিয়ে কেটে উপড়ে নিয়ে গেছে ক্ষুব্ধ মানুষ। পুরো বাড়িটি চুরমার করে ফেলার পর সেখান থেকে বের হওয়া ভাঙা ইট ও বালি ট্রাক ও পিকআপে করে অন্যত্র নিয়ে বিক্রি করে দেওয়া হচ্ছে।
বাড়িটির মাটি কেটে নিয়ে যাওয়ার কাজে ব্যস্ত থাকা স্থানীয় শ্রমিক সলিম প্রামানিক ঘাম মোছাতে মোছাতে নিজেদের এই অভূতপূর্ব ক্ষোভের ব্যাখ্যা দেন। তিনি বলেন, মোস্তফা নামের ওই নরপশু যে জঘন্য অপরাধ করেছে, তার কোনো ক্ষমা হতে পারে না। আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি তার পাপের কোনো স্মৃতি এই মাটিতে রাখব না।
সলিম জানান, তারা বাড়িটির ভিটের পুরো মাটি কেটে নিয়ে গ্রামের বিভিন্ন ভাঙাচোরা কাঁচা রাস্তায় ফেলে তা চলাচলের উপযোগী করছেন। মাটি কাটার প্রক্রিয়া শেষ হলে ওই বাড়ির জায়গায় একটি বিশালাকার পুকুর খনন করার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের, যাতে ভবিষ্যতে কেউ সেই স্থানটিকে কোনো বাড়ির জমি হিসেবে চিহ্নিত করতে না পারে।
বাড়ি ভাঙার পুরো প্রক্রিয়ায় সশরীরে অংশ নেওয়া পার্শ্ববর্তী আতাইকুলার মাধপুর এলাকার বাসিন্দা রুবেল হাসান একই সুর মোলেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানান, ধর্ষক ও খুনি মোস্তফার বাড়ির কোনো চিহ্ন এই কুলোনিয়া গ্রামে রাখা হবে না। এক দানা বালিও এখানে থাকবে না, পুরোটা পুকুর হয়ে যাবে। এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে নিদর্শন হিসেবে থাকবে—যাতে কেউ শিশু নির্যাতন করার আগে এই পরিণতির কথা ভেবে শিউরে ওঠে।
তবে রাজপথ ও আসামির ভিটেমাটিতে ক্ষুব্ধ জনপদের এই প্রতীকী বিচারের তোড়জোড় চললেও আদালতের মূল আইনি প্রক্রিয়া নিয়ে চরম হতাশা প্রকাশ করেছেন নিহত শিশু কামরুন্নাহার কলির শোকস্তব্ধ স্বজনেরা। ঘটনার দীর্ঘদিন অতিবাহিত হলেও পুলিশ এখনো আদালতে আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র বা চার্জশিট জমা না দেওয়ায় ক্ষোভে ফুটছেন তারা।
নিহত কলির পরিবার ও প্রতিবেশীদের অভিযোগ, পুলিশ প্রশাসন এই স্পর্শকাতর খুনের ঘটনার তদন্তে অস্বাভাবিক দীর্ঘসূত্রতা দেখাচ্ছে। তাদের আশঙ্কা, সময় যত গড়াচ্ছে, ততই আড়ালে চলে যাচ্ছে নৃশংস এই হত্যাকাণ্ডের সঠিক আইনি প্রতিকার। বিচারহীনতার এই দীর্ঘসূত্রতা স্বজনদের হৃদয়ে নতুন করে রক্তক্ষরণ ঘটাচ্ছে।
নিহত শিশুটির বয়োবৃদ্ধ দাদা আব্দুস সোবহান চোখের জল মুছে আক্ষেপের সুরে বলেন, এত দিন পার হয়ে গেলেও কেন পুলিশ চার্জশিট জমা দিচ্ছে না? এত দিনে তো চার্জশিট আদালতের টেবিলে জমা পড়ে যাওয়ার কথা ছিল। এখানে প্রশাসনের গাফিলতি ও উদাসীনতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
তিনি সরকারের উচ্চপর্যায় ও জেলা পুলিশ প্রশাসনের কাছে আকুল দাবি জানান, যেন দ্রুততম সময়ের মধ্যে তদন্তের কাজ শেষ করে বিচার প্রক্রিয়া শুরু করা হয়। যাতে খুনিরা কোনো আইনি ফাঁকফোকর দিয়ে বের হয়ে যেতে না পারে।
কলির আরেক নিকটাত্মীয় রমজান আলী কান্নাভেজা কণ্ঠে বিচার ব্যবস্থার জটিলতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন, চোখের সামনে একটা বিশাল দোতলা বাড়ি হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া শেষ হয়ে গেল। অথচ পুলিশের খাতায় নাকি এখনো তদন্তের কাগজপত্রের কাজ শেষই হয়নি। এটি অত্যন্ত দুঃখজনক।
রমজান আলী আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, আমাদের একমাত্র ভয় ও মূল দাবি হলো—এক নিষ্পাপ শিশুর এমন নৃসংশ হত্যার বিচার যেন কোনো প্রভাবশালী গোষ্ঠী বা টাকার কাছে বিক্রি না হয়ে যায়। পুলিশ প্রশাসনকে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ও আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করে অপরাধীদের ফাঁসির কাষ্ঠে ঝোলাতে হবে।
গ্রামবাসীর ক্ষোভ ও স্বজনদের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে পাবনা জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুস সালাম জানান, পুলিশি তদন্তে কোনো ধরনের ঢিলেঢালা ভাব নেই। মামলার কাজ অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে এগিয়ে চলেছে।
ডিবি ওসি আব্দুস সালাম আরও জানান, নিহত শিশুটির ফরেনসিক কেমিক্যাল রিপোর্ট ইতোমধ্যে হাসপাতাল থেকে পুলিশের হাতে পৌঁছেছে। আইনি ও বৈজ্ঞানিক তথ্য-প্রমাণ সুসংহত করে খুব দ্রুত সময়ের মধ্যেই আদালতে পূর্ণাঙ্গ চার্জশিট দাখিল করা হবে।
নৃশংস এই ঘটনার পেছনের অন্ধকার ইতিহাস পর্যালোচনা করলে উঠে আসে এক শিউরে ওঠার মতো চিত্র। গত ৯ সেপ্টেম্বর মাগরিবের নামাজের পরপরই নিজের কুলোনিয়া গ্রামের বাড়ি থেকে আকস্মিকভাবে নিখোঁজ হয় স্থানীয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রী কামরুন্নাহার কলি।
মেয়েটি নিখোঁজ হওয়ার পর থেকে পুরো পরিবার ও গ্রামবাসী দিকবিদিক ছুটতে থাকে। তবে সাত দিন ধরে টানা তল্লাশি চালিয়েও শিশুটির কোনো হদিস মেলেনি। অবশেষে গত ১৬ সেপ্টেম্বর সকালে গ্রামের পাশের এক নির্জন ডোবায় ভাসতে দেখা যায় এক রহস্যময় বস্তা।
খবর পেয়ে পুলিশ ও গ্রামবাসী গিয়ে সেই বস্তাটি ডাঙ্গা তুলে খুলে দেখতে পায় এক বিভীষিকাময় দৃশ্য। বস্তার ভেতরে রাখা ছিল শিশু কলির খণ্ডিত ও পচা-গলা মরদেহ। নিষ্পাপ ফুটফুটে মেয়েটির এই পরিণতি দেখে থমকে যায় পুরো পাবনা জেলা।
হত্যাকাণ্ডের সুনির্দিষ্ট ক্লু ধরে তদন্তে নেমে পুলিশ দ্রুতই গ্রেফতার করে প্রতিবেশী দোকানদার মোস্তফা কামাল এবং তার বাড়িতে ভাড়া থাকা ইয়াছিন আলীকে। গ্রেপ্তারের পর পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে উন্মোচিত হয় এক বীভৎস অপরাধের নীল নকশা।
পুলিশের তদন্ত মতে, ৯ সেপ্টেম্বর মাগরিবের আজানের পরপরই প্রতিবেশি মোস্তফা তার মুদি দোকানের পেছনের নির্জন কক্ষে ১০ বছরের শিশু কলিকে ভুলিয়ে নিয়ে গিয়ে পাশবিক নির্যাতন ও ধর্ষণ করে। এরপর ঘটনাচক্রে ধরা পড়ার ভয়ে তাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে।
হত্যাকাণ্ডের পর অপরাধ ধামাচাপা দিতে ভাড়াটিয়া ইয়াছিন আলীকে সাথে নিয়ে কলির নিথর দেহ একটি পাটের বস্তায় পুরে রাতের অন্ধকারে পাশের ডোবায় ফেলে দিয়ে আসে মোস্তফা। এরপর নিজেদের সম্পূর্ণ নির্দোষ প্রমাণ করতে তারা নিজেরাই স্বজনদের সাথে কলিকে খোঁজার নাটকে অংশ নেয়।
আদালতে নেওয়া হলে রিমান্ডের মুখোমুখি হয়ে মোস্তফা কামাল নিজের মুখে শিশুটিকে ধর্ষণ ও হত্যার রোমহর্ষক বর্ণনা দিয়ে স্বীকারোক্তি প্রদান করেন। তবে অপর গ্রেপ্তারকৃত ইয়াছিন আলী সরাসরি ধর্ষণ বা হত্যায় অংশ নেওয়ার কথা অস্বীকার করলেও, মরদেহ গুম করতে মোস্তফাকে সহায়তার কথা স্বীকার করেছেন।
পুলিশ জানায়, আলামত ও আসামিদের পোশাক ফরেনসিক ল্যাবরেটরিতে পাঠানো হয়েছিল। ফরেনসিক রিপোর্ট ও ডিএনএ প্রোফাইলিংয়ের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ হাতে পেলেই আদালতের টেবিলে অভিযোগপত্র পেশ করে বিচার কার্যক্রম ত্বরান্বিত করা হবে।
পাবনার এই শান্ত গ্রামে শিশু কলির অকালপ্রয়াণ ও নরপশু মোস্তফার ভিটেমাটি গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনাটি কেবল একটি সাধারণ অপরাধের খবর নয়। এটি বিচার ব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের ক্ষোভ এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে গ্রামীণ জনপদের এক প্রতিবাদী রূপ।
স্বজনদের একটাই চাওয়া, কোনো বাহ্যিক সামাজিক ক্ষোভ বা ঘরবাড়ি ভাঙচুর আসল বিচারের বিকল্প হতে পারে না। দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে মোস্তফা ও ইয়াছিনের ফাঁসি কার্যকর হওয়ার মধ্য দিয়েই কেবল এই ছোট্ট নিষ্পাপ আত্মার প্রতি প্রকৃত বিচার নিশ্চিত করা সম্ভব।
পাবনার জেলা প্রশাসন ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরাও এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে দ্রুত বিচারের দাবি তুলেছেন। তারা মনে করছেন, দ্রুত বিচার সুনিশ্চিত করা না গেলে জনমনে আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার প্রতি মারাত্মক অনাগ্রহ ও আস্থাহীনতা তৈরি হতে পারে।
শিশু সুরক্ষা ও মানবাধিকার নিশ্চিত করতে পাবনার কুলোনিয়া গ্রামের এই ঘটনাকে এক বিশেষ নজির হিসেবে দেখছেন আইন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, দ্রুততম সময়ে আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তি কার্যকর করাই হবে বিচার ব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের বিশ্বাস টিকিয়ে রাখার একমাত্র পথ।

