দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনৈতিক প্রাণকেন্দ্র এবং বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনের প্রাকৃতিক সুরক্ষাকে কেন্দ্র করে এক গুরুত্বপূর্ণ সরকারি সফরে সুন্দরবন ও মোংলা পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
বৃহস্পতিবার আকাশপথে ঐতিহ্যবাহী সুন্দরবনের রূপ দেখে মোংলায় নামেন রাষ্ট্রপ্রধান। এই সফর কেবল আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং উপকূলীয় অর্থনীতিতে নতুন জোয়ার আনার সংকেত।
আকাশ থেকেই সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল এবং এর নদীবেষ্টিত ইকোসিস্টেম খতিয়ে দেখেন প্রধানমন্ত্রী। পরিবেশ রক্ষা ও অর্থনীতির সুষম সমন্বয় ঘটাতে এই সফরকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ মনে করছেন নীতি-নির্ধারকরা।
বৃহস্পতিবার দুপুর ঠিক ১টায় নৌবাহিনীর ঘাঁটি বানৌজা মোংলায় পৌঁছায় প্রধানমন্ত্রীকে বহনকারী বিশেষ নৌযান। বন্দরে পৌঁছালে স্থানীয় প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও সামরিক বাহিনীর উচ্চপদস্থ প্রতিনিধিরা তাঁকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান।
এর আগে সুন্দরবনের অভ্যন্তরীণ প্রাকৃতিক বিন্যাস পর্যবেক্ষণের উদ্দেশ্যে সকাল ৯টায় তেজগাঁও বিমানবন্দর থেকে হেলিকপ্টারে রওনা হন তারেক রহমান। হিরণ পয়েন্টসহ বনের বিশাল অংশ ওপর থেকে প্রত্যক্ষ করেন তিনি।
সুন্দরবন পর্যবেক্ষণ শেষে সকাল সাড়ে ১০টায় খুলনার দাকোপ উপজেলার ঐতিহ্যবাহী নলিয়ান মাধ্যমিক বিদ্যালয় মাঠে অবতরন করে রাষ্ট্রপ্রধানকে বহনকারী হেলিকপ্টারটি। দাকোপে কিছু সময় অবস্থানের পর তিনি নলিয়ান লঞ্চঘাটের দিকে এগিয়ে যান।
নলিয়ান লঞ্চঘাট থেকে শুরু হয় তাঁর পানিপথের যাত্রা। রূপসা ও পশুর নদীর জলধারা পেরিয়ে নৌপথে মোংলার উদ্দেশে রওনা হন তিনি। নদীপথের এই যাত্রায় নদীনির্ভর মানুষের জীবনযাত্রাও প্রত্যক্ষ করেন তিনি।
পূর্বনির্ধারিত সফরসূচি অনুযায়ী, মোংলায় পৌঁছে কিছু সময় মধ্যাহ্নবিরতি নেন প্রধানমন্ত্রী। এরপর বানৌজা মোংলার ওয়ার্ডরুমের বিশেষ সভাকক্ষে আয়োজিত এক উচ্চপর্যায়ের প্রশাসনিক পর্যালোচনা সভায় যোগ দেন তিনি।
উন্নয়ন প্রকল্পের অগ্রগতি খতিয়ে দেখতেই দুপুরের পর থেকেই কর্মব্যস্ত সময় পার করেন তারেক রহমান। বিকালের কর্মসূচির শুরুতেই মোংলা বন্দরের প্রধান বাণিজ্যিক জেটি এলাকা সরজমিনে পরিদর্শন করেন তিনি।
বিকাল ৩টায় মোংলা বন্দরের জেটি পরিদর্শনের সময় বন্দরের কার্গো হ্যান্ডলিং, নাব্য সংকট এবং আধুনিক কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণের নানা প্রযুক্তিগত দিক নিয়ে কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী।
ports ও কাস্টমস কর্মকর্তাদের স্পষ্ট নির্দেশ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী জানান, মোংলা বন্দরকে আধুনিক প্রযুক্তিসম্পন্ন ও গতিশীল করতে সম্ভাব্য সব পদক্ষেপ দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে এর ভূমিকা বাড়ানোই মূল লক্ষ্য।
জেটি পরিদর্শন শেষ করে বিকেল সোয়া ৩টায় প্রস্তাবিত বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা)-এর নির্ধারিত অঞ্চলের উদ্দেশে যাত্রা করেন তিনি। অঞ্চলটিতে প্রস্তাবিত শিল্প অবকাঠামোর নকশা খতিয়ে দেখেন রাষ্ট্রপ্রধান।
বিকেল সাড়ে ৩টায় প্রস্তাবিত বেজা অর্থনৈতিক অঞ্চলের নির্ধারিত স্থানে পৌঁছান প্রধানমন্ত্রী। সেখানে শিল্প উদ্যোক্তা ও স্থানীয় ব্যবসায়িক প্রতিনিধিদের সাথে কথা বলেন এবং অর্থনৈতিক অঞ্চলের দ্রুত বাস্তবায়নে দিকনির্দেশনা দেন।
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনৈতিক রূপান্তরে মোংলা বন্দর ও বেজা অর্থনৈতিক অঞ্চলের যৌথ ভূমিকা অপার। সুন্দরবনের প্রাকৃতিক সুরক্ষা বজায় রেখেই কীভাবে এই অঞ্চলে শিল্পায়ন সম্ভব, তার সুনির্দিষ্ট রূপরেখা এই সফরে প্রতিফলিত হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রীর এই ঝটিকা সফরকে কেন্দ্র করে মোংলা, দাকোপ ও বাগেরহাট এলাকার সাধারণ মানুষের মাঝে ব্যাপক উৎসাহ ও উদ্দীপনা দেখা গেছে। দীর্ঘদিনের থমকে থাকা উন্নয়ন প্রকল্পগুলোতে নতুন গতি আসবে বলে আশা তাদের।
বিশেষ করে প্রস্তাবিত এলএনজি টার্মিনাল স্থাপন এবং মোংলা বন্দরের ড্রাজিং কাজ দ্রুত শেষ হলে মোংলা বন্দর কেন্দ্রিক আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে এক বিশাল বিপ্লব ঘটবে। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা এই নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে দাবি জানিয়ে আসছিলেন।
বাণিজ্যিক সম্ভাবনার পাশাপাশি সুন্দরবন-সংলগ্ন উপকূলীয় সাধারণ মানুষের প্রধান সংকট হলো বিকল্প কর্মসংস্থান। বনের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে প্রযুক্তিনির্ভর ও শিল্পমুখী কর্মসংস্থান তৈরি করাই এখন সময়ের প্রধান দাবি।
দীর্ঘদিনের অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং পশুর নদীর নাব্য সংকট কাটিয়ে উঠতে না পারলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মূল অর্থনৈতিক গতি থমকে যাবে। স্থানীয় সচেতন সমাজ প্রধানমন্ত্রীর এই সফরকে সেই জট খোলার চাবিকাঠি মনে করছেন।
মোংলা বন্দরকে আঞ্চলিক লজিস্টিক হাব হিসেবে গড়ে তুলতে প্রতিবেশীদের সাথে যুক্ত করার যে পরিকল্পনা রয়েছে, বেজা অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে উঠলে তা আরও বেশি বেগবান হবে। দেশি-বিদেশি বড় বিনিয়োগ আসার পথ সুগম হবে।
স্থানীয় মৎস্যজীবী এবং সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার মান উন্নয়নও এই সফরের অন্যতম অনুষঙ্গ। বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা না হলে কেবল আইন করে বন রক্ষা করা সম্ভব নয়।
প্রশাসন সূত্রের খবর, প্রস্তাবিত বাণিজ্যিক ও শিল্প অঞ্চলগুলোতে স্থানীয় যুবকদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে প্রশিক্ষণ ও চাকরির ব্যবস্থা করার বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের কর্মকর্তারা এ বিষয়ে তদারকি করছেন।
দিনভর মোংলা ও সুন্দরবন এলাকার একাধিক কর্মসূচি সফলভাবে সম্পন্ন করে বিকেলে তেজগাঁওয়ের উদ্দেশে আকাশপথে রওয়ানা দেওয়ার কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর। এক দিনের এই সংক্ষিপ্ত সফরে উপকূলীয় মানুষের প্রত্যাশা আকাশচুম্বী।
সুন্দরবনের ছায়াতলে গড়ে ওঠা সমুদ্রবন্দর আর শিল্পাঞ্চলগুলো যদি সঠিক রাজনৈতিক সদিচ্ছা পায়, তবে দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্ত কেবল সুরক্ষিতই হবে না, বরং গোটা দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তিতে পরিণত হবে।

