হাসপাতালের সাদা দেওয়াল আর চারপাশের কড়া আলোর মাঝে হঠাৎ করেই থেমে গেল একটি চিরচেনা প্রাণবন্ত পথচলা। মাত্র ৩৯ বছর বয়সে পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে চিরতরে বিদায় নিলেন মডেল, অভিনেত্রী ও উপস্থাপিকা তুলনা আল হারুন।
গত শুক্রবার গভীর রাতে রাজধানীর একটি স্বনামধন্য বেসরকারি হাসপাতালের আইসিইউতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। তাঁর এই আকস্মিক ও অকাল প্রয়াণে দেশের সংস্কৃতি অঙ্গনে নেমে এসেছে এক গভীর ও নিস্তব্ধ শোকের ছায়া।
খবরটি নিশ্চিত করেছেন তুলনার মা, সুপ্রিম কোর্টের বিশিষ্ট আইনজীবী আমেনা বেগম। মেয়ের নিথর দেহটি বুকে আগলে রেখে সংবাদমাধ্যমের কাছে তিনি কেবল ভাঙা গলায় এতটুকু বলতে পেরেছিলেন যে সব লড়াইয়ের শেষ হয়ে গেছে।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, গত বছরই তুলনার শরীরে বাসা বেঁধেছিল মারণ ক্যানসার। স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার পর থেকেই শুরু হয়েছিল তাঁর দীর্ঘ ও যন্ত্রণাদায়ক চিকিৎসা যুদ্ধ।
রাজধানীর বিভিন্ন নামী হাসপাতালে চলতে থাকে একের পর এক কেমোথেরাপি ও চিকিৎসকের নিবিড় পর্যবেক্ষণ। কিন্তু ক্যানসারের মারণ কোষগুলো তাঁর শরীরে এতটাই নীরবে ও দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছিল যে চিকিৎসকরাও শেষ পর্যন্ত আর পেরে ওঠেননি।
মৃত্যুর মাত্র কয়েক দিন আগে, গত মঙ্গলবার হাসপাতালে তাঁর একটি বড় অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়েছিল। সার্জারির পর প্রথম দুদিন তাঁর শারীরিক অবস্থার কিছুটা উন্নতিও দেখা গিয়েছিল বলে জানান পরিবারের সদস্যরা।
হাসপাতালের বেডে শুয়েই মা ও আপনজনদের সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলেছিলেন তুলনা। কে জানত, সেই টুকরো টুকরো কথোপকথনগুলোই হবে তাঁর জীবনের শেষ কথা।
শুক্রবার সকালের দিকে হঠাৎ করেই তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে শুরু করে। মুহূর্তের মধ্যে সব ওলটপালট হয়ে যায় চিকিৎসকদের চেষ্টার পরও।
চিকিৎসাধীন অবস্থায় শুক্রবার রাতে হঠাৎ করেই তাঁর ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাক হয়। এরপর আর সময় পাওয়া যায়নি, চিকিৎসকদের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে রাত এগারোটার দিকে তাঁকে মৃত ঘোষণা করা হয়।
একসময়ের ক্যামেরার সামনে হাসোজ্জ্বল মুখ আর নিখুঁত অভিনয়ের মানুষটি এভাবে নিথর হয়ে যাবেন, তা এখনো বিশ্বাস করতে পারছেন না তাঁর সহকর্মীরা। শনিবার দুপুর বারোটার দিকে রায়েরবাজার বুদ্ধিজীবী কবরস্থানের শান্ত মাটিতে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয় তাঁকে।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, জানাজা ও দাফনের আনুষ্ঠানিকতা খুব ছোট পরিসরে সম্পন্ন হয়েছে, যেখানে উপস্থিত ছিলেন তাঁর গুটিকয়েক ঘনিষ্ট আত্মীয় ও দীর্ঘদিনের সহকর্মীরা। প্রিয় মানুষটিকে শেষ বিদায় জানাতে গিয়ে অনেকের চোখেই জল জমেছিল।
তুলনার পারিবারিক পরিচয় বেশ সমৃদ্ধ। তিনি দেশের নাট্যাঙ্গনের কিংবদন্তি নাট্যকার ও নির্মাতা প্রয়াত আব্দুল্লাহ আল মামুনের ভাই আব্দুল্লাহ আল হারুনের কন্যা। শিল্পের আবহে বেড়ে ওঠা তুলনার রক্তেও ছিল সংস্কৃতির টান।
নব্বইয়ের দশক ও পরবর্তী সময়ে মডেলিংয়ের দুনিয়ায় নিজের একটি শক্ত অবস্থান তৈরি করেছিলেন তুলনা। সুশ্রী চেহারা ও সাবলীল উপস্থাপনার কারণে অল্প দিনেই ছোট পর্দার দর্শকদের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছিলেন তিনি।
বিজ্ঞাপনের বিলবোর্ড থেকে শুরু করে ফ্যাশন র্যাম্প কিংবা নাটকের পর্দা—সব জায়গাতেই ছিল তাঁর সরব উপস্থিতি। ক্যামেরার সামনে তাঁর সেই দীপ্ত উপস্থিতি আজও মনে রেখেছেন তাঁর অনুরাগীরা।
তবে সময়ের বিবর্তনে গত কিছু বছর ধরে তিনি মিডিয়ার নিয়মিত কাজ থেকে কিছুটা দূরে সরে গিয়েছিলেন। কিন্তু শিল্প সংস্কৃতির জগতের সঙ্গে তাঁর নাড়ির টান এবং সহকর্মীদের সঙ্গে স্নেহের সম্পর্ক কখনোই এক মুহূর্তের জন্যও কমেনি।
তুলনার এই অকাল মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শোকের ঝড় বইতে শুরু করে। নাট্য ও বিনোদন জগতের বহু পরিচিত মুখ তাঁর স্মরণে শ্রদ্ধাঞ্জলি জানিয়েছেন।
কেউ কেউ পুরোনো শুটিংয়ের স্মৃতিচারণ করেছেন, কেউ বা আবার ক্যানসারের মতো নির্মম রোগের কাছে একজন প্রাণোচ্ছ্বল মানুষের এভাবে হেরে যাওয়া মেনে নিতে পারছেন না।
একজন সহকর্মী লিখেছেন, তুলনা শুধু একজন ভালো শিল্পীই ছিলেন না, তিনি ছিলেন অত্যন্ত মিষ্টি স্বভাবের একজন মানুষ। ক্যানসারের সঙ্গে তাঁর এই অসম লড়াই আমাদের শিখিয়ে গেল জীবন কতটা ঠুনকো।
চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মতে, স্তন ক্যানসার এখন নারীদের জন্য এক নীরব ঘাতক হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রাথমিক পর্যায়ে রোগটি ধরা না পড়লে শেষ মুহূর্তে এসে অনেক সময় চিকিৎসকদের আর করার কিছু থাকে না।
তুলনার ক্ষেত্রেও রোগটি যখন ধরা পড়ে, ততদিনে অনেক দেরি হয়ে গিয়েছিল। তবুও তিনি যেভাবে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে গেছেন, তা তাঁর মনের জোরেরই প্রমাণ দেয়।
সংস্কৃতি অঙ্গনের অনেকেই মনে করছেন, তুলনা আল হারুনের মতো তরুণ শিল্পীদের এভাবে ঝরে যাওয়া পুরো দেশের জন্যই এক অপূরণীয় ক্ষতি। তাঁর স্মৃতিগুলো রয়ে যাবে ছোট পর্দার ফ্রেমে আর সহকর্মীদের হৃদয়ের গভীর কোণে।
পার্থিব জীবনের কোলাহল ছেড়ে তিনি আজ চলে গেছেন অনেক দূরে। রায়েরবাজারের ওই সাদা পাথরের ফলকের নিচে শান্তিতে ঘুমাচ্ছেন তুলনা, যাঁর হাসিমুখের দ্যুতি একদিন আলোকিত করেছিল আমাদের রঙিন টেলিভিশন স্ক্রিন।
জীবন সবসময় নিয়মের টানে চলে না। কখনো কখনো অপ্রত্যাশিত কোনো মেঘ এসে আনন্দগুলোকে হঠাৎ করেই ঢেকে দেয়, যেমনটা ঘটে গেল তুলনার ক্ষেত্রে।
তাঁর হাসিমুখের স্মৃতিগুলো এখন কেবলই অ্যালবামের পাতায় আর ভক্তদের হৃদয়ে জমা হয়ে রইল। ক্যানসারের বিরুদ্ধে লড়ে যাওয়া এই সাহসী নারী সবার স্মৃতিতে চিরজাগরূক হয়ে থাকবেন।
পরিবারের সদস্যরা এই চরম শোক কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছেন। কিন্তু তাঁদের এই শূন্যতা কোনোভাবেই পূরণ হওয়ার নয়, যা প্রতিটি স্বজনের চোখেই স্পষ্ট ফুটে উঠছে।
শিল্প সংস্কৃতির এই শহরে প্রতিদিন কত মুখই তো হারিয়ে যায় স্মৃতির অতলে। কিন্তু কিছু প্রয়াণ হৃদয়ে গভীর ক্ষত রেখে যায়, যা সহজে মোছার নয়।
তুলনার হাসিমুখ আর মৃদু কণ্ঠস্বর তাঁর সহকর্মীদের মানসপটে দীর্ঘকাল প্রতিধ্বনিত হতে থাকবে। এই কঠিন বাস্তবতাকে মেনে নেওয়া ছাড়া ভক্তদের আর কোনো উপায় নেই।
অসুস্থতার সঙ্গে লড়াই করার প্রতিটি মুহূর্তে তিনি দেখিয়েছেন অবিশ্বাস্য ধৈর্য। চিকিৎসকদের সর্বোচ্চ চেষ্টা সত্ত্বেও শেষরক্ষা হয়নি, যা আমাদের মনে করিয়ে দেয় জীবনের নশ্বরতা।
আজ যখন তাঁকে চিরদিনের মতো বিদায় জানানো হলো, তখন চারপাশের বাতাসেও যেন এক গভীর বিষাদের সুর বাজছিল। প্রকৃতির নিয়মেই সব হারিয়ে যায়, কিন্তু কিছু স্মৃতি চিরকাল বেঁচে থাকে।
আমাদের মিডিয়াঙ্গন আজ একজন প্রতিভাবান ও নিরহংকার শিল্পীকে হারাল। তাঁর আত্মার শান্তি কামনা করে প্রার্থনা করছেন দেশের অজস্র গুণগ্রাহী ও শুভানুধ্যায়ী।

