বলিউডের সোনালি যুগের আরও একটি নক্ষত্রের পতন হলো। ভারতীয় চলচ্চিত্রের পরিচিত মুখ, অভিনেত্রী মধু মালহোত্রা আর নেই। রোববার বিকেলে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৭২ বছর। সত্তরের দশক থেকে নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত হিন্দি সিনেমার পর্দায় নিজের অভিনয় প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে যাওয়া এই অভিনেত্রীর প্রয়াণে বিনোদন জগতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
মধুর চলচ্চিত্র যাত্রা শুরু হয়েছিল এক রোমাঞ্চকর ঘরানা দিয়ে। ১৯৭৫ সালে বিখ্যাত ‘র্যামসে ব্রাদার্স’-এর হাত ধরে বলিউডে অভিষেক ঘটে তার। সে সময়ের জনপ্রিয় ভৌতিক ঘরানার চলচ্চিত্রে তার উপস্থিতি দর্শকদের নজর কেড়েছিল। এরপর আর তাকে পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। নিজের অভিনয় দক্ষতায় একে একে সুযোগ পেতে থাকেন শক্তি সামন্ত ও রমেশ সিপ্পির মতো প্রবাদপ্রতিম পরিচালকদের সিনেমায়।
যদিও মধু মালহোত্রা ক্যারিয়ারের অধিকাংশ সময় পার্শ্বচরিত্রে অভিনয় করেছেন, কিন্তু ছোট ছোট চরিত্রগুলোকেও তিনি জীবন্ত করে তুলতেন। বিশেষ করে সুভাষ ঘাইয়ের কালজয়ী ছবি ‘হিরো’-র কথা দর্শক ভুলবে না। সেই ছবির বিখ্যাত গান ‘লম্বি জুদাই’-তে তার সাবলীল পর্দার উপস্থিতি আজও প্রবীণ সিনেমা প্রেমীদের স্মৃতিতে অমলিন। বিষাদমাখা সেই দৃশ্যায়নে মধুর অভিব্যক্তি ছিল এক কথায় অনবদ্য।
দীর্ঘ ক্যারিয়ারে মধু অভিনয় করেছেন বলিউডের কয়েক প্রজন্মের মহাতারকাদের সঙ্গে। অমিতাভ বচ্চন, ঋষি কাপুর এবং রাকেশ রোশনের সমসাময়িক হওয়ার পাশাপাশি তিনি কাজ করেছেন অনিল কাপুর, শ্রীদেবী এবং আমির খানের মতো তারকাদের সাথেও। এমনকি নব্বইয়ের দশকের শেষে রানী মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গেও পর্দায় দেখা গেছে তাকে। তার অভিনীত শেষ ছবিটি ছিল ২০০০ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘ও বেওয়াফা থি’।
অভিনয় জগৎ থেকে গত দুই দশকে অনেকটা আড়ালে চলে গিয়েছিলেন এই অভিনেত্রী। নিভৃত জীবন যাপন করলেও পুরনো সহকর্মী ও ভক্তরা তাকে ভুলে যাননি। তার মৃত্যুর সংবাদ ছড়িয়ে পড়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেক অভিনয়শিল্পী শোক প্রকাশ করেছেন। তারা স্মৃতিচারণ করেছেন মধুর পেশাদারিত্ব এবং অমায়িক ব্যবহারের কথা।
১৯৮০ এবং ৯০-এর দশকে হিন্দি সিনেমার যে বিবর্তন ঘটেছিল, মধু মালহোত্রা ছিলেন তার অন্যতম সাক্ষী ও অংশীদার। মেইনস্ট্রিম কমার্শিয়াল ছবিতে যে কজন পার্শ্বচরিত্রের শিল্পী নিজের আলাদা পরিচয় গড়ে তুলতে পেরেছিলেন, মধু ছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম। বিশেষ করে ট্র্যাজেডি ও ইমোশনাল দৃশ্যে তার পারদর্শিতা তাকে পরিচালকদের আস্থার তালিকায় রেখেছিল।
বয়সজনিত নানা সমস্যায় ভুগছিলেন এই প্রবীণ অভিনেত্রী। তার পারিবারিক সূত্রে জানানো হয়েছে, বার্ধক্যজনিত অসুস্থতার কারণেই তার মৃত্যু হয়েছে। মুম্বাইয়ে তার শেষকৃত্য সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে। মধুর প্রয়াণ যেন বলিউডের সেই পরিচ্ছন্ন অভিনয়ের যুগের একটি অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটাল।
রুপালি পর্দার এই গুণী শিল্পী হয়তো আজ শারীরিক অনুপস্থিতিতে চলে গেলেন না ফেরার দেশে, কিন্তু তার অভিনীত অসংখ্য চলচ্চিত্র এবং বিশেষ করে ‘লম্বি জুদাই’-এর সেই দীর্ঘ বিচ্ছেদ আজ যেন তার জীবনের শেষ বিদায়ের করুণ সুর হয়েই বাজছে ভক্তদের হৃদয়ে। ভারতীয় চলচ্চিত্রে তার অবদান ছোট করে দেখার সুযোগ নেই, কারণ পার্শ্বচরিত্রের বলিষ্ঠ অভিনয়ই একটি সিনেমাকে পূর্ণতা দেয়।

