পাহাড়ের কোল ঘেঁষে চলা আঁকাবাঁকা পথে অনিশ্চয়তা আর গভীর উৎকণ্ঠার দীর্ঘ ঘণ্টা পেরিয়ে অবশেষে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছেন রাঙ্গামাটির সাজেকে আটকেপড়া শত শত পর্যটক।
স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর নিরাপত্তাবলয় ও সাহসিকতার সুবাদে বৃহস্পতিবার দুপুরে তারা সবাই নিরাপদে খাগড়াছড়ি জেলা শহরে এসে পৌঁছান।
পাহাড়ে চলমান বিভিন্ন রাজনৈতিক অস্থিরতা ও লাগাতার অবরোধের জেরে গত কয়েক দিন ধরে সাজেকে আটকা পড়েছিলেন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ঘুরতে যাওয়া সাধারণ মানুষ।
ভয়ের সেই চাদর ভেদ করে সেনাবাহিনী ও পুলিশের যৌথ পাহারায় দীর্ঘ পাহাড়ি পথ পাড়ি দিয়ে গন্তব্যে ফিরে আসার এই রোমহর্ষক অভিজ্ঞতা ভুলতে পারছেন না কেউ।
বৃহস্পতিবার সকাল পৌনে নয়টার দিকে সাজেক রুইলুই পাড়া থেকে পর্যটকবাহী গাড়িগুলোর সুশৃঙ্খল বহরটি খাগড়াছড়ির উদ্দেশে রওনা দেয় বলে নিশ্চিত করেছেন রাঙ্গামাটি জেলা পুলিশ সুপার।
পথিমধ্যে একাধিক স্থানে স্থানীয় রাজনৈতিক অবরোধকারীদের বাধার মুখে পড়তে হয়েছিল এই বহরটিকে, যা পাহাড়ি জনপদের ভঙ্গুর নিরাপত্তা পরিস্থিতিকেই পুনরায় উন্মোচিত করেছে।
সকাল সাড়ে এগারোটার দিকে সাজেক সংযোগ সড়কের নির্দিষ্ট কিছু পয়েন্টে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও অবরোধকারীদের মধ্যে তুমুল ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও গোলাগুলির ঘটনা ঘটে।
অবরোধকারীরা হঠাৎ করেই সড়কের ওপর বিশাল গাছ ও বাঁশ ফেলে কৃত্রিম প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে এবং নিরাপত্তাবাহিনীর সদস্যদের লক্ষ্য করে মুহুর্মুহু ইটপাটকেল ছুড়তে শুরু করে।
পরিস্থিতি যখন চরম আকার ধারণ করে এবং পর্যটকদের জীবন মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়ে, তখন আত্মরক্ষা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পাল্টা গুলি চালাতে বাধ্য হয় যৌথ বাহিনী।
সৌভাগ্যবশত ওই সংঘর্ষের সময় তাৎক্ষণিকভাবে বড় ধরনের কোনো হতাহতের বা রক্তক্ষয়ের খবর পাওয়া যায়নি, যা আটকে থাকা পর্যটকদের মনে কিছুটা হলেও স্বস্তি এনে দিয়েছিল।
দুপুর পৌনে একটার দিকে সমস্ত বাধা ও শঙ্কাকে পেছনে ফেলে পর্যটকবাহী গাড়িগুলোর ওই দীর্ঘ বহরটি শেষ পর্যন্ত খাগড়াছড়ি শহরের নিরাপদ সীমানায় প্রবেশ করতে সক্ষম হয়।
প্রিয়জনদের কাছে ফিরে আসার এই রোমাঞ্চকর যাত্রার গল্প বলতে গিয়ে অনেক পর্যটকের চোখেই তখন পানি চলে আসে, যা পাহাড়ের সাম্প্রতিক ট্যুরিজম খাতের সংকটকে ফুটিয়ে তোলে।
ঢাকা থেকে তিন দিনের ছোট্ট অবকাশ যাপনে বুধবার সাজেকে পৌঁছানো পর্যটক আবুল কাশেম সংবাদমাধ্যমের কাছে নিজের সেই বিভীষিকাময় অভিজ্ঞতার কথা শেয়ার করেন।
তিনি জানান, পাহাড়ে পৌঁছানোর পরপরই সন্ধ্যার দিকে হঠাৎ জানতে পারেন যে চারদিকে রাজনৈতিক অবরোধ শুরু হয়েছে এবং সাধারণ মানুষের যাতায়াত পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে।
অগ্রিম টাকা দিয়ে গাড়ি ভাড়া করা এবং রিটার্ন টিকিট থাকা সত্ত্বেও আকস্মিক এই গোলযোগের কারণে তাদের পুরো ভ্রমণটি চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে গিয়েছিল।
হবিগঞ্জ থেকে ঘুরতে আসা আরেক পর্যটক অপু জানান, সাজেকে আনন্দ উপভোগ করতে গিয়ে তাদের পুরো সময়টা কেবল অজানা আতঙ্ক ও দুশ্চিন্তার মাঝেই কেটেছে।
সন্ধ্যা নামলেই পাহাড়ি সড়কে টহলরত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গাড়ির শব্দ আর নানা গুজবের মাঝে বিনিদ্র রাত কাটাতে হয়েছে তাদের মতো সাধারণ ভ্রমণপিপাসুদের।
শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সরাসরি হস্তক্ষেপে এবং তাদের সাঁজোয়া গাড়ির নিরাপত্তায় পাহাড়ি উপত্যকা পেরিয়ে খাগড়াছড়িতে নামতে পেরে তারা নিজেদের ভাগ্যবান মনে করছেন।
ফেরার পথে অন্তত দুটি ভিন্ন স্থানে বড় ধরনের সড়ক অবরোধের মুখে পড়েছিল তাদের কাফেলাটি, যেখানে নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতি না থাকলে বড় ধরনের বিপদ ঘটতে পারত।
অবরোধকারীরা যখন বৃষ্টির মতো ইটপাটকেল ছুড়ছিল, তখন সেনা সদস্যরা অত্যন্ত পেশাদারিত্বের সঙ্গে গাড়িগুলোকে নিরাপদে সেই সংঘাতপূর্ণ এলাকা পার করে নিয়ে যান।
পাহাড়ে পর্যটকদের যাতায়াত সুরক্ষিত রাখতে এই ধরণের যৌথ পাহারা ও উদ্ধার অভিযান ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে বলে স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
তবে বারবার এ ধরনের রাজনৈতিক সংঘাত ও অবরোধের কারণে সাজেক ও এর আশেপাশের পাহাড়ি অঞ্চলের পর্যটন শিল্প এখন বড় ধরনের ধ্বংসের মুখে পতিত হয়েছে।
হোটেল-মোটেল মালিক সমিতি ও রিসোর্ট ব্যবসায়ীদের মতে, প্রতিবার এমন সহিংসতার ঘটনা ঘটলে দেশের পর্যটকরা পাহাড়ে ভ্রমণে আসার উৎসাহ চিরতরে হারিয়ে ফেলেন।
হাজার হাজার তরুণ উদ্যোক্তা যারা এই ট্যুরিজম ব্যবসায়ের ওপর নির্ভর করে নিজেদের জীবিকা নির্বাহ করছিলেন, তারা এখন অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছেন।
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি সাজেক ভ্যালিতে এমন উত্তেজনাকর পরিস্থিতির স্থায়ী সমাধান না হলে পাহাড়ের অর্থনীতিতে এর দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
স্থানীয় সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা মনে করেন, সাধারণ পর্যটকদের কোনো রাজনৈতিক স্বার্থের বলি না বানিয়ে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সবার সম্মিলিত নৈতিক দায়িত্ব।
সরকার এবং স্থানীয় রাজনৈতিক পক্ষগুলোর মধ্যে ফলপ্রসূ সংলাপের মাধ্যমে পাহাড়ের সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা বজায় রাখার পরিবেশ ফিরিয়ে আনা জরুরি।
খাগড়াছড়ি এসে পৌঁছানোর পর প্রশাসনের পক্ষ থেকে পর্যটকদের নিজ নিজ গন্তব্যে বা বাসে করে নিরাপদে ঢাকায় ফেরার জন্য বিশেষ বাস ও যাতায়াতের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
বিপদ কাটিয়ে বাড়ি ফেরার পথে থাকা এই মানুষগুলো এখন কেবলই বলছেন, পাহাড়ের এই অপার সৌন্দর্য যেন আর কখনো বারুদের গন্ধে ভারী হয়ে না ওঠে।
পাহাড়ি জনপদের এই অস্থিরতা কেবল সাজেক এলাকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং পুরো রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়ি জেলার যোগাযোগ ব্যবস্থাকেও স্থবির করে দিয়েছে।
প্রশাসনের তরফ থেকে জানানো হয়েছে যে পর্যটকদের সুরক্ষায় সেনাবাহিনীর কনভয় সার্ভিস নিয়মিত পরিচালনা করা হবে যাতে কেউ আর সড়কে আটকে না পড়েন।
ছুটির দিনে সাজেকে আনন্দ করতে গিয়ে এমন অবরুদ্ধ অবস্থার মুখে পড়বেন কেউ তা ঘুণাক্ষরেও ভাবতে পারেননি বলে জানিয়েছেন উদ্ধার হওয়া একাধিক পর্যটক।
ভ্রমণপিপাসুরা আশা প্রকাশ করেছেন যে খুব দ্রুত রাজনৈতিক দল ও প্রশাসন মিলে এই সংকটের একটি শান্তিপূর্ণ ও টেকসই সমাধান খুঁজে বের করবে।
অন্যথায় পাহাড়ি অঞ্চলের এই অপার সম্ভাবনাময় পর্যটন খাত দীর্ঘ মেয়াদে মুখ থুবড়ে পড়বে এবং হাজারো মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়বেন।
বর্তমানে খাগড়াছড়ি থেকে নিরাপদে নিজেদের গন্তব্যের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছেন ভ্রমণকারীরা, তবে তাদের মনের কোণে রয়ে গেছে পাহাড়ের এই উত্তেজনার স্মৃতি।
দেশের সর্বউত্তরের পাহাড়ি সীমান্ত এলাকার এমন অস্থিতিশীল পরিবেশ পর্যটনবান্ধব মানসিকতাকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে বলে মনে করছেন পর্যটন বিশ্লেষকেরা।
প্রতিটি ছুটির দিনে হাজারো মানুষের পদচারণায় মুখর থাকা মেঘের রাজ্য সাজেক ভ্যালি গত কয়েক দিনে যেন এক অচিনপুর ও নিঃসঙ্গ দ্বীপে পরিণত হয়েছিল।
খাদ্যপণ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ায় স্থানীয় কটেজ ও রিসোর্টের মালিকরাও চরম বিপদের মধ্যে দিনাতিপাত করেছেন।
এমনকি অনেক পর্যটক অতিরিক্ত খরচ করে এবং দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও নির্ধারিত সময়ে ফিরতে না পেরে গভীর মানসিক যন্ত্রণার শিকার হয়েছেন।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জানিয়েছে, পাহাড়ে শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে এবং পর্যটকদের অবাধ চলাচল নিশ্চিত করতে টহল জোরদার করা হয়েছে।
স্থানীয় প্রশাসন দ্রুততম সময়ের মধ্যে পর্যটন কেন্দ্রগুলোকে পুরোপুরি ঝুঁকিমুক্ত ঘোষণা করার জন্য নানামুখী কূটনৈতিক ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ নিয়ে কাজ করছে।
সাজেক ভ্যালির রুইলুই এবং কংলাক পাড়ার স্থানীয় বাসিন্দারাও পর্যটকদের এই আকস্মিক আটকা পড়ার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
পাহাড়ে ব্যবসা-বাণিজ্য ও জীবনযাত্রার স্বাভাবিক গতি ফিরিয়ে আনতে উভয় পক্ষের শুভবুদ্ধির উদয় হবে বলে তারা আশা করছেন।
এদিকে যারা এখনো খাগড়াছড়ির বিভিন্ন হোটেলে অবস্থান করছেন, তাদের নিরাপদে নিজ নিজ জেলাগুলোতে পৌঁছে দিতে বিশেষ সহায়তা দিচ্ছে জেলা প্রশাসন।
পর্যটকদের নিরাপত্তার বিষয়টি মাথায় রেখে আগামী কয়েক দিন পাহাড়ি সড়কগুলোতে বিশেষ নজরদারি বজায় রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী।
প্রকৃতির অনন্য সৌন্দর্যের টানে ছুটে যাওয়া মানুষগুলোর এই তিক্ত অভিজ্ঞতা পাহাড়ের পর্যটন শিল্পের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা হয়ে রইল।
স্থানীয়দের মতে, সংঘাতের পথ ছেড়ে পর্যটন ও অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে পাহাড়ি অঞ্চলে স্থায়ী শান্তির বিকল্প নেই।
উদ্বিগ্ন পরিবারগুলোর অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে খাগড়াছড়ি থেকে ছেড়ে যাওয়া বাসগুলো ধীরে ধীরে রাজধানী ঢাকার দিকে এগিয়ে চলেছে।
পাহাড়ের বাঁকে বাঁকে লুকিয়ে থাকা সবুজ প্রকৃতির মাঝে এমন উত্তেজনার কালো মেঘ কেটে যাক—এটাই এখন প্রতিটি ভ্রমণপিপাসুর হৃদয়ের প্রদীপ্ত কামনা।

