কক্সবাজারের সমুদ্র উপকূলীয় বাতাস জুড়ে এখন শুধুই বিষাদ আর দীর্ঘশ্বাসের ভারি প্রভাব। ইনানীর মেরিন ড্রাইভসংলগ্ন পাটুয়ারটেক এলাকায় কাঠের তৈরি টুপটুপ রিসোর্টের ছাইভস্মের ভেতর থেকে উদ্ধার হওয়া ১০টি মরদেহের কোনোটিই আর খালি চোখে চেনার উপায় নেই।
আগুনের তীব্র শিখা ও বিষাক্ত ধোঁয়ায় লাশগুলো এমনভাবে দগ্ধ হয়েছে যে, কোনো প্রথাগত উপায়ে সেগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয় নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না। প্রিয়জনকে শেষবারের মতো স্পর্শ করার আকুতি নিয়ে কক্সবাজার সদর হাসপাতালের হিমঘরের সামনে এখন করুণ সময় পার করছেন দুর্ঘটনাকবলিত পরিবারগুলো।
সোমবার দুপুরে বৈজ্ঞানিক পরিচয় শনাক্তকরণের জটিল আইনি কাঠামোর আনুষ্ঠানিক রূপরেখা প্রকাশ করেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। উদ্ধার হওয়া মরদেহগুলোর সুরতহাল ও নমুনা সংগ্রহের সার্বিক আইনি প্রক্রিয়া শেষে চূড়ান্ত রিপোর্টের দিকে তাকিয়ে রয়েছে ভুক্তভোগী পরিবারসমূহ।
কক্সবাজার সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) সুবক্তগীন মাহমুদ সোহেল সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে অত্যন্ত ভারী কণ্ঠে বিষয়টি স্পষ্ট করেন। তিনি জানান, পুরো ডিএনএ প্রোফাইলিং ও তুলনামূলক জিনগত মেলানোর প্রক্রিয়াটি শেষ হতে ন্যূনতম তিন থেকে চার সপ্তাহ পর্যন্ত সময় লেগে যেতে পারে।
চিকিৎসা কর্মকর্তা ড. সোহেল আরও বিশদভাবে জানান, নিহতদের প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয় শতভাগ সুনিশ্চিত করার লক্ষ্যেই এই দীর্ঘ ও সংবেদনশীল বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি বেছে নিতে হচ্ছে। সামান্য ভুলের কারণে যেন কোনো ভুল পরিবারের হাতে লাশ না যায়, সে বিষয়ে আন্তর্জাতিক ফরেনসিক প্রোটোকল কঠোরভাবে মানা হচ্ছে।
রোববার বিকেলের মধ্যেই জেলা সদর হাসপাতালের সংরক্ষিত আধুনিক হিমঘরে থাকা ১০টি অজ্ঞাত মরদেহের প্রতিটি থেকে প্রয়োজনীয় রক্তের টিস্যু, হাড় ও দাঁতের ফরেনসিক আলামত সংগ্রহ করা হয়। ল্যাবরেটরি পরীক্ষার উপযুক্ত এই নমুনায় সিলগালা মেরে সন্ধ্যায় আনুষ্ঠানিকভাবে তা উখিয়া থানা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করে মেডিকেল বোর্ড।
সংগৃহীত এই বিশেষ জৈব আলামতগুলো কেবল মরদেহের একক পরীক্ষার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। নিখোঁজ পর্যটকদের সুনির্দিষ্ট স্বজন যেমন বাবা-মা, ভাই-বোন কিংবা সন্তানদের সশরীরে সংগৃহীত ডিএনএ প্রোফাইলের সঙ্গে হাসপাতাল থেকে সংগৃহীত ডাটা সরাসরি মেলানো হবে।
মেডিকেল সায়েন্সের কঠোরতম এই জেনোটাইপিং টেস্টে যখন দুটি নমুনায় শতভাগ মিল পাওয়া যাবে, কেবল তখনই প্রশাসনিক ছাড়পত্রের মাধ্যমে সেই নিথর দেহটি যথাযথ স্বজনের কাছে হস্তান্তর করা হবে। ফলে প্রক্রিয়াটি নিখুঁত করার খাতিরেই এক মাসের মতো দীর্ঘ প্রহর গুনতে হচ্ছে পরিবারগুলোকে।
অগ্নিকাণ্ড ও হৃদয়বিদারক এই ঘটনার সুনির্দিষ্ট মামলার অন্যতম প্রধান দায়িত্বপ্রাপ্ত তদন্তকারী কর্মকর্তা হলেন উখিয়া থানার উপপরিদর্শক (এসআই) রিমন ঘোষ। তিনি নিশ্চিত করেছেন যে, হাসপাতাল থেকে প্রাপ্ত সকল স্পর্শকাতর নমুনা অত্যন্ত সুরক্ষার সাথে বিশেষ লজিস্টিক সাপোর্ট দিয়ে ঢাকার উদ্দেশে পাঠানো হয়েছে।
রাজধানীর মালিবাগে অবস্থিত পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) কেন্দ্রীয় ফরেনসিক ল্যাবরেটরিতে সংগৃহীত নমুনাগুলো জমা দেওয়া হয়েছে। দেশের সবচেয়ে আধুনিক ও নির্ভরযোগ্য এই ডিএনএ বিশ্লেষণ কেন্দ্রে এখন দিনরাত এক করে কাজ চলবে বলে আশ্বাস দিয়েছে পুলিশ।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই রিমন ঘোষ জোর দিয়ে বলেন, আমরা প্রতিটি পরিবারের মানসিক যন্ত্রণা ও ব্যাকুলতা খুব কাছ থেকে প্রত্যক্ষ করছি। মালিবাগ সিআইডি ল্যাবে যাতে দ্রুততম সময়ের মধ্যে কেমিক্যাল অ্যানালিসিস শেষ করা যায়, সে জন্য সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে কাজ পরিচালনা করার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
তবে শুধু পুলিশের একার পদক্ষেপে এই দীর্ঘ কাজ দ্রুত শেষ করা সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেন তদন্তকারী পুলিশ কর্মকর্তা। নিখোঁজদের নিকটাত্মীয়দের নিজ দায়িত্বে মালিবাগ সিআইডি কার্যালয়ে সশরীরে উপস্থিত হয়ে নিজেদের রক্ত ও লালার নমুনা সরবরাহ করার জন্য আকুল আহ্বান জানানো হয়েছে।
এই মর্মান্তিক ট্র্যাজেডিতে সবচেয়ে বড় আঘাতটি পড়েছে ঢাকার বাসিন্দা রিয়াজ মাহমুদ রিপনের কপালে। পরিবারের আনন্দযাত্রায় একই সাথে নিজের ঘরের ছয়জন প্রিয় মানুষকে হারিয়ে তিনি এখন মানসিকভাবে পুরোপুরি ভেঙে পড়েছেন।
রিয়াজ মাহমুদ সংবাদকর্মীদের জানান, খবর পাওয়ার পর পরই তাদের পরিবারের চারজন সরাসরি প্রতিনিধি সোমবার সকালে মালিবাগের সিআইডি সদর দপ্তরে গিয়ে রক্ত ও লালার নমুনা জমা দিয়ে এসেছেন।
অসহায় রিপনের একটাই আকুতি, প্রশাসনের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও ল্যাবের দীর্ঘ তালিকা যেন তাদের এই কফিনের অপেক্ষায় নতুন করে যন্ত্রণা না বাড়ায়। তারা চান অন্তত ধর্মীয় নিয়মকানুন মেনে লাশগুলো দ্রুত নিজ নিজ গ্রামের বাড়িতে দাফন করার অনুমতি দেওয়া হোক।
অন্যদিকে ইনানীর সমুদ্র ঘেঁষে গড়ে ওঠা টুপটুপ কটেজের সেই পোড়া গন্ধকে পিছে ফেলে কক্সবাজারের মর্গের সামনে টানা দুই দিন ধরে অপলক চোখে বসে আছেন ফয়সাল দেওয়ান। তাঁর জীবনের সবচেয়ে প্রিয় মানুষ, স্ত্রী নাসরিন আক্তার মুক্তার নিথর দেহটির সন্ধানেই তাঁর এই করুণ সমুদ্রযাত্রা।
হাত জোড় করে অঝোর ধারায় কাঁদতে কাঁদতে ফয়সাল দেওয়ান বলেন, হাসপাতাল থেকে ডাক্তাররা যখন বলছেন যে স্ত্রী মুক্তার লাশ পেতে এক মাস অপেক্ষা করতে হবে, তখন বুকের ভেতরের আগুন দ্বিগুণ বেড়ে যায়। প্রশাসন কি এই বৈজ্ঞানিক কাজটি আরও মানবিক ও দ্রুততার সাথে সম্পন্ন করতে পারে না?
ফয়সালের কণ্ঠে ছিল চরম এক জীবনবোধ ও গভীর ক্ষোভের মিশ্রণ। তিনি স্বগতোক্তির মতো উচ্চারণ করেন, আমি জানি যে বিধাতার নির্মম নিয়মে আমার স্ত্রী নাসরিন আক্তার মুক্তাকে আমি আর কোনো দিন কোনো হাসিমুখে ফিরে পাব না। কিন্তু আমি চাই, সরকারি ব্যবস্থার এমন পরিবর্তন হোক যেন কোনো স্বামীকে আর এভাবে বউয়ের দেহের খোঁজে হাসপাতালের বারান্দায় ঘুরতে না হয়।
ফয়সাল দেওয়ানের মতো দূরদূরান্ত থেকে আসা অন্যান্য স্বজনদের চোখের জল প্রমাণ করছে, আমাদের অননুমোদিত কটেজ ও কাঠামো কীভাবে সাধারণ মানুষের সাজানো সংসারকে এক নিমেষে ধ্বংসের ছাই করে দিয়েছে। স্বজনদের এই আর্তনাদ উখিয়া এবং সমুদ্রপাড়ের সাধারণ মানুষের হৃদয়কে গভীরভাবে নাড়া দিচ্ছে।
উল্লেখ্য, ১৭ অক্টোবর সকালের প্রথম প্রহরে মেরিন ড্রাইভের বুক চিরে দাঁড়িয়ে থাকা সম্পূর্ণ কাঁচা ও কাঠের তৈরি টুপটুপ রিসোর্টটিতে হঠাৎই দাউ দাউ করে আগুন ধরে যায়। মুহূর্তের মধ্যে ভবনের নিচতলার গ্যাস সিলিন্ডার ও রেস্তোরাঁ থেকে ছড়িয়ে পড়া বিষাক্ত ধোঁয়ায় ওপরের তলায় ঘুমন্ত ১০ জন পর্যটক আটকা পড়ে অগ্নিদগ্ধ হন।
উখিয়ার সেই মর্মান্তিক ট্র্যাজেডির প্রকৃত ও নিরপেক্ষ কারণ অনুসন্ধান করতে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সাত সদস্যের এক শক্তিশালী উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত দলের সদস্যরা ইতোমধ্যে দুর্ঘটনাস্থল ঘুরে দেখেছে এবং রিসোর্টটির অবৈধ কাঠামো নিয়ে তথ্য সংগ্রহ করছে।
ইনানী সমুদ্রসৈকত ও আশেপাশের অসংখ্য ঝুলন্ত কাঁচা রিসোর্টে নেই কোনো সুনির্দিষ্ট ফায়ার সেফটি প্রোটোকল কিংবা জরুরি নির্গমন পথ। মাত্র কয়েক হাজার টাকার ব্যবসায়িক লাভের আসায় নিরাপত্তার তোয়াক্কা না করে কীভাবে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের বুকিং নেওয়া হচ্ছিল, তা নিয়ে দেশজুড়ে তোলপাড় চলছে।
ফায়ার সার্ভিস প্রধানের ভাষ্য অনুযায়ী, রিসোর্টটিকে আগেভাগেই ‘লাল নোটিশ’ এবং ঝুঁকিপূর্ণ সনদ দেওয়ার পরও কেন পুলিশ ও জেলা প্রশাসন রিসোর্টটি বন্ধ করে দেয়নি—সেই আইনি উত্তরও এখন সাধারণ মানুষের দাবির মুখে উঠে এসেছে। অবহেলার প্রতিটি স্তর এখন তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন।
আইনি প্রক্রিয়ার মারপ্যাঁচে এবং প্রযুক্তির দীর্ঘ সূত্রে কফিনের সারিগুলো এখন মর্গেই জমা হয়ে থাকছে। ঢাকার মালিবাগ সিআইডি ল্যাবের ফরেনসিক দলের ওপর এখন ঝুলে আছে ১০টি পরিবারের শেষ দেখা ও দাফন করার করুণ ভাগ্য।
কক্সবাজারের নয়নাভিরাম নীল জলরাশির পাশে আজ যে পোড়া কাঠ আর ডিএনএ টেস্টের তালিকা ঝুলছে, তা কেবল একটি দুর্ঘটনা নয়—এটি আমাদের ভঙ্গুর প্রশাসনিক নজরদারির এক নির্মম ও করুণ ছবি। স্বজনেরা চান অন্তত এই ১০টি লাশ ফেরত পাওয়ার মাধ্যমে এই নরকযন্ত্রণা থেকে সাময়িক মুক্তি।
প্রতিটি দিন ও প্রতিটি ঘণ্টা এখন কক্সবাজার হাসপাতালের মর্গের বাইরে অপেক্ষারত মানুষের কাছে এক বছরের সমতুল্য মনে হচ্ছে। ঢাকার সিআইডি সেন্টার থেকে কখন সেই বিশেষ ডিএনএ ম্যাচিংয়ের ফোন কলটি আসবে, এখন শুধুই সেই একটিমাত্র শেষ সংবাদের প্রতীক্ষায় প্রহর গুনছে রক্তঝরা স্বজনেরা।
পরিশেষে বলা যায়, পর্যটকদের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করার বিষয়ে রাষ্ট্র ও প্রশাসনের এই চোখ বন্ধ রাখার সংস্কৃতি বন্ধ হওয়া জরুরি। আর কোনো পরিবারকে যেন স্বপ্নের ছুটি কাটাতে এসে এভাবে প্রিয়জনের শরীরের টুকরো শনাক্ত করার জন্য আইনি ও বৈজ্ঞানিক হাহাকারের মুখোমুখি হতে না হয়, সেটাই আজকের প্রধান দাবি।

