কক্সবাজারের উখিয়ায় মেরিন ড্রাইভসংলগ্ন পাটুয়ারটেক সৈকতের কাঠের তৈরি টুপটুপ রিসোর্টে মর্মান্তিক অগ্নিকাণ্ডে ১০ পর্যটকের মৃত্যুর ঘটনায় অবশেষে আইনি পদক্ষেপ শুরু হয়েছে। ভয়াবহ এই অগ্নিকাণ্ড ও অবহেলার অভিযোগে প্রতিষ্ঠানটির মালিক তানভীর সুলতান মিয়াকে প্রধান আসামি করে মামলা দায়ের করেছে উখিয়া থানা পুলিশ।
শনিবারের অগ্নিকাণ্ডে ১০টি তাজা প্রাণ ছাই হয়ে যাওয়ার পর রোববার সকালে উখিয়া থানায় পুলিশ বাদী হয়ে বিশেষ মামলাটি রুজু করে। অননুমোদিত ও ঝুঁকিপূর্ণ কাঁচা কাঠামোয় বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে পর্যটকদের জীবন বিপন্ন করার অভিযোগ আনা হয়েছে আসামিদের বিরুদ্ধে।
মামলার এজাহারে চারজনের নাম সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রধান আসামি রিসোর্ট মালিক তানভীর সুলতান মিয়া ছাড়া অন্যান্য আসামিরা হলেন তার মূল ব্যবসায়িক অংশীদার নিয়াজ মোরশেদ এবং প্রতিষ্ঠানটির রেস্টুরেন্ট ম্যানেজার মোহাম্মদ সুমন। তদন্তের স্বার্থে অভিযুক্ত চতুর্থ আসামির নাম এখনই প্রকাশ করেনি পুলিশ।
অগ্নিদগ্ধ হয়ে প্রাণহানির এই ঘটনায় পুলিশ ইতোমধ্যে এক আসামিকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছে। গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তি হলেন রিসোর্টের রেস্টুরেন্ট ম্যানেজার মোহাম্মদ সুমন। শনিবার সন্ধ্যায় উখিয়ার একটি গোপন আস্তানা থেকে তাকে আটক করে থানায় নেওয়া হয়।
উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুর রহমান রোববার সকালে ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, পুলিশের পক্ষ থেকেই বাদী হয়ে মামলাটি দায়ের করা হয়েছে। গ্রেপ্তারকৃত আসামিকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে এবং মূল মালিক তানভীরসহ পলাতক অন্য আসামিদের ধরতে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
পাটুয়ারটেক সৈকতের নৈসর্গিক পরিবেশে গড়ে তোলা তিনতলা কাঠের এই রিসোর্টটিতে শনিবার সকাল সাড়ে সাতটার দিকে হঠাৎ আগুন লাগে। নিচতলার রেস্তোরাঁ থেকে ছড়িয়ে পড়া বিষাক্ত ধোঁয়া ও আগুনের লেপন কাঠের কাঠামো বেয়ে নিমেষের মধ্যে ওপরের তলাগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা পরে দুর্ঘটনাস্থল থেকে ১০ জনের নিষ্প্রাণ মরদেহ উদ্ধার করেন।
নিহতদের স্বজনদের জন্য সবচেয়ে বড় বেদনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে মরদেহ শনাক্তকরণ। আগুনে দগ্ধ হয়ে নিহত ১০ জনের শরীর এতটাই ভস্মীভূত ও বিকৃত হয়ে গেছে যে খালি চোখে দেখে কারো পরিচয় নিশ্চিত করা পুরোপুরি অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
উখিয়া থানা পুলিশ জানিয়েছে, নিহতদের সুনির্দিষ্ট পরিচয় নিশ্চিত করতে দ্রুততম সময়ের মধ্যে ডিএনএ পরীক্ষার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। লাশের নমুনা সংগ্রহ করে ল্যাবরেটরিতে পাঠানো হবে। ডিএনএ প্রোফাইলিংয়ের রিপোর্ট মেলার পরই আনুষ্ঠানিকভাবে স্বজনদের কাছে মরদেহ হস্তান্তর করা যাবে।
শনিবারের এই হৃদয়বিদারক দুর্ঘটনার পর পাটুয়ারটেক ও ইনানী সৈকত এলাকায় গভীর শোক ও ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। সমুদ্রের নোনা বাতাসের মধ্যে এখন পোড়া কাঠের গন্ধ আর স্বজনহারাদের কান্নার শব্দ। ঘুরতে এসে স্বজনকে এভাবে হারিয়ে বাকরুদ্ধ বহু পরিবার।
ফায়ার সার্ভিস সূত্রে আগেই জানা গিয়েছিল, তিনতলা কাঠের তৈরি এই টুপটুপ রিসোর্টটির কোনো বৈধ ফায়ার লাইসেন্স ছিল না। নিচতলায় বিপজ্জনকভাবে রান্নাবান্নার এলপিজি গ্যাস ব্যবহার করা হতো, আর ওপরের দুই তলায় রাখা হয়েছিল পর্যটকদের থাকার সুসজ্জিত ঘর।
চলতি বছরের জুনে ফায়ার সার্ভিসের পরিদর্শক দল রিসোর্টটি ঘুরে দেখে সেটিকে চরম ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ আখ্যা দিয়ে লাল নোটিশ ঝুলিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু সেই আইনি সতর্কবার্তা পুরোপুরি তোয়াক্কা না করেই রিসোর্ট মালিক তানভীর ও তার সহযোগীরা অবাধে পর্যটক বুকিং নেওয়া চালিয়ে যান।
উখিয়া থানার পুলিশ জানায়, কেবল প্রশাসনিক নোটিশ দিয়ে বা সতর্ক করে দায় এড়ানো সম্ভব নয়। এই অনাকাঙ্ক্ষিত অগ্নিকাণ্ডে যাদের সরাসরি গাফিলতি ও বাণিজ্যিক লোভ কাজ করেছে, তাদের প্রত্যেককে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হবে।
অননুমোদিত কাঠের স্থাপনা এবং অগ্নিনিরাপত্তাহীন পর্যটন কেন্দ্রগুলোর ওপর সরকারের মনিটরিং কতটা দুর্বল, এই দশটি তরতাজা প্রাণের মৃত্যু তা আরও একবার নির্মমভাবে প্রমাণ করল। পর্যটকদের জীবন সুরক্ষায় উখিয়া ও কক্সবাজার এলাকার অন্যান্য রিসোর্টগুলোতেও এবার পুলিশের নজরদারি বাড়ানোর দাবি উঠেছে।
গ্রেপ্তারকৃত রেস্টুরেন্ট ম্যানেজার সুমনকে আদালতে পাঠিয়ে রিমান্ডের আবেদন জানানো হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ। তাকে জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে অগ্নিকাণ্ডের দিন ঠিক কীভাবে আগুনের সূত্রপাত হয়েছিল এবং ফায়ার সেফটির কী কী ঘাটতি ছিল, তা জানার চেষ্টা চলছে।
এদিকে প্রধান আসামি তানভীর সুলতান মিঞা ও তার অংশীদার নিয়াজ মোরশেদ ঘটনার পর থেকেই আত্মগোপনে রয়েছেন। তাদের অবস্থান শনাক্ত করতে পুলিশের একাধিক টিম মাঠে নেমেছে। মোবাইল ট্র্যাকিং ও প্রযুক্তিগত সহায়তায় আসামিদের আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে।
উখিয়া থানার ওসি আতিকুর রহমান আশ্বাস দিয়েছেন যে, অধিকতর তদন্ত শেষে মামলার ধারা আরও কঠোর করা হতে পারে। স্বজন হারানো পরিবারগুলো যেন আদালতের মাধ্যমে দ্রুত ন্যায়বিচার পায়, সে বিষয়ে কোনো ধরনের শিথিলতা প্রদর্শন করা হবে না।
আইনি প্রক্রিয়া ও ডিএনএ পরীক্ষার বাধ্যবাধকতার কারণে কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালের মর্গে এখন অপেক্ষা দীর্ঘ হচ্ছে স্বজনদের। একেকটি ঘণ্টার প্রতীক্ষা স্বজনদের হৃদয়ে নতুন করে রক্তক্ষরণ ঘটাচ্ছে। নিহতদের পরিবারের একটাই দাবি—দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক বিচার ও এমন অননুমোদিত রিসোর্টের বিরুদ্ধে স্থায়ী প্রশাসনিক ব্যবস্থার।
কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় জেলা প্রশাসন যৌথভাবে ইনানী পাটুয়ারটেক এলাকার অন্যান্য কাঁচা ও ঝুঁকিপূর্ণ রিসোর্টগুলোতে চিরুনি অভিযান চালানোর পরিকল্পনা করছে। একটি নিরাপদ পর্যটন শিল্প গড়ে তুলতে নিয়ম অমান্যকারী মালিকদের কোনো ছাড় না দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে উখিয়া থানা পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসন।
কক্সবাজারের নয়নাভিরাম সমুদ্রসৈকত বরাবর গড়ে ওঠা পর্যটন অবকাঠামো নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই পরিবেশবাদী ও নিরাপত্তা গবেষকরা শঙ্কা প্রকাশ করে আসছিলেন। কেবল টুপটুপ রিসোর্ট নয়, ইনানী ও পাটুয়ারটেক অঞ্চলের আরও একাধিক রিসোর্ট কোনো প্রকার প্রশাসনিক অনুমতি ও অগ্নিপ্রতিরোধ ব্যবস্থা ছাড়া গড়ে উঠেছে। পর্যটকদের আকর্ষণ করতে বাহারি নকশার কাঠের প্যানেল ও ছন ব্যবহার করা হলেও এসব উপাদানের জ্বালানি ক্ষমতা যে কত মারাত্মক, তা এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার মাধ্যমেই উন্মোচিত হলো।
শনিবারের অগ্নিকাণ্ডের পর স্থানীয় গ্রামবাসী ও পথচারীরা প্রাথমিক উদ্ধারকাজ শুরু করলেও নিচতলার তীব্র আগুনের শিখার কারণে তারা ওপরে আটকা পড়া পর্যটকদের কাছে পৌঁছাতে পারেননি। তদুপরি দুর্ঘটনাস্থল থেকে নিকটতম ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের দূরত্ব ২২ কিলোমিটার হওয়ায় ফায়ার ফাইটারদের পৌঁছাতে বেশ কিছুটা মূল্যবান সময় নষ্ট হয়। ওই সময়ের মধ্যেই পুরো কাঠের আবাসনটি কাঠকয়লায় পরিণত হয় এবং ওপরের তলায় থাকা পর্যটকরা ধোঁয়ায় দমবন্ধ হয়ে এবং আগুনে দগ্ধ হয়ে প্রাণ হারান।
কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালের জরুরি বিভাগে এখন এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য বিরাজ করছে। দেশের দূরদূরান্ত থেকে ছুটে আসা স্বজনেরা লাশের ছবি ও পরনের কাপড়ের টুকরো দেখে প্রিয়জনকে শনাক্ত করার আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছেন। কিন্তু আগুনে দগ্ধ মরদেহের অবস্থা দেখে অনেকেই বাকরুদ্ধ হয়ে পড়ছেন। পুলিশ সদস্যরা স্বজনদের সান্ত্বনা দেওয়ার পাশাপাশি ডিএনএ নমুনার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার কাজে সহায়তায় নিয়োজিত রয়েছেন।
পুলিশ কর্মকর্তা আতিকুর রহমান আরও জানান যে, এই মামলার তদন্তে কোনো ধরনের শিথিলতা বা বাইরের প্রভাব সহ্য করা হবে না। প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে যে রিসোর্টটি পরিচালনার জন্য স্থানীয় জেলা প্রশাসন বা কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের কোনো বৈধ ছাড়পত্র ছিল না। সরকারি বিধিমালা তোয়াক্কা না করে কীভাবে দীর্ঘ দিন ধরে একটি বাণিজ্যিক আবাসন সচল ছিল, তা নিয়ে তদন্ত কমিটির তরফ থেকে বিস্তারিত প্রতিবেদন পেশ করা হবে।
একই সাথে ইনানীতে অননুমোদিত কটেজ ও রিসোর্ট নির্মাণের পেছনে স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের ইন্দন ছিল কি না, তাও পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার নজরদারিতে রয়েছে। রিসোর্ট মালিক তানভীর সুলতান মিঞা ও তার সহযোগীদের সব ধরনের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ও ব্যবসায়িক নথিপত্র খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পলাতক থাকা আসামিরা যেন সীমান্ত অতিক্রম করতে না পারে, সে জন্য সীমান্ত এলাকার চেকপোস্টগুলোতে বাড়তি সতর্কতা জারি করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
পর্যটন খাতের ভাবমূর্তি রক্ষায় এই ঘটনার দ্রুত বিচার ও দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন পর্যটন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী অ্যাসোসিয়েশনের নেতৃবৃন্দ। তারা বলছেন, কতিপয় অসাধু ও নিয়ম অমান্যকারী ব্যবসায়ীর জন্য পুরো পর্যটন শিল্প আজ চরম ঝুঁকিতে পড়েছে। প্রতিটি রিসোর্টে অগ্নিপ্রতিরোধক সরঞ্জাম নিশ্চিত না করা পর্যন্ত কোনো স্থাপনাকে বাণিজ্যিক অনুমোদন না দেওয়ার জোর দাবি উঠে এসেছে বিভিন্ন মহল থেকে।
পাটুয়ারটেকের সমুদ্র বাতাসে এখনও পোড়া কাঠের ছাই আর ভারী বিষাদ ভেসে বেড়াচ্ছে। ছুটি কাটাতে আসা ১০টি পরিবারের হাসিমুখ যে এভাবে কফিনে বন্দি হয়ে ফিরে যাবে, তা কেউ কল্পনাও করতে পারেনি। স্বজনদের দীর্ঘশ্বাস আর আইনি লড়াইয়ের সূচনা নিয়ে পুরো উখিয়া সীমান্ত এখন এক চরম থমথমে ও বিষাদময় দিন অতিক্রম করছে।
সংশ্লিষ্ট আইনি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোনো প্রতিষ্ঠানকে ফায়ার সার্ভিস বা অন্য সংস্থা থেকে ঝুঁকিপূর্ণ নোটিশ দেওয়ার পরও ব্যবস্থা না নিয়ে ফেলে রাখা একটি বড় প্রশাসনিক দুর্বলতা। শুধু কাগজপত্র বা সতর্কীকরণ নোটিশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থেকে যদি ঘটনার সময়ই রিসোর্টটি সিলগালা বা বন্ধ করে দেওয়া হতো, তবে এই ১০টি জীবনের এমন করুণ পরিণতি হতো না। তাই ঘটনার তদন্তে এই প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতার বিষয়টিও আসা উচিত।
হৃদয়বিদারক এই ট্র্যাজেডি কক্সবাজারের পর্যটন খাতে এক দীর্ঘমেয়াদী দাগ ফেলে দিল। সাধারণ পর্যটকদের মনে যে ভীতির সঞ্চার হয়েছে, তা কাটাতে কেবল তদন্ত বা মামলা নয়, বরং প্রতিটি সৈকত এলাকায় আন্তর্জাতিক মানের ফায়ার সার্ভিস স্টেশন ও নিয়মিত অগ্নিনিরাপত্তা পরীক্ষা জরুরি। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ভ্রমণ করার দিন শেষ হওয়া দরকার—এমনটিই মনে করছেন সচেতন দেশের মানুষ।

