ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লির কেন্দ্রস্থলে চলমান রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও ঝটিকা পদযাত্রাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এক উত্তপ্ত নাটকের পর আদালতের নির্দেশে অবশেষে মুক্তি পেয়েছেন ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে।
শনিবার সকালে দিল্লির একটি স্থানীয় আদালতের নির্দেশে জামিন পান এই আলোচিত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। আইনি শর্ত পূরণের অংশ হিসেবে তাঁকে ৫০ হাজার ভারতীয় রুপির আর্থিক বন্ড জমা দিতে হয়েছে এবং ভবিষ্যতে রাজপথে শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখার প্রতিশ্রুতি সংবলিত লিখিত মুচলেকায় স্বাক্ষর করতে হয়েছে।
আদালতের যাবতীয় বিচারিক ও প্রশাসনিক আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হওয়ার পর শনিবার দুপুরের আগেই রাজধানীর মন্দির মার্গ থানা থেকে সশরীরে বেরিয়ে আসেন অভিজিৎ দীপকে। এর আগে শুক্রবার বিকেলে কনট প্লেস এলাকায় আয়োজিত ‘লেহরা দো তিরঙ্গা’ বা জাতীয় পতাকা উড্ডয়ন পদযাত্রায় অংশ নিতে যাওয়ার সময় পথেই তাঁকে আটক করে পুলিশ।
একই কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের (এআইএসএ) সর্বভারতীয় সভাপতি নেহা বোরাকেও শুক্রবার পুলিশি হেফাজতে নেওয়া হয়েছিল। তবে দিল্লি পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, জরুরি আইনি আনুষ্ঠানিকতা শেষে শনিবার ভোরের আলো ফোটার আগেই তাঁকে থানা থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
তবে সিজেপির শীর্ষ নেতৃত্বের একাংশের জন্য স্বস্তি মিললেও দুই নেতা এখনও গরাদের ওপারে দিন কাটাচ্ছেন। দলটির অন্যতম দুই পরিচিত মুখ আশুতোষ রঙ্কা এবং সৌরভ দাস আদালতের আদেশে সরাসরি বিচারবিভাগীয় হেফাজতে রয়েছেন। মূলত যন্তর মন্তরের মতো সংবেদনশীল এলাকায় অনধিকার প্রবেশের অপরাধেই তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়।
প্রশাসন ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, দিল্লির অন্যতম প্রধান বিক্ষোভস্থল যন্তর মন্তর ও আশপাশের এলাকায় অনাকাঙ্ক্ষিত অস্থিতিশীলতা এড়াতে গত সপ্তাহেই সার্বজনীন প্রতিবাদ কর্মসূচির ওপর কড়া নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল স্থানীয় কর্তৃপক্ষ। তবে সেই সরকারি নির্দেশনা অমান্য করেই সেখানে অবস্থান নেন সিজেপি কর্মীরা।
শুক্রবার সন্ধ্যার ঠিক মুখোমুখি সময়ে কনট প্লেসে সিজেপি ও সহযোগী ছাত্র সংগঠনগুলোর যৌথ উদ্যোগে একটি বড় ধরনের জাতীয় পতাকাবাহী পদযাত্রা শুরু হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু কর্মসূচি আনুষ্ঠানিকভাবে মাঠে গড়ানোর আগেই তড়িঘড়ি করে অভিজিৎ দীপকে এবং নেহা বোরাকে আটক করে পুলিশি স্কোয়াড।
পুলিশ প্রশাসনের দাবি অনুযায়ী, পুরো এলাকাটির নিরাপত্তা ও জনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে তাদের আগাম সতর্কতা হিসেবে ‘প্রতিরোধমূলক হেফাজতে’ নেওয়া হয়েছিল। পদযাত্রার মূল লক্ষ্য ছিল হাতে জাতীয় পতাকা নিয়ে শহরের প্রধান রাজপথে একটি সুসংগঠিত শোভাযাত্রা বের করা, যা ঘিরে বড় ধরনের জটলা তৈরির আশঙ্কা ছিল।
তবে মূল নেতাদের পথেই আটকে দিলেও শিক্ষার্থীদের গতি পুরোপুরি রুদ্ধ করা যায়নি। পুলিশের বসানো উঁচু ব্যারিকেড ও কড়া নজরদারি উপেক্ষা করেই সাধারণ শিক্ষার্থী এবং তরুণেরা হাতে তেরঙা জাতীয় পতাকা নিয়ে ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে রাজপথে নেমে পড়েন এবং ঝটিকা পদযাত্রা শুরু করেন।
পুলিশ কর্মকর্তাদের তথ্য মতে, শিক্ষার্থী নেত্রী নেহা বোরাকে দিল্লি পুলিশ আইনের সুনির্দিষ্ট ধারায় সাময়িক সময়ের জন্য আটক রাখা হয়েছিল। প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার শেষ ধাপে শনিবার প্রথম প্রহরেই তাঁকে মুক্তি দেওয়া হয়। তবে অভিজিৎ দীপকের ক্ষেত্রে আইনি জটিলতা তৈরি করে নতুন মামলা।
অভিজিৎ দীপকের বিরুদ্ধে ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতার (বিএনএসএস) সুনির্দিষ্ট ১২৬ এবং ১৭০ ধারায় শান্তিশৃঙ্খলা লঙ্ঘনের অভিযোগে আলাদা মামলা ঠুকে দেয় দিল্লি পুলিশ। পরবর্তীকালে সেই মামলার অধীনেই তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেপ্তার দেখিয়ে শনিবার বিচারকের কাছে উপস্থাপন করা হয়েছিল।
ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনে অভিজিৎ দীপকে এবং তাঁর দলকে ঘিরে এমন আইনি লড়াই ও নাটকীয় আটকের ঘটনা অবশ্য এবারই প্রথম নয়। এর আগেও তিনি একাধিকবার পুলিশের নজরদারিতে এসেছিলেন এবং একইভাবে থানা থেকে ছাড়া পেয়েছিলেন।
খুব সম্প্রতি গত ১০ অক্টোবর দিল্লি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে দাঁড়িয়ে থাকা একটি যাত্রীবাহী বিমানের ভেতর থেকে তাঁকে অত্যন্ত নাটকীয় ভঙ্গিতে আটক করেছিল পুলিশ। সেই সময়ও বিমানে বিশৃঙ্খলা ও জনশান্তি ভঙ্গের অভিযোগ আনা হয়েছিল এই রাজনৈতিক নেতার বিরুদ্ধে।
বিমানবন্দরের সেই ঘটনার পর এক বছরের জন্য রাজপথে বা প্রকাশ্যে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা তৈরি না করার অঙ্গীকার সংবলিত একটি আইনি মুচলেকায় স্বাক্ষর করতে হয়েছিল তাঁকে। তবে সেই মেয়াদের মধ্যেই আবারও কনট প্লেসের রাজপথে নেমে নতুন করে পুলিশের মুখোমুখি হলেন তিনি।
দিল্লির মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং কড়া নিরাপত্তায় ঘেরা প্রশাসনিক কেন্দ্রস্থলে একই ব্যক্তির বারবার গ্রেপ্তার ও মুচলেকা দিয়ে ছাড়া পাওয়ার বিষয়টি এখন স্থানীয় সংবাদমাধ্যম এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
অধিকারকর্মীরা বলছেন, জাতীয় পতাকা হাতে নিয়ে মিছিল করা কিংবা শান্তিপূর্ণভাবে নিজেদের রাজনৈতিক মতামত ব্যক্ত করা ভারতের সংবিধানসম্মত মৌলিক অধিকার। তবে সেই গণতান্ত্রিক কর্মসূচিতে একের পর এক আইনি বাধা দেওয়া দেশের বাকস্বাধীনতার ওপর একধরনের বৈষম্যমূলক চাপ তৈরি করছে।
অন্যদিকে পুলিশ প্রশাসনের অবস্থান একদম ভিন্ন। রাজধানীর আন্তর্জাতিক রূপ ও নিত্যদিনের যান চলাচল স্বাভাবিক রাখার স্বার্থেই শহরের কেন্দ্রস্থলে এ জাতীয় ঝটিকা কর্মসূচির ওপর কড়াকড়ি আরোপ করা জরুরি হয়ে পড়েছে বলে দাবি সরকারি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর।
সিজেপি এবং সহযোগী ছাত্র সংগঠনগুলোর নেতাকর্মীদের অভিযোগ, দিল্লি পুলিশ আগাম আশঙ্কার দোহাই দিয়ে রাজনৈতিক কর্মীদের কণ্ঠরোধ করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে। তবে কোনো বাধা কিংবা আইনি মামলার ভয় দেখিয়ে রাজপথের এই লড়াই থেকে আন্দোলনকারীদের পেছনে সরানো যাবে না বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তাঁরা।
আদালতের বন্ড ও মুচলেকা মেনে সাময়িকভাবে মুক্ত হলেও অভিজিৎ দীপকের ওপর এখন কঠোর প্রশাসনিক নজরদারি বহাল থাকবে। জামিনের যেকোনো একটি শর্ত অমান্য করা হলেই তাঁর জমাকৃত অর্থ বাজেয়াপ্ত হওয়ার পাশাপাশি আবারও গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হতে পারে।
এদিকে যন্তর মন্তরের নিষিদ্ধ সীমানায় প্রবেশের অভিযোগে বিচারবিভাগীয় হেফাজতে থাকা আশুতোষ রঙ্কা ও সৌরভ দাসের আইনি লড়াই আগামী দিনে কোনো দিকে মোড় নেয়, সেদিকে নজর রাখছেন তাঁদের আইনি দলের সদস্যরা। খুব শিগগিরই তাঁদের জামিনের জন্য উচ্চ আদালতে আবেদন করা হবে বলে জানা গেছে।
ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লির বুকে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিবাদের अधिकार এবং পুলিশের প্রশাসনিক কড়াকড়ির যে দ্বিমুখী লড়াই শুরু হয়েছে, কনট প্লেসের এই সাম্প্রতিক ঘটনা তারই এক স্পষ্ট প্রতিফলন। আইনি বেড়াজালের মধ্য দিয়েই এখন সিজেপিকে তাদের পরবর্তী রাজনৈতিক পদক্ষেপের পরিকল্পনা করতে হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, দিল্লির রাজপথে উত্তাপ কমেনি। অভিজিৎ দীপকের মুক্তি সাময়িক স্বস্তি দিলেও যন্তর মন্তর ও কনট প্লেসের থমথমে পরিবেশ বলে দিচ্ছে, আগামী দিনগুলোতে নয়াদিল্লির রাজনীতিতে এমন আরও আইনি ও সামাজিক টানাটান দৃশ্যমান হতে যাচ্ছে।
দিল্লির সাধারণ পথচারীদের কাছে এই নাটকীয় আটক ও মুক্তি নতুন কিছু না হলেও জাতীয় পতাকাকে ঘিরে গড়ে ওঠা আন্দোলন ও আইনি টানাপোড়েন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশ চর্চার জন্ম দিয়েছে। পুলিশের পদক্ষেপ বনাম নাগরিকদের প্রতিবাদের অধিকার—এই দুইয়ের ভারসাম্য কীভাবে রক্ষা হয়, সেটাই এখন ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনের বড় প্রশ্ন।
নতুন ফৌজদারি আইনের ধারাগুলো প্রয়োগ করে যেভাবে রাজনৈতিক নেতাদের গ্রেপ্তার ও মুচলেকার মুখোমুখি করা হচ্ছে, তা দেশের বিচারিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসের এক নতুন অধ্যায় তৈরি করছে। এই পরিস্থিতিতে সিজেপি তাদের দলীয় কর্মসূচি কীভাবে সামনে এগিয়ে নেয়, তা দেখতে মুখিয়ে আছেন দিল্লির সচেতন নাগরিক সমাজ।
রাজধানীর রাজপথে ক্ষমতার এই টানাপোড়েন কেবল একটি দলের অস্তিত্বের লড়াই নয়, বরং ভারতের সামগ্রিক রাজনৈতিক কাঠামোর এক স্পর্শকাতর চিত্র তুলে ধরে। সরকারের কড়াকড়ি নীতি এবং তরুণ প্রজন্মের স্বাধীন মত প্রকাশের আকাঙ্ক্ষার মধ্যবর্তী এই সংঘাত আগামী দিনে আরও কী রূপ নেয়, তা সময়ই বলে দেবে।
সিজেপি নেতৃত্বের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে আদালতের নির্দেশকে সম্মান জানিয়েই তারা পরবর্তী সব রাজনৈতিক পথচলা সাজাবে। তবে সাধারণ মানুষের অধিকার রক্ষা এবং আইনি নিপীড়নের বিরুদ্ধে তাঁদের সোচ্চার কণ্ঠস্বর থামানো যাবে না বলেও স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন দলটির সমর্থকেরা।
দিল্লির মন্দির মার্গ থানার বাইরে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে সিজেপির স্থানীয় প্রতিনিধিরা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, একটি গণতান্ত্রিক দেশে জাতীয় পতাকা হাতে মিছিলে নামা কোনো অপরাধ হতে পারে না। কিন্তু পুলিশি ক্ষমতা ব্যবহার করে রাজপথের শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে থামিয়ে দেওয়ার নজির দিন দিন বাড়ছে।
আইনবিদদের একাংশের মতে, নতুন ফৌজদারি কার্যবিধির অধীন এসব প্রতিরক্ষামূলক ধারার ব্যবহার পুলিশের ক্ষমতাকে বহুলাংশে বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে খুব সহজেই যেকোনো জনসমাবেশ বা রাজনৈতিক পদযাত্রাকে বেআইনি বা শান্তিশৃঙ্খলা ভঙ্গের কারণ হিসেবে চিহ্নিত করে পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হচ্ছে।
দিল্লির বর্তমান রাজনৈতিক আবহে সিজেপি ও এআইএসএ-র যৌথ প্রতিরোধ কর্মসূচিগুলো যে ভবিষ্যতে পুলিশি নজরদারির প্রধান কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠবে, সে ইঙ্গিত স্পষ্ট। কনট প্লেসের এই সাম্প্রতিক ঘটনাটি ভারতের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে রাজনৈতিক সংগ্রামের এক জটিল ও ক্ষোভময় সমীকরণকেই নতুন করে সামনে নিয়ে এল।
দিল্লির সচেতন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, আদালতের এই আদেশ সাময়িক একটি আইনি বিরতি মাত্র। তবে আগামী দিনগুলোতে যন্তর মন্তর বা কনট প্লেসের মতো জায়গায় সিজেপি কীভাবে তাদের মাঠপর্যায়ের আন্দোলন বজায় রাখে, তার ওপরই নির্ভর করছে দলটির ভবিষ্যৎ রাজপথের ভাগ্য।

