মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক ময়দানে নতুন করে গভীর শঙ্কার মেঘ জমতে শুরু করেছে। ওয়াশিংটনের সঙ্গে চলমান দীর্ঘ ছায়াযুদ্ধ আর সংঘাতকে আরও প্রলম্বিত করার সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা আঁটছে তেহরান। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার সাম্প্রতিক কিছু গোপন মূল্যায়নের বরাত দিয়ে প্রভাবশালী মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, বর্তমান পরিস্থিতি তেহরানকে আগের চেয়ে অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছে। আর সেই আত্মবিশ্বাসের ওপর ভর করেই ওয়াশিংটনকে দীর্ঘমেয়াদি এক রাজনৈতিক ও সামরিক ক্বিদরতের মুখে ঠেলে দিতে চাইছে দেশটির নীতিনির্ধারকরা।
গত কয়েক মাসে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন ফ্রন্টে যে সীমিত পাল্টাপাল্টি হামলা হয়েছে, তাতে ইরান নতুন করে নিজেদের হিসাব-নিকাশ কষেছে। মার্কিন গোয়েন্দাদের মূল্যায়নে বলা হয়েছে, এই অনিয়মিত ও খণ্ডযুদ্ধগুলোর মধ্য দিয়ে তেহরান তাদের নিজস্ব সামরিক বাহিনীর টিকে থাকার ক্ষমতা এবং আধুনিক অস্ত্রের কার্যকারিতা খুব কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করেছে। সরাসরি সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার পর তেহরানের ভেতরের এই আত্মবিশ্বাস বহুগুণ বেড়ে গেছে যে, তারা বহিরাগত কোনো পরাশক্তির বিরুদ্ধেও দীর্ঘদিন ধরে এই সংঘাতের মাত্রা টিকিয়ে রাখতে সক্ষম।
মার্কিন গোয়েন্দা মহলের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে তেহরানের সঙ্গে একটি দীর্ঘমেয়াদি কূটনৈতিক সমাধানে পৌঁছানো হোয়াইট হাউসের জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। উভয় পক্ষের মধ্যকার এই গভীর অনাস্থা এবং ভূরাজনৈতিক দূরত্বের কারণে যেকোনো ধরনের রাজনৈতিক সংলাপের দরজাও প্রায় বন্ধ বললেই চলে। তেহরান এখন আর তাত্ত্বিক কোনো সমঝোতায় আগ্রহী নয়, বরং তারা মাঠের বাস্তবতায় ওয়াশিংটনকে এক দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক ও সামরিক অস্বস্তির মধ্যে ফেলে দিতে চায়।
তেহরানের এই নতুন রণকৌশলের পেছনে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশও বেশ জোরালো। মার্কিন রাজনীতি যখন আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের উত্তাপে ফুটছে, ঠিক সেই সংবেদনশীল মুহূর্তটিকে বেছে নিতে চাইছে তেহরান। যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ভোটারদের মনে যুদ্ধবিরোধী মনোভাব উসকে দেওয়া এবং বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক অবস্থানকে দুর্বল করে তোলাই এই কৌশলের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। ওয়াশিংটনকে কূটনৈতিক ও সামরিক উভয় মোর্চাতেই একটা স্থায়ী চাপের মুখে আটকে রাখতে চায় তারা।
গতকালের এই বিস্ফোরক প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, মার্কিন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার পাল্টা জবাব হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের মিত্র ও প্রক্সি নেটওয়ার্কগুলোকে আরও সক্রিয় করে তুলতে পারে তেহরান। এর সম্ভাব্য রূপরেখা হিসেবে গত জুলাই মাসের সংঘাতের পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিশেষ করে আঞ্চলিক ভূখণ্ডের মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো কিংবা প্রতিবেশী বন্ধুভাবাপন্ন দেশগুলোর জ্বালানি ও অর্থনৈতিক অবকাঠামো ফের তেহরানের নিশানায় চলে আসতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, সরাসরি পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ এড়িয়ে প্রক্সি যুদ্ধ এবং আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা বজায় রাখার পুরোনো খেলায় বেশ পটু তেহরান। ভৌগোলিক সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে তারা এমন এক দীর্ঘমেয়াদি অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি করতে চায়, যা মার্কিন প্রশাসনের মধ্যপ্রাচ্য নীতিকে পুরোপুরি অকার্যকর করে দেবে। ওয়াশিংটনের নীতিনির্ধারকরাও এখন বুঝতে পারছেন যে, তেহরানকে ঠেকানোর চিরাচরিত কৌশলগুলো আর আগের মতো কার্যকর হচ্ছে না।
শুধু চিরাচরিত সামরিক বা প্রক্সি হামলা নয়, সাইবার যুদ্ধক্ষেত্রের নীরব ময়দানেও বড় ধরনের আঘাত হানার প্রস্তুতি নিচ্ছে তেহরানের প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা। মার্কিন গোয়েন্দা সূত্রের খবর অনুযায়ী, ইরানি হ্যাকারদের বিভিন্ন বিশেষায়িত গ্রুপ নিজেদের পুনর্গঠিত করে এক ছাতার নিচে আসার কাজ প্রায় শেষ করেছে। যেকোনো মুহূর্তে তারা বড় ধরনের সাইবার আক্রমণের সূচনা করতে পারে, যার মূল লক্ষ্য হবে মার্কিন ডিজিটাল অবকাঠামো ও সাধারণ মানুষের জনজীবনকে অস্থির করে তোলা।
এই সম্ভাব্য সাইবার আক্রমণের মূল উদ্দেশ্য কেবল তথ্য চুরি করা নয়, বরং মার্কিন নাগরিকদের ভেতর সরাসরি প্রভাব ফেলা। দেশের সাধারণ মানুষের মনে যুদ্ধবিরোধী তীব্র মনোভাব এবং বর্তমান প্রশাসনের বিরুদ্ধে ক্ষোভ তৈরি করাই হবে এসব গুপ্ত হ্যাকিংয়ের প্রধান টার্গেট। যখন ঘরের ভেতরের মানুষ সরকারের বৈদেশিক নীতির কারণে অশান্ত হয়ে উঠবে, তখন হোয়াইট হাউসের পক্ষে মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উপস্থিতি বজায় রাখা রাজনৈতিকভাবে কঠিন হয়ে দাঁড়াবে।
সব মিলিয়ে, ওয়াশিংটন ও তেহরানের এই শীতল লড়াই এখন এক নতুন এবং বিপজ্জনক মোড়ের মুখে এসে দাঁড়িয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত মরুভূমি থেকে শুরু করে হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিস—সব জায়গাতেই এখন তেহরানের এই সুদূরপ্রসারী ছক নিয়ে গভীর উদ্বেগ কাজ করছে। সংঘাত হ্রাসের পরিবর্তে উত্তেজনার পারদ যেভাবে চড়ছে, তাতে আগামী দিনগুলোতে বিশ্ব রাজনীতিতে বড় ধরনের কোনো ঝড়ের পূর্বাভাসই দেখছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্কের পর্যবেক্ষকরা।

