বিশ্ব রাজনীতির মঞ্চে আবারও ঘনাচ্ছে এক চরম অনিশ্চয়তা ও উত্তেজনার কালো মেঘ। মধ্যপ্রাচ্যের পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র ইরান আগামী ছয় সপ্তাহের মধ্যে বড় ধরনের কোনো আকস্মিক সামরিক পদক্ষেপ বা হামলা চালাতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তিউনিসিয়ায় ওয়াশিংটনের সাবেক রাষ্ট্রদূত জোয়ে হুড। মার্কিন রাজনীতি যখন অভ্যন্তরীণ নির্বাচন নিয়ে ব্যস্ত, ঠিক সেই সময়টিকেই তেহরান তাদের কৌশলগত আঘাতের মোক্ষম মুহূর্ত হিসেবে বেছে নিতে পারে বলে মনে করছেন তিনি।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরাকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে এই বিস্ফোরক তথ্য সামনে এনেছেন সাবেক এই মার্কিন কূটনীতিবিদ। ভূ-রাজনীতির দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি ব্যাখ্যা করেছেন কীভাবে তেহরান সবসময় ওয়াশিংটনের নির্বাচনী বৈতরণীকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করার চেষ্টা করে আসছে। বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে এই সতর্কবার্তা নতুন করে উদ্বেগ বাড়িয়ে দিয়েছে হোয়াইট হাউসের নীতিনির্ধারকদের মনে।
যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রেসিডেন্টদের বেকায়দায় ফেলার এক দীর্ঘ ও সুনির্দিষ্ট ইতিহাস রয়েছে ইরানের। জিমি কার্টারের শাসনামল থেকে শুরু করে সাম্প্রতিককালের প্রায় প্রতিটি মার্কিন প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক মুহূর্তগুলোতে তেহরানের পক্ষ থেকে কোনো না কোনো কৌশলগত চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে। আসন্ন নভেম্বর মাসের নির্বাচনও এর ব্যতিক্রম হবে না বলে জোরালো আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন জোয়ে হুড।
বিশেষ করে এই বছরের নভেম্বর মাসটি যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল—উভয় দেশের জন্যই অত্যন্ত সংবেদনশীল। একই সময়ে দুই দেশের গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে চলায় প্রশাসনগুলোর মনোযোগ যখন অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ, সেই ফাঁকফোকর গলেই তেহরান তাদের আঘাত হানতে পারে। শত্রুর ব্যস্ততাকে নিজেদের সবচেয়ে বড় শক্তি হিসেবে ব্যবহার করার দীর্ঘদিনের কৌশলগত দক্ষতা ইরানের রয়েছে।
এই সম্ভাব্য উত্তেজনার পেছনে অর্থনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক কারণও স্পষ্টভাবে কাজ করছে বলে মনে করেন মার্কিন এই সাবেক কূটনীতিক। বিশেষ করে মার্কিন সাধারণ ভোটারদের আবেগ এবং দুর্বলতার জায়গাগুলো খুব ভালোভাবেই অনুধাবন করে তেহরানের নীতিনির্ধারকরা। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হতে পারে জ্বালানি তেলের বাজার ও মুদ্রাস্ফীতি।
যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ ভোটাররা পেট্রোলের দামের ওঠানামার প্রতি অত্যন্ত বেশি মাত্রায় সংবেদনশীল। আরব বিশ্বের সাধারণ মানুষ যেমন দৈনন্দিন রুটির দাম বৃদ্ধিকে সরাসরি সরকারের ব্যর্থতা হিসেবে দেখে, মার্কিন ভোটারদের কাছে তেলের দামও ঠিক তেমনি এক রাজনৈতিক মাপকাঠি। উপসাগরীয় অঞ্চলে সামান্য বিঘ্ন ঘটিয়ে তেলের বাজার অস্থিতিশীল করে তোলা গেলে তা সরাসরি মার্কিন নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দল বা প্রেসিডেন্টকে চরম বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলতে পারে।
বর্তমান কূটনৈতিক বাস্তবতায় ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার সম্পর্ক এখন সর্বনিম্ন বিন্দুতে অবস্থান করছে। দুই দেশের মধ্যে সরাসরি বা পরোক্ষ কোনো ধরনের আনুষ্ঠানিক আলোচনা বা যোগাযোগের পথ পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। এই গভীর কূটনৈতিক অচলাবস্থা পরিস্থিতিকে আরও বেশি বিপজ্জনক করে তুলেছে বলে মনে করেন জোয়ে হুড।
কোনো ধরনের সংলাপ বা সমঝোতার অনুপস্থিতি ভুল বোঝাবুঝির ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। একটি ছোট ভুল পদক্ষেপও পুরো অঞ্চলকে বড় ধরনের যুদ্ধের মুখে ঠেলে দিতে পারে। দীর্ঘস্থায়ী এই শীতল লড়াইয়ের অবসান ঘটাতে তাই কোনো গতানুগতিক কায়দায় কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে লাভ নেই বলেই মনে করছেন অভিজ্ঞ এই কূটনীতিক।
এই সংকট উত্তরণে প্রচলিত ধারার বাইরে গিয়ে কিছু একটা করা জরুরি হয়ে পড়েছে। ওয়াশিংটন বা তেহরান কেউই যখন সরাসরি টেবিলে বসতে রাজি নয়, তখন তৃতীয় কোনো পক্ষের শক্তিশালী মধ্যস্থতা ছাড়া এই বরফ গলা অসম্ভব। আর সেই কাজটি করতে এগিয়ে আসতে পারে আঞ্চলিক শক্তিগুলোই।
মধ্যস্থতাকারী দেশগুলো যদি সত্যিই কোনো যুগান্তকারী বা চমকপ্রদ কূটনৈতিক প্রস্তাব নিয়ে এগিয়ে আসে, কেবল তবেই এই অচলাবস্থার অবসান ঘটা সম্ভব। অন্যথায় নামমাত্র কূটনৈতিক বৈঠক বা আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার কোনো বাস্তব সুফল মিলবে না বলেই মনে করেন সাবেক এই রাষ্ট্রদূত। বর্তমান পরিস্থিতিতে কেবল কথার লড়াই দিয়ে তেহরানকে নিবৃত করা যাবে না।
বিশেষ করে মক্কা চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী দেশগুলো যদি ঐক্যবদ্ধভাবে মাঠের রাজনীতিতে সক্রিয় হয়, তবে বড় ধরনের বিপর্যয় এড়ানো সম্ভব হতে পারে। এই দেশগুলোর সম্মিলিত রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং কূটনৈতিক প্রভাব পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এক নতুন মোড় এনে দিতে পারে।
একটি সম্ভাব্য বাস্তবসম্মত সমাধান বাতলে দিয়ে জোয়ে হুড বলেন, মক্কা চুক্তির দেশগুলো যদি তাদের নিজস্ব শক্তিশালী নৌশক্তি নিয়ে সরাসরি উপসাগর এবং উত্তর আরব সাগরে অবস্থান নেয়, তবে ক্ষমতার ভারসাম্যে বড় পরিবর্তন আসবে। তাদের এই সরব উপস্থিতি আঞ্চলিক জলসীমায় এক নতুন নিরাপত্তা বেষ্টনী তৈরি করতে পারে।
তখন সেই যৌথ নৌবাহিনী প্রকাশ্যে ঘোষণা দিতে পারে যে তারা হরমুজ প্রণালির কঠোর নজরদারি করবে। এই রুটে চলাচলকারী কোনো বাণিজ্যিক জাহাজে আর কোনো হামলা হতে দেওয়া হবে না এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সচল রাখতে একাই মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের তরফ থেকে কোনো ধরনের নৌ-অবরোধেরও প্রয়োজন পড়বে না।
বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম প্রধান ধমনী এই হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মধ্য দিয়েই কেবল ইরানের সম্ভাব্য আগ্রাসী মনোভাবকে প্রশমিত করা সম্ভব। আগামী ছয় সপ্তাহের এই অতি সংবেদনশীল সময়টি বিশ্ব অর্থনীতি ও রাজনীতির জন্য অত্যন্ত পরীক্ষার হতে চলেছে। মার্কিন নির্বাচন ঘিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের এই সুপ্ত আগ্নেয়গিরি যেকোনো মুহূর্তে লাভা উদগিরণ শুরু করতে পারে। আর সেই সম্ভাব্য প্রলয় সামাল দিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় শেষ পর্যন্ত কী পদক্ষেপ নেয়, এখন সেটাই দেখার অপেক্ষা।

