ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসের ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া নেপালে একটি অবিশ্বাস্য উদ্ধারের ঘটনা ঘটেছে। টানা নয় দিন অন্ধকূপের মতো একটি টানেলে আটকে থাকার পর দুই শ্রমিককে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। মৃত্যুর খুব কাছ থেকে ফিরে আসা এই দুই শ্রমিকের চোখেমুখে ছিল চরম আতঙ্ক আর অবিশ্বাসের ছাপ। শুক্রবার সকালে উদ্ধারকারীদের অমানবিক পরিশ্রমের পর মাটির নিচ থেকে তাদের বের করে আনা সম্ভব হয়। এই ঘটনা পুরো নেপালজুড়ে এক মিশ্র অনুভূতির জন্ম দিয়েছে। একদিকে যেমন দুই প্রাণ বাঁচানোর স্বস্তি, অন্যদিকে নিখোঁজ থাকা আরও ডজন ডজন শ্রমিকের জন্য তীব্র হাহাকার।
হিমালয়কন্যার দেশ নেপাল গত কয়েক সপ্তাহ ধরে প্রকৃতির চরম রুদ্ররোষের শিকার। টানা প্রবল বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল এবং ভয়াবহ ভূমিধসে দেশটির বিস্তীর্ণ এলাকা এখন কার্যত মৃত্যুপুরী। সরকারি হিসাব মতেই এখন পর্যন্ত এক হাজার দুইশর বেশি মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। এই ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সবচেয়ে মর্মান্তিক দৃশ্যপট তৈরি হয়েছে দেশটির জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোতে। বিশেষ করে ত্রিশূলী নদীর তীরে গড়ে ওঠা প্রকল্পগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ত্রিশূলী থ্রি-এ প্রকল্পের গহীন টানেল
নুয়াকোট জেলায় অবস্থিত ত্রিশূলী থ্রি-এ জলবিদ্যুৎকেন্দ্রটি নেপালের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রকল্প। এই কেন্দ্রটির ভূগর্ভস্থ পাওয়ার হাউজে যাওয়ার জন্য তৈরি করা হয়েছিল চার কিলোমিটারেরও বেশি দীর্ঘ একটি টানেল। পাহাড়ের বুক চিরে তৈরি করা এই সুড়ঙ্গেই প্রতিদিনের মতো কাজে নেমেছিলেন শত শত শ্রমিক। কিন্তু হঠাৎ করেই ধেয়ে আসা পাহাড়ি ঢল আর কাদার স্রোত টানেলের প্রবেশমুখ পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়। মুহূর্তের মধ্যেই বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন ভেতরে থাকা শ্রমিকরা।
টানেলের ভেতর আটকে পড়া এই শ্রমিকদের কাছে পৌঁছানো উদ্ধারকারীদের জন্য এক অসম্ভব চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। টন টন কাদা, পাথর আর বন্যার পানি সরিয়ে ভেতরে ঢোকার কোনো সহজ পথ ছিল না। ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করাও ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ সামান্য কম্পনে পুরো সুড়ঙ্গ ধসে পড়ার আশঙ্কা ছিল। তারপরও আশা ছাড়েননি উদ্ধারকারীরা। দিনরাত এক করে, ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে কাদা সরিয়ে একটু একটু করে তারা অগ্রসর হতে থাকেন।
জীবনের স্পন্দন ও উদ্ধারের সেই মুহূর্ত
নয় দিনের মাথায় এসে উদ্ধারকারী দলের কয়েকজন সদস্য টানেলের ভেতর থেকে অস্পষ্ট মানুষের কণ্ঠস্বর শুনতে পান। এই শব্দই তাদের নতুন করে বাঁচার আশা জোগায়। দ্রুতগতিতে কিন্তু অত্যন্ত সাবধানে শুরু হয় মাটি খোঁড়ার কাজ। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে প্রচারিত ভিডিও ফুটেজে দেখা যায় এক শ্বাসরুদ্ধকর দৃশ্য। প্রায় এক ডজন উদ্ধারকারী মিলে কাদামাটির একটি ছোট গর্ত খুঁড়ছেন। আর সেই গর্তের ভেতর দিয়েই একে একে বের করে আনা হচ্ছে দুজন ক্লান্ত, ক্ষুধার্ত ও কাদা মাখা মানুষকে।
তারা যখন নিরাপদে বাইরের আলোয় বেরিয়ে এলেন, তখন সেখানে উপস্থিত সবার চোখেই ছিল আনন্দাশ্রু। উদ্ধারকারীরা হাততালি দিয়ে এই অবিশ্বাস্য সাফল্য উদযাপন করেন। নয় দিন ধরে খাবার, সুপেয় পানি এবং পর্যাপ্ত অক্সিজেনের অভাবে তারা অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন। উদ্ধার হওয়া মাত্রই তাদের প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে দ্রুত হাসপাতালে পাঠানো হয়। তবে তাদের নাম বা পরিচয় এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি।
নুয়াকোট জেলা পুলিশের তৎপরতা
বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর মধ্যে নুয়াকোট অন্যতম। এই জেলার পুলিশ প্রধান বিপিন রেগমি সংবাদমাধ্যমকে জানান যে, উদ্ধারকারীরা যখন ভেতর থেকে মানুষের কণ্ঠস্বর শুনতে পান, তখন সবার মধ্যে এক নতুন শক্তির সঞ্চার হয়। তিনি তাৎক্ষণিকভাবে ঘটনাস্থলে একটি বিশেষ মেডিকেল টিম পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। আটকে পড়া শ্রমিকদের শারীরিক অবস্থা বিবেচনা করে স্পটেই অক্সিজেন ও স্যালাইনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল।
বিপিন রেগমি আরও জানান, এই টানেলে এখনো অন্তত ৪২ জন শ্রমিক নিখোঁজ রয়েছেন। তাদের ভাগ্যে কী ঘটেছে তা এখনো অজানা। তবে দুইজনকে জীবিত উদ্ধার করার পর বাকিদেরও বেঁচে থাকার ক্ষীণ একটি আশা তৈরি হয়েছে। টানেলের ভেতরে কোনো এয়ার পকেট বা নিরাপদ স্থান থাকতে পারে, যেখানে হয়তো আরও কয়েকজন আশ্রয় নিয়েছেন। পুলিশ ও সেনাবাহিনীর যৌথ দল উদ্ধার অভিযান আরও জোরদার করেছে।
আন্তর্জাতিক শ্রমিকদের উদ্বেগজনক পরিস্থিতি
নেপালের এই জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলো শুধু স্থানীয়দের জন্যই নয়, আন্তর্জাতিক শ্রমিকদের জন্যও কর্মসংস্থানের বড় একটি জায়গা। ত্রিশূলী নদীর তীরের এই প্রকল্পগুলোতে চীন, দক্ষিণ কোরিয়া এবং ভারতের বহু প্রকৌশলী ও নির্মাণশ্রমিক কাজ করছিলেন। আকস্মিক এই বন্যায় এই বিদেশি নাগরিকরাও আটকা পড়েছেন বলে জানা গেছে। তাদের নিজ নিজ দেশের দূতাবাসগুলো নেপাল সরকারের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছে।
নিখোঁজ শ্রমিকদের পরিবারের সদস্যরা প্রকল্প এলাকার আশপাশে ভিড় জমাচ্ছেন। তাদের কান্না আর আহাজারিতে বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। একেকটি দিন পার হচ্ছে আর তাদের আশা ধীরে ধীরে হতাশায় রূপ নিচ্ছে। বিদেশি শ্রমিকদের পরিবারগুলো নিজ দেশে বসে চরম উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছে। নেপাল সরকার আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে উদ্ধারকাজে সহায়তার জন্য আধুনিক যন্ত্রপাতি ও বিশেষজ্ঞ দল পাঠানোর আহ্বান জানিয়েছে।
প্রকৃতির রোষানল ও নেপালের শোক
নেপালের ইতিহাসে এবারের বন্যা ও ভূমিধস একটি নজিরবিহীন ঘটনা। মাত্র কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিতে নদীগুলোর পানি বিপদসীমার কয়েক গুণ ওপর দিয়ে প্রবাহিত হতে থাকে। পাহাড়ি ঢলের তোড়ে ভেসে গেছে শত শত গ্রাম, ব্রিজ ও কালভার্ট। যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ায় দুর্গত এলাকাগুলোতে ত্রাণ ও চিকিৎসা সহায়তা পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে। এক হাজার দুইশর বেশি মানুষের মৃত্যু পুরো দেশটিকে এক গভীর শোকের চাদরে ঢেকে দিয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণেই হিমালয় অঞ্চলে আবহাওয়ার এমন খামখেয়ালিপনা দেখা যাচ্ছে। অসময়ে অতিবৃষ্টি এবং পাহাড়ের ভূতাত্ত্বিক গঠন দুর্বল হয়ে পড়ার কারণে ভূমিধসের ঘটনা মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। অপরিকল্পিতভাবে পাহাড় কেটে জলবিদ্যুৎকেন্দ্র ও রাস্তাঘাট নির্মাণের কারণে এই বিপর্যয়ের মাত্রা আরও বহুগুণ বেড়ে গেছে বলে পরিবেশবাদীরা অভিযোগ করছেন।
ভবিষ্যতের সতর্কতা ও বর্তমানের লড়াই
নেপালের এই প্রাকৃতিক বিপর্যয় পুরো দক্ষিণ এশিয়ার জন্যই এক বড় সতর্কবার্তা। হিমালয় অঞ্চলের ভঙ্গুর বাস্তুতন্ত্রের ওপর যে নির্মম আঘাত হানা হচ্ছে, তার ভয়াবহ পরিণতি এখন চোখের সামনে। জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলো দেশের অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও, পাহাড়ের পরিবেশগত সুরক্ষার বিষয়টি উপেক্ষা করার কোনো সুযোগ নেই। ভবিষ্যতের যেকোনো নির্মাণকাজে ভূতাত্ত্বিক ঝুঁকিগুলো আরও গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
আপাতত নেপালের মানুষের কাছে সবচেয়ে বড় চাওয়া হলো নিখোঁজ মানুষগুলোর সন্ধান পাওয়া। ত্রিশূলী থ্রি-এ প্রকল্পের টানেলের ভেতর উদ্ধারকারীদের অবিরাম লড়াই এখনো চলছে। প্রতি কোদাল কাদা সরানোর সঙ্গে সঙ্গে তারা হয়তো আরও একটি জীবনের সন্ধান খুঁজছেন। নয় দিন পর দুই শ্রমিকের জীবিত ফিরে আসার ঘটনা প্রমাণ করে যে, মানুষের বেঁচে থাকার অদম্য ইচ্ছা অনেক সময় প্রকৃতির নিষ্ঠুরতাকেও হার মানায়। এখন শুধু অপেক্ষার পালা, মাটির গভীর থেকে আরও কোনো প্রাণের স্পন্দন ফিরে আসে কি না।

