নেপালের ত্রিশূলী ৩-এ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সেই অন্ধকার সুড়ঙ্গ থেকে আর কাউকে জীবিত উদ্ধারের কোনো আশা নেই। দীর্ঘ প্রতীক্ষা আর আকস্মিক বন্যার নয় দিন পর সেখানে আর কোনো প্রাণের স্পন্দন খুঁজে পাননি উদ্ধারকর্মীরা। সুড়ঙ্গের শেষ প্রান্ত পর্যন্ত তল্লাশি চালিয়ে এই নির্মম সত্য নিশ্চিত করেছেন তারা। ফলে এই সুড়ঙ্গটিতে চলমান উদ্ধারকাজের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়েছে।
শুক্রবার নেপাল পুলিশের বিশেষায়িত বাহিনী এবং সেনাবাহিনীর যৌথ একটি দল ওই সুড়ঙ্গের গভীরে প্রবেশ করেছিল। এপিএফের হেড কনস্টেবল পবন বাহাদুর তামাংয়ের নেতৃত্বে সাত সদস্যের একটি দল সুড়ঙ্গের ভেতরে চষে বেড়ায়। সুড়ঙ্গটির ভেতরের পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ, তা উঠে এসেছে উদ্ধারকারী দলের সদস্যদের বর্ণনায়।
উদ্ধারকাজে অংশ নেওয়া অম্বর মাহাত জানিয়েছেন, গোটা প্রকল্পের প্রতিটি অংশ এখন কেবল কাদা, মাটি আর পাথরে স্তূপাকার হয়ে রয়েছে। উদ্ধারকর্মীরা সুড়ঙ্গের ভেতরে হামাগুড়ি দিয়ে প্রায় কুড়ি মিনিট সামনে এগিয়েছিলেন। কিন্তু যেখানেই আলো ফেলা হয়েছে, সেখানেই কেবল মাটি আর ধ্বংসস্তূপের দেখা মিলেছে। প্রবল জলের তোড়ে সুড়ঙ্গের ওপরের ছাদের স্ল্যাবও ধসে পড়েছে।
গত ২৬ আগস্ট বুধবার সকালে যখন ভোটেকোশী এবং ত্রিশূলী নদীতে আকস্মিক বন্যা আঘাত হানে, তখন নেপালের বিভিন্ন প্রান্তে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের কাজ চলছিল। বেশিরভাগ প্রকল্পেই পাহাড় কেটে মাটির নিচে পাওয়ার হাউস বা সুড়ঙ্গ তৈরি করা হয়েছিল। প্রকৃতির নির্মম এই আকস্মিক বন্যায় প্রতিটি প্রকল্পই মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নেপালি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, কেবল সুড়ঙ্গগুলোর ভেতরেই প্রায় নয়শো শ্রমিক নিখোঁজ রয়েছেন।
এই ভয়ংকর পরিস্থিতির পর থেকেই দেশের বিভিন্ন প্রান্তে জোরকদমে উদ্ধারকাজ চালিয়ে আসছিল নেপালি সেনা ও পুলিশ। কাদামাটির ভারী স্তূপ খুঁড়ে শ্রমিকদের বাঁচানোর অন্তহীন লড়াই চালিয়ে যাচ্ছিলেন তারা। অলৌকিকভাবে হলেও ঘটনার নয় দিন পর ত্রিশূলীর এই সুড়ঙ্গ থেকেই দুই শ্রমিককে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছিল। একই সুড়ঙ্গ থেকে উদ্ধার করা হয়েছিল দুর্ভাগা এক শ্রমিকের মরদেহও।
জীবিত উদ্ধার হওয়া দুই শ্রমিকের নাম সঞ্জয় শাহ এবং কবীর মহারাজন। সুড়ঙ্গ থেকে যখন তাদের বাইরে নিয়ে আসা হচ্ছিল, তখন ভেতর থেকে আরও মানুষের কণ্ঠস্বর ভেসে আসার গুঞ্জন শোনা গিয়েছিল। সেই আশার আলোকেই উদ্ধারকারীরা সুড়ঙ্গের একেবারে শেষ মাথা পর্যন্ত তন্ন তন্ন করে খুঁজে দেখার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু সেই তল্লাশি কেবল একরাশ শূন্যতা আর নিস্তব্ধতাই ফিরিয়ে এনেছে।
উদ্ধার পাওয়ার পর সঞ্জয় ও কবীরকে দ্রুত চিকিৎসার জন্য রাজধানী কাঠমান্ডুতে পাঠানো হয়েছে। অন্ধকার সুড়ঙ্গের সেই বিভীষিকাময় দিনগুলোর কথা বলতে গিয়ে কেঁপে উঠছেন সঞ্জয়। তিনি জানান, হড়পা বান আসার শব্দ শুনে অন্যদের সুড়ঙ্গ থেকে নিরাপদে বের করার চেষ্টা করছিলেন তিনি। আর সেই মহৎ উদ্যোগেই নিজের জীবন বাঁচানোর সময়টুকু তিনি হারিয়ে ফেলেন।
টানা নয় দিন ধরে সুড়ঙ্গের ভেতরে বন্দি থেকে একটানা প্রার্থনা আর মন্ত্র জপে গেছেন সঞ্জয়। তিনি ঘুণাক্ষরেও ভাবতে পারেননি যে নরককুণ্ড হয়ে ওঠা ওই সুড়ঙ্গ থেকে তিনি কখনো আলোয় ফিরতে পারবেন। কিন্তু ভাগ্যের জোরে বেঁচে যাওয়া এই দুই শ্রমিকের বাইরে ত্রিশূলীর সুড়ঙ্গের ভেতরে এখন আর মৃত্যুর নীরবতা ছাড়া কিছুই নেই।
এদিকে প্রলয়ংকরী এই হড়পা বানে নেপালজুড়ে মৃত্যুর মিছিল কেবল দীর্ঘই হয়েছে। শুক্রবার পর্যন্ত সরকারি হিসাব অনুযায়ী মোট এক হাজার দুইশো সাতাশিটি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। তবে এখনো নিখোঁজ রয়েছেন পাঁচ হাজারেরও বেশি মানুষ। হিমালয়ের কোলে নেমে আসা এই প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষত সহজে শুকানোর নয়।

