পরিবেশ সুরক্ষার মূল দায়িত্বে থাকা ব্যক্তির অতীত কর্মকাণ্ডই যখন সবুজ প্রকৃতির জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হয়ে দাঁড়ায়, তখন ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করা ছাড়া পথ থাকে না। বিশ্ব পরিবেশ দিবসকে কেন্দ্র করে দেশের পরিবেশ নীতি এবং সরকারের অগ্রাধিকার নিয়ে এমনই এক বিস্ফোরক মন্তব্য সামনে এসেছে। বনাঞ্চল উজার করে শিল্পকারখানা গড়ার নেপথ্যে থাকা এক ব্যক্তিকে পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বলে সরাসরি অভিযোগ উঠেছে।
শনিবার (৬ জুন) রাজধানী ঢাকায় আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এই গুরুতর দাবি করেন ন্যাশনালিস্ট সিটিজেন্স পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। বিশ্ব পরিবেশ দিবস উপলক্ষে দলের সপ্তাহব্যাপী দেশব্যাপী বৃক্ষরোপণ ও চারা বিতরণ কর্মসূচির উদ্বোধন করতে গিয়ে তিনি সরকারের এই নীতিগত সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেন।
আসিফ মাহমুদ বলেন, রাষ্ট্র যখন পরিবেশ রক্ষার কথা বলছে, তখন বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। যিনি একসময় নিজের ব্যক্তিগত ও বাণিজ্যিক স্বার্থে বনাঞ্চল ধ্বংস করে ইন্ডাস্ট্রি বা শিল্পকারখানা গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছিলেন, আজ তিনিই আমাদের পরিবেশ মন্ত্রী। এই বৈপরীত্য দেশের পরিবেশের জন্য এক বড় বিপদের সংকেত।
আগামী পাঁচ বছরের পরিবেশ নিয়ে গভীর আশঙ্কা
সংবাদ সম্মেলনে আসিফ মাহমুদ বর্তমান প্রশাসনের পরিবেশবিষয়ক দূরদর্শিতা ও সদিচ্ছা নিয়ে নানা প্রশ্ন তোলেন। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, নীতিনির্ধারকদের এই ধরনের সিদ্ধান্তের খেসারত দিতে হবে পুরো দেশের মানুষকে। শীর্ষ পদে এমন ব্যক্তির অবস্থান আগামী দিনগুলোতে প্রকৃতির ওপর আরও বড় আঘাত ডেকে আনতে পারে।
এনসিপির এই যুবনেতা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, যার অতীত রেকর্ড বনের জমি দখলের সঙ্গে জড়িত, তার হাত ধরে আগামী পাঁচ বছরে দেশের পরিবেশের কি ভয়াবহ অবস্থা হবে, তা এখন থেকেই খুব সহজে অনুমান করা যায়। বর্তমান সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে পরিবেশ বা জলবায়ু পরিবর্তনের মতো গুরুত্বপূর্ণ সংকটগুলো কোনোভাবেই অগ্রাধিকার পাচ্ছে না।
সরকারের এই উদাসীনতাকে একটি দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় ক্ষতি হিসেবে দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা। আসিফ মাহমুদ মনে করেন, এই সরকার যদি এখন থেকে পরিবেশ রক্ষায় কার্যকর ও কঠোর কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ না করে, তবে তার দায় পরবর্তী প্রজন্মের ওপর বর্তাবে। পাঁচ বছর পর যারা রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে আসবে, তাদের জন্য এই ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা অসম্ভব হয়ে পড়বে।
রাজনৈতিক দল হিসেবে সামাজিক দায়বদ্ধতা
একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে মাঠপর্যায়ের ক্ষমতার সীমাবদ্ধতার কথা অকপটে স্বীকার করেছেন আসিফ মাহমুদ। তিনি বলেন, ক্ষমতার বাইরে থেকে কাঠামোগতভাবে বড় কোনো পরিবর্তন বা রাষ্ট্রীয় প্রকল্প বাস্তবায়ন করার সুযোগ হয়তো আমাদের মতো দলের এখন নেই। কিন্তু সেই সীমাবদ্ধতা আমাদের সামাজিক দায়িত্ব থেকে বিচ্যুত করতে পারে না।
তিনি স্পষ্ট করেন, পরিবেশের এই মহাসংকটের সময়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করাই এখন সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক কাজ। নাগরিক সমাজ যদি নিজের চারপাশের পরিবেশ নিয়ে সচেতন না হয়, তবে কোনো আইন বা টাস্কফোর্স দিয়ে প্রকৃতি বাঁচানো যাবে না। জনসচেতনতা বৃদ্ধির এই লক্ষ্যকে সামনে রেখেই তারা মাঠে নেমেছেন।
সংবাদ সম্মেলনে পরিবেশ সংরক্ষণে অবিলম্বে সরকারের পক্ষ থেকে দৃশ্যমান ও কার্যকর বৈজ্ঞানিক উদ্যোগ গ্রহণের জোর দাবি জানানো হয়। একই সঙ্গে দেশের নদী, পাহাড় ও বন রক্ষায় একটি স্বাধীন পরিবেশ কমিশন গঠনের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন বক্তারা।
সপ্তাহব্যাপী বৃক্ষরোপণ ও স্কুলের শিশুদের যুক্ত করার উদ্যোগ
সংবাদ সম্মেলনে এনসিপির এই বিশেষ পরিবেশবান্ধব কর্মসূচির বিস্তারিত কর্মপরিকল্পনা ও রূপরেখা তুলে ধরেন দলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক এবং ঢাকা মহানগর উত্তরের আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব। তিনি জানান, বিশ্ব পরিবেশ দিবস স্রেফ একদিনের আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে তারা এটিকে মাঠপর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছেন।
ঘোষণা অনুযায়ী, শনিবার থেকে শুরু হওয়া এই বৃক্ষরোপণ ও বিনামূল্যে চারা বিতরণ কার্যক্রম আগামী ১২ জুন পর্যন্ত একনাগাড়ে চলবে। এই কর্মসূচির একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো, এতে শহরের নতুন প্রজন্ম তথা স্কুলের শিক্ষার্থীদের সরাসরি সম্পৃক্ত করা হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব সম্পর্কে শিশুদের শৈশব থেকেই ধারণা দেওয়ার জন্য এই উদ্যোগ।
আরিফুল ইসলাম আদীব জানান, প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী ঢাকা মহানগরের অন্তত ২০টি স্বনামধন্য ও সুবিধাবঞ্চিত স্কুলে বিশেষ ক্যাম্পেইন চালানো হবে। এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষাকারী ও ফলদ প্রজাতির প্রায় ২০০টি গাছ রোপণ ও শিক্ষার্থীদের মাঝে বিতরণ করা হবে।
দখল, দূষণ ও দাহ রোধে জাতীয় সেমিনারের ডাক
গাছ লাগানোর পাশাপাশি শহরের পরিবেশের প্রধান তিনটি শত্রু—দখল, দূষণ এবং দাবদাহ বা দাহ রোধে নাগরিকদের করণীয় নিয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের সেমিনারের আয়োজন করতে যাচ্ছে দলটি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঢাকার চারপাশের নদী ও জলাশয় দখল এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে প্রতি বছর শহরের তাপমাত্রা রেকর্ড ছাড়িয়ে যাচ্ছে।
এই সেমিনারে দেশের শীর্ষস্থানীয় পরিবেশবিদ, নগর পরিকল্পনাবিদ ও মানবাধিকার কর্মীদের আমন্ত্রণ জানানো হবে। সেখানে ঢাকা শহরকে কীভাবে আবার বাসযোগ্য ও সবুজ করে গড়ে তোলা যায়, তার একটি খসড়া প্রস্তাবনা তৈরি করে সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলে জমা দেওয়া হবে বলে আয়োজকেরা জানিয়েছেন।
রাজধানীর একটি মিলনায়তনে আয়োজিত এই গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন এনসিপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম আহ্বায়ক জাবেদ রাসিনসহ ঢাকা মহানগর উত্তরের বিভিন্ন স্তরের শীর্ষ নেতারা। তারা প্রত্যেকেই নিজ নিজ এলাকায় এই কর্মসূচি সফল করতে তৃণমূল কর্মীদের প্রতি আহ্বান জানান।
নীতিনির্ধারণী সংকট ও নাগরিক সমাজের উদ্বেগ
পরিবেশবাদীরা দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ করে আসছেন যে, দেশের উন্নয়ন প্রকল্পের নামে হাজার হাজার একর বনের জমি আবাসন ও শিল্পায়নের জন্য ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে। সুন্দরবন থেকে শুরু করে লাউয়াছড়া—সবখানেই এখন বাণিজ্যিক থাবা স্পষ্ট। এই পরিস্থিতিতে আসিফ মাহমুদের এই বক্তব্য পরিবেশ আন্দোলনের কর্মীদের মনে নতুন করে বিতর্কের খোরাক জুগিয়েছে।
জনস্বার্থ রক্ষা ও পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখার ক্ষেত্রে মন্ত্রীদের অতীত ব্যাকগ্রাউন্ড বা কাজের ইতিহাস পর্যালোচনা করা কতটা জরুরি, এই ঘটনা তা পুনর্বার প্রমাণ করে। সরকারের উচিত এই ধরনের সংবেদনশীল মন্ত্রণালয়ে এমন ব্যক্তিদের পদায়ন করা, যাদের প্রকৃতির প্রতি দায়বদ্ধতা এবং আন্তর্জাতিক জলবায়ু কূটনীতিতে স্পষ্ট জ্ঞান রয়েছে।
সপ্তাহব্যাপী এই সবুজ কর্মসূচির মাধ্যমে এনসিপি কতটুকু জনসমর্থন বা সচেতনতা তৈরি করতে পারবে তা সময়ই বলে দেবে। তবে পরিবেশমন্ত্রীর অতীত কর্মকাণ্ড নিয়ে আসিফ মাহমুদের তোলা এই গুরুতর অভিযোগের পর, সরকারের পক্ষ থেকে বা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা বা প্রতিক্রিয়া আসে কিনা, এখন সেটাই দেখার বিষয়।

