ঢাকা যেন আজ এক তপ্ত রাজনীতির সাক্ষী হলো। একদিকে যখন স্থিতিশীলতার ডাক দেওয়া হচ্ছে, ঠিক তখনই সীমান্তের রক্তক্ষরণ আর আন্তর্জাতিক নদীর পানির অধিকার নিয়ে রাজপথে নামার হুঁশিয়ারি দিলেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও সংসদের বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। তাঁর ভাষায়, “বন্ধুর বাড়িতে লাশের মিছিল দেখে বন্ধুত্ব হয় না।”
মঙ্গলবার বিকেলে কাকরাইলের ইনস্টিটিউট অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্সে (আইডিইবি) ন্যাশনাল ওলামা অ্যালায়েন্স আয়োজিত এক আলোচনা সভায় তিনি এই মন্তব্য করেন। ‘শাপলা গণহত্যা: বিচারহীনতার এক যুগ’ শীর্ষক এই সভায় উঠে আসে ২০১৩ সালের স্মৃতি আর ২০২৪-এর ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপট। তবে আলোচনার বড় একটি অংশ জুড়ে ছিল বর্তমান সীমান্ত পরিস্থিতি।
নাহিদ ইসলাম শুরুতেই ক্ষোভ প্রকাশ করেন সাম্প্রতিক সীমান্ত হত্যাকাণ্ড নিয়ে। তিনি বলেন, সীমান্তে আবারও রক্ত ঝরছে। নতুন করে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়া হচ্ছে। বাংলাদেশের জনগণকে হত্যা করে যদি কেউ বন্ধুত্বের বুলি আওড়ায়, তবে সেই বন্ধুত্ব অর্থহীন। তাঁর মতে, কাঁটাতার দিয়ে কোনো জাতির সঙ্গে আত্মার সম্পর্ক গড়ে তোলা যায় না।
প্রতিবেশী ভারতের প্রতি এক প্রকার হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে তিনি বলেন, “এই কাঁটাতার একদিন সেই দেশের সাধারণ জনগণই উপড়ে ফেলবে। তারা বাংলাদেশের মানুষের সঙ্গে অকৃত্রিম বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দেবে, যেখানে কোনো অস্ত্রের ভয় থাকবে না।” তাঁর এই বক্তব্যে হলের ভেতরে করতালির জোয়ার বয়ে যায়।
সীমান্ত রক্ষার প্রাথমিক দায়িত্ব সরকারের—একথা মনে করিয়ে দিয়ে নাহিদ ইসলাম বলেন, সরকার যদি সার্বভৌমত্ব রক্ষায় ব্যর্থ হয়, তবে জনগণ হাত গুটিয়ে বসে থাকবে না। এই দেশের মাটির প্রতিটি ইঞ্চি রক্ষা করার দায়িত্ব এ দেশের নাগরিকরাই নিজের হাতে তুলে নেবে। সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে কোনো আপস করা হবে না বলে তিনি সাফ জানিয়ে দেন।
নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা প্রসঙ্গেও সরকারের ওপর চাপ বাড়ান এই তরুণ নেতা। তিনি দাবি করেন, অভিন্ন নদীগুলোর পানির অধিকার আদায় করা রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ব। দীর্ঘকাল ধরে ঝুলে থাকা পানিবণ্টন চুক্তির সমাধান না হলে দেশের কৃষিখাত ও বাস্তুসংস্থান ধ্বংস হয়ে যাবে। তিনি অবিলম্বে এই ইস্যুতে শক্তিশালী কূটনৈতিক তৎপরতা চালানোর আহ্বান জানান।
আলোচনা সভার মূল বিষয়বস্তু ছিল ২০১৩ সালের শাপলা চত্বরের ঘটনা। নাহিদ ইসলাম দাবি করেন, এক যুগ আগে সেই গণহত্যার বিচার হয়নি বলেই ২০২৪ সালে এসে আরেকটি বড় ধরনের গণহত্যার সাহস পেয়েছে তৎকালীন ফ্যাসিস্ট শক্তি। বিচারহীনতার এই সংস্কৃতিই দেশজুড়ে গুম আর খুনের রাজত্ব কায়েম করেছিল বলে তিনি মনে করেন।
তিনি তৎকালীন মিডিয়া ও প্রশাসনিক প্রচারণার কড়া সমালোচনা করে বলেন, হেফাজতের কর্মীদের সেই সময় ‘সন্ত্রাসী’ বা ‘জঙ্গি’ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছিল। প্রকৃত সত্যকে ধামাচাপা দিয়ে পুরো বিশ্বকে একটি ভুল বার্তা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সময় বদলেছে, এখন প্রতিটি ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব দিতে হবে সংশ্লিষ্টদের।
জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক আরও বলেন, চব্বিশের বিপ্লবের পর মানুষ এখন সত্য শুনতে চায়। শাপলা চত্বরে যারা প্রাণ হারিয়েছিলেন, তাদের পরিবারের আর্তনাদ গত এক দশকে কেউ শোনেনি। এখন সময় এসেছে রাষ্ট্রীয়ভাবে সেই ঘটনার স্বীকৃতি দেওয়া এবং জড়িতদের আইনের আওতায় আনা।
সভায় উপস্থিত ওলামা মাশায়েখদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ধর্মীয় পরিচিতিকে রাজনীতির হাতিয়ার বানিয়ে সাধারণ মানুষকে কোণঠাসা করার দিন ফুরিয়ে আসছে। আলেম-ওলামাদের ওপর চালানো সেই নির্মমতা ছিল বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ওপর বড় আঘাত। চব্বিশের আন্দোলনের বীজ মূলত তখনই বপন করা হয়েছিল।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, নাহিদ ইসলামের এই বক্তব্য কেবল সীমান্ত বা পানি নিয়ে নয়, বরং একটি শক্ত জাতীয়তাবাদী অবস্থান তৈরির চেষ্টা। বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যে পরিবর্তনের সুর বাজছে, নাহিদ ইসলাম সেই সুরে কিছুটা তেজ যোগ করলেন।
নাহিদ ইসলামের কণ্ঠে ছিল এক ধরনের ক্ষিপ্রতা। তিনি বলেন, “রাজনীতি কেবল ড্রইংরুমে বসে হয় না। জনগণের দাবি নিয়ে যখন কথা বলা হবে, তখনই রাজনীতি সার্থক হবে।” তিনি তাঁর সমর্থকদের সজাগ থাকার এবং দেশের স্বার্থে যেকোনো ত্যাগের জন্য প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দেন।
অনুষ্ঠানে একটি তথ্যচিত্র প্রদর্শনী হয়, যেখানে শাপলা চত্বরের সেই রাতের দৃশ্য এবং পরবর্তীতে ২০২৪-এর ছাত্র আন্দোলনের সাদৃশ্য তুলে ধরা হয়। অনেক দর্শককে অশ্রুসিক্ত হতে দেখা যায়। তথ্যচিত্রটি শেষ হওয়ার পর নাহিদ ইসলাম বলেন, “ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করে না, বর্তমানকেও ক্ষমা করবে না যদি আমরা ভুল থেকে শিক্ষা না নেই।”
গণতন্ত্রের স্বার্থে এবং একটি মেধাভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনে ওলামাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি। তাঁর মতে, নৈতিকতা এবং প্রগতির সমন্বয় ছাড়া বাংলাদেশের উন্নয়ন সম্ভব নয়। তিনি তরুণ প্রজন্মকে ইতিহাসের বিকৃতি থেকে দূরে থাকার এবং সত্য অনুসন্ধানের আহ্বান জানান।
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামার আগেই সভা শেষ হয়। তবে নাহিদ ইসলামের সেই ‘কাঁটাতার উপড়ে ফেলার’ ঘোষণাটি রাজনীতি পাড়ায় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে। অনেকেই মনে করছেন, এটি সরাসরি দিল্লির বর্তমান নীতিমালার প্রতি একটি চ্যালেঞ্জ। অন্যদিকে, পানিবণ্টন নিয়ে তাঁর দাবি অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে জনমতকে তাঁর দলের দিকে টানতে সাহায্য করবে।
জাতীয় নাগরিক পার্টি আগামী দিনগুলোতে এসব জাতীয় ইস্যু নিয়ে বড় ধরনের কর্মসূচির দিকে যেতে পারে বলে গুঞ্জন রয়েছে। তবে নাহিদ ইসলাম স্পষ্ট করেছেন যে, তারা কেবল ক্ষমতার পরিবর্তন নয়, বরং রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামো এবং পররাষ্ট্রনীতির আমূল পরিবর্তন চান।
বাংলাদেশ বর্তমানে এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে পুরোনো ক্ষতের বিচার, অন্যদিকে নতুন সম্পর্কের মেরুকরণ। এই প্রেক্ষাপটে নাহিদ ইসলামের মতো তরুণ নেতৃত্বের এমন আক্রমণাত্মক এবং আবেগপ্রবণ বক্তব্য দেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে কোনো ঝড়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে কি না, তা সময়ই বলে দেবে।
সভা শেষে ইনস্টিটিউট অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স প্রাঙ্গণে কর্মীদের জটলা ছিল চোখে পড়ার মতো। সীমান্ত হত্যার বিচারের দাবিতে তাদের স্লোগানে উত্তপ্ত ছিল আশপাশের এলাকা। নাহিদ ইসলাম হাত নেড়ে বিদায় নেওয়ার সময়ও কর্মীদের চোখে ছিল পরিবর্তনের এক নতুন আকাঙ্ক্ষা।
বাংলাদেশের সীমান্ত যে কেবল রেখা নয়, বরং এটি যে একটি জাতির মর্যাদার প্রতীক—সেটিই আজ বারবার প্রতিধ্বনিত হলো এই আলোচনা সভায়। প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সমমর্যাদার ভিত্তিতে সম্পর্ক গড়ার যে নতুন আকাঙ্ক্ষা তরুণদের মনে দানা বাঁধছে, নাহিদ ইসলাম আজ তারই প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠলেন।

