ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার চলমান স্নায়ুযুদ্ধ এখন এক নতুন মোড় নিয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইরানের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের মধ্যে শুরু হয়েছে নজিরবিহীন বাকযুদ্ধ। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ওয়াশিংটন থেকে আসা একাধিক দাবিকে সরাসরি ‘মিথ্যা’ বলে উড়িয়ে দিয়েছে তেহরান। দুই দেশের এই পাল্টাপাল্টি অবস্থানের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে আবারও যুদ্ধের কালো মেঘ ঘনীভূত হচ্ছে।
শনিবার ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘এক্স’-এ এক বিস্ফোরক পোস্টে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের তীব্র সমালোচনা করেন। গালিবাফ অভিযোগ করেন, ট্রাম্প মাত্র এক ঘণ্টার ব্যবধানে সাতটি ভিন্ন ভিন্ন দাবি করেছেন, যার প্রতিটিই ভিত্তিহীন ও অসত্য। যদিও তিনি নির্দিষ্ট করে সবগুলোর নাম বলেননি, তবে তার মূল ইঙ্গিত ছিল ওয়াশিংটনের বর্তমান নীতির দিকে। গালিবাফ সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট দিয়ে বা মিথ্যাচার করে যুদ্ধের ময়দানে কিংবা আলোচনার টেবিলে জয়ী হওয়া সম্ভব নয়।
এই উত্তেজনার কেন্দ্রে রয়েছে হরমুজ প্রণালীর ভবিষ্যৎ। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি লেবানন-ইসরায়েল যুদ্ধবিরতির সম্মানে এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথটি ‘সম্পূর্ণ উন্মুক্ত’ করার ঘোষণা দিয়েছিলেন। কিন্তু প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার ট্রুথ সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে স্পষ্ট জানিয়ে দেন, ইরানের সঙ্গে চূড়ান্ত কোনো লেনদেন বা চুক্তি সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত মার্কিন নৌ-অবরোধ জারি থাকবে। ট্রাম্পের এই অনড় অবস্থানের প্রতিবাদে ইরান আবারও হরমুজ প্রণালীতে কঠোর সামরিক নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে।
স্পিকার গালিবাফ হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, “যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের বন্দরগুলোতে অবরোধ অব্যাহত রাখে, তবে হরমুজ প্রণালী খোলা থাকার কোনো প্রশ্নই আসে না।” তিনি আরও যোগ করেন, এই জলপথ দিয়ে কোনো জাহাজ চলাচল করবে কি না, তা নির্ধারিত হবে সরাসরি রণক্ষেত্রে। তেহরানের পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানানো হয়েছে, হরমুজ দিয়ে যাতায়াত করতে হলে অবশ্যই ইরানের নির্ধারিত রুট এবং কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিতে হবে।
এদিকে, ট্রাম্পের একটি দাবি ইরানকে সবচেয়ে বেশি ক্ষুব্ধ করেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট দাবি করেছিলেন যে, ইরান তাদের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম বা ‘নিউক্লিয়ার ডাস্ট’ খনন করে যুক্তরাষ্ট্রে পাঠিয়ে দিতে রাজি হয়েছে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই দাবিকে হাস্যকর বলে প্রত্যাখ্যান করেছে। তেহরান জানিয়েছে, সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম অন্য কোনো দেশে পাঠানোর বিষয়টি কখনোই আলোচনার টেবিলে ওঠেনি এবং ইরান তার পারমাণবিক সম্পদ হস্তান্তরের কোনো পরিকল্পনা করছে না।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা এখন হরমুজ প্রণালীকে ইরানের ‘পারমাণবিক প্রতিরোধক’ হিসেবে দেখছেন। বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের এক-পঞ্চমাংশ এই পথ দিয়ে যায়। দীর্ঘ দুই মাসের যুদ্ধের পর প্রণালীটি বন্ধ থাকায় বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। ফলে এই জলপথ এখন তেহরানের জন্য কেবল একটি রুট নয়, বরং ওয়াশিংটনের ওপর চাপ সৃষ্টির প্রধান রাজনৈতিক অস্ত্র।
ইরানের শক্তিশালী প্রতিরক্ষা বাহিনী আইআরজিসি (ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কর্পস) এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র নৌ-অবরোধের নামে মূলত সমুদ্রপথে ‘জলদস্যুতা’ এবং মালামাল চুরির মতো কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে। এর প্রতিক্রিয়ায় আইআরজিসি হরমুজ প্রণালীতে পুনরায় কঠোর অবরোধ জারি করেছে। তারা স্পষ্ট করেছে যে, যতক্ষণ পর্যন্ত ইরানি জাহাজের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত না হচ্ছে, ততক্ষণ এই নিয়ন্ত্রণ শিথিল করা হবে না।
ট্রাম্প অবশ্য তার অবস্থানে অনড়। তিনি আবারও বোমাবর্ষণের হুমকি দিয়ে বলেছেন, ২২ এপ্রিলের মধ্যে চুক্তি না হলে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ আর বাড়ানো হবে না। অন্যদিকে ইরান বলছে, তারা চাপের মুখে কোনো সিদ্ধান্ত নেবে না। দুই দেশের এই অনমনীয় মনোভাবের কারণে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজগুলো এখন গভীর সমুদ্রে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে।
আপাতত ইসলামাবাদে হতে যাওয়া পরবর্তী সংলাপের দিকেই তাকিয়ে আছে বিশ্ব। তবে ট্রাম্পের ‘সাত দাবি’ এবং তেহরানের পাল্টা হুঁশিয়ারি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, আলোচনার টেবিলের চেয়ে যুদ্ধের ময়দানই হয়তো চূড়ান্ত ফয়সালাকারী হতে যাচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের এই সংকট এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে সামান্য একটি ভুল পদক্ষেপ পুরো বিশ্বের অর্থনীতি ও নিরাপত্তাকে তছনছ করে দিতে পারে।

