দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা বৈরিতা আর রক্তক্ষয়ী সংঘাতের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় রচিত হতে যাচ্ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় ওয়াশিংটনের হোয়াইট হাউসে মুখোমুখি বৈঠকে বসতে সম্মত হয়েছে ইসরায়েল ও লেবানন। আগামী এক থেকে দুই সপ্তাহের মধ্যেই এই ঐতিহাসিক সংলাপ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজেই এই চাঞ্চল্যকর তথ্য নিশ্চিত করেছেন। অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে তিনি জানান, এই বৈঠকটি শুধু সৌজন্য সাক্ষাৎ নয়, বরং একটি স্থায়ী শান্তি চুক্তির পথে বড় ধরনের অগ্রগতি হতে পারে। ৪৪ বছর পর এমন উদ্যোগকে তিনি ‘অভাবনীয়’ বলে বর্ণনা করেন।
ট্রাম্পের ভাষায়, “এটি একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত হতে যাচ্ছে। গত ৪৪ বছরে এই প্রথম ইসরায়েল এবং লেবানন সরাসরি কোনো বৈঠকে বসছে। আমি আশাবাদী যে, খুব শীঘ্রই আমরা একটি কার্যকর চুক্তিতে পৌঁছাতে পারব।” এই আলোচনার সম্ভাব্য সময়সীমা আগামী সপ্তাহ বা তার পরের সপ্তাহ হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে।
এই কূটনৈতিক ঘোষণার মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগেই নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ এক পোস্টে ট্রাম্প দুই দেশের মধ্যে একটি অস্থায়ী যুদ্ধবিরতির খবর দেন। তিনি জানান, লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে তার ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে।
তার সেই বার্তার পর, দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্ব ১০ দিনের এক যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হন। যা ইএসটি সময় বৃহস্পতিবার বিকেল ৫টা থেকে কার্যকর হওয়ার কথা। ট্রাম্পের ব্যক্তিগত কূটনৈতিক তৎপরতা মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে আপাতত কিছুটা শীতলতা নিয়ে এসেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
তবে এই শান্তি প্রক্রিয়ার প্রেক্ষাপটটি অত্যন্ত জটিল ও বেদনাদায়ক। চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার মধ্য দিয়ে এই অঞ্চলের সংঘাত এক চরম মাত্রায় পৌঁছায়। ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ত্রিমুখী সেই যুদ্ধের রেশ কাটতে না কাটতেই লেবানন সীমান্তে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে।
গত ২ মার্চ থেকে লেবাননের ভূখণ্ডে আইডিএফ বা ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর বিমান অভিযান শুরু হয়। গত দেড় মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা এই অভিযানে লেবাননের সাধারণ মানুষের জীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। ইসরায়েলি বাহিনীর নিরবচ্ছিন্ন হামলা প্রাণ কেড়ে নিয়েছে হাজার হাজার নিরীহ মানুষের।
সরকারি হিসাব ও আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, গত ২ এপ্রিল থেকে এ পর্যন্ত লেবাননে প্রায় ২ হাজার ২০০ মানুষ নিহত হয়েছেন। আহতের সংখ্যা ছাড়িয়ে গেছে ৫ হাজার ৬০০ জন। বোমাবর্ষণ আর গোলাগুলির তীব্রতায় ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে পথে নেমেছেন কয়েক লাখ লেবানিজ।
ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া বৈরুতের শহরতলি থেকে শুরু করে দক্ষিণ লেবাননের গ্রামগুলো এখন জনশূন্য। এই মানবিক সংকটের মুখে ট্রাম্পের এই শান্তি উদ্যোগ বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে। যদিও সমালোচকদের মতে, এই যুদ্ধবিরতি বা সংলাপ কতটা স্থায়ী হবে, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যায়।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অবশ্য এসব সংশয়কে উড়িয়ে দিতে চাইছেন। তিনি মনে করেন, তার ‘ডিল মেকিং’ বা সমঝোতা করার ক্ষমতা মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন প্রভাবকে নতুন করে সংহত করবে। বিশেষ করে নির্বাচনে জেতার পর বৈদেশিক নীতিতে এমন এক বড় সাফল্য তার রাজনৈতিক অবস্থানকে আরও সুসংহত করবে বলে মনে করা হচ্ছে।
হোয়াইট হাউসে হতে যাওয়া এই বৈঠকটিকে ঘিরে এখন উত্তেজনার পারদ তুঙ্গে। কারণ, শুধু সীমান্ত বিরোধ নয়, বরং হিজবুল্লাহর অবস্থান এবং আঞ্চলিক সার্বভৌমত্বের মতো বিষয়গুলো এখানে আলোচনার টেবিলে থাকবে। ৪৪ বছরের ব্যবধানে হওয়া এই বৈঠক যদি সত্যিই কোনো চুক্তিতে গড়ায়, তবে তা হবে বর্তমান দশকের সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক বিজয়।
লেবাননের সাধারণ মানুষ, যারা গত কয়েক সপ্তাহ ধরে আকাশের দিকে তাকিয়ে দিন পার করেছেন পরবর্তী হামলার ভয়ে, তাদের জন্য এই যুদ্ধবিরতি এক চিলতে স্বস্তি নিয়ে এসেছে। তবে স্থায়ী শান্তি আসবে কি না, তা নির্ভর করছে হোয়াইট হাউসের সেই রুদ্ধদ্বার বৈঠকের ওপর।
ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এই সংলাপ নিয়ে এখনও বিস্তারিত কোনো মন্তব্য করেননি। তবে ট্রাম্পের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এই আলোচনার পথকে সুগম করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অন্যদিকে, লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন তার দেশের ধ্বংসপ্রাপ্ত অবকাঠামো ও মানবিক বিপর্যয়ের কথা মাথায় রেখে এই সংলাপে বসতে রাজি হয়েছেন।
আগামী দিনগুলোতে ওয়াশিংটনের কূটনৈতিক তৎপরতা এখন পুরো বিশ্বের নজরে থাকবে। ট্রাম্পের এই শান্তি মিশন কি সত্যিই মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তির সূচনা করবে, নাকি এটি কেবল সাময়িক এক বিরতি—তা সময়ই বলে দেবে। তবে আপাতত, লেবাননের আকাশে বোমার গর্জন থেমেছে, আর হোয়াইট হাউসে সাজ সাজ রব চলছে এক ঐতিহাসিক সংলাপের।
বৈশ্বিক রাজনীতিতে মার্কিন প্রভাব যখন বারবার চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে, তখন ট্রাম্পের এই ‘পারসোনাল ডিপ্লোম্যাসি’ বা ব্যক্তিগত কূটনীতি কতোটা সফল হয়, সেটাই এখন দেখার বিষয়। ইসরায়েল-লেবানন শান্তি বৈঠক কেবল দুই দেশের স্বার্থ নয়, বরং সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতার জন্য এক লিটমাস টেস্ট হিসেবে গণ্য হচ্ছে।
রয়টার্স এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থার তথ্য অনুসারে, এই সংলাপের এজেন্ডায় সীমান্ত নির্ধারণ এবং শরণার্থী প্রত্যাবাসনের মতো স্পর্শকাতর বিষয়গুলোও অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে। হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তারা দিনরাত কাজ করছেন একটি খসড়া রূপরেখা তৈরির জন্য, যা দুই পক্ষই মেনে নিতে পারে।
শেষ পর্যন্ত সংলাপে কী ফলাফল আসে, তা জানতে আমাদের আরও অন্তত এক সপ্তাহ অপেক্ষা করতে হবে। তবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই ঘোষণা যে বিশ্ব রাজনীতিতে এক বড় ঝিলিক দিয়ে গেছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্রে রক্তপাতের বদলে এখন আলোচনার টেবিলই মূখ্য হয়ে ওঠার সম্ভাবনা উঁকি দিচ্ছে।

