রাজধানীর এক অভিজাত সেমিনারে দাঁড়িয়ে নারীদের শারীরিক ও ডিজিটাল নিরাপত্তার প্রশ্নে দেশের রাজনৈতিক দলগুলোকে আরও সংবেদনশীল এবং দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন ব্যারিস্টার জাইমা রহমান। তিনি মনে করেন, কেবল রাষ্ট্রীয় আইন দিয়ে নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়, যদি না রাজনৈতিক দলগুলো তাদের অভ্যন্তরীণ কাঠামোতে আমূল পরিবর্তন আনে। বিশেষ করে ক্রমবর্ধমান সাইবার বুলিং বা অনলাইনে হেনস্তা রোধে দলগুলোর নিজস্ব ‘কোড অব কন্ডাক্ট’ বা আচরণবিধি থাকা প্রয়োজন।
রোববার (৮ ফেব্রুয়ারি) বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজে (বিআইআইএসএস) আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে এসব কথা বলেন তিনি। ‘গণতন্ত্রের সংগ্রামে নারী: অবদান ও আগামীর বাংলাদেশ’ শীর্ষক এই অনুষ্ঠানে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কন্যা জাইমা রহমান তরুণ নারী নেতৃত্বের বিকাশ ও তাদের প্রতিবন্ধকতাগুলো তুলে ধরেন।
জাইমা রহমান বলেন, “রাজনৈতিক দলগুলোর যদি নিজস্ব আচরণবিধি থাকে, তবে নারী কর্মীরা সংগঠনের ভেতরে আরও সুরক্ষিত বোধ করবেন। সাইবার বুলিং হোক বা শারীরিক হেনস্তা—যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় দলগুলোকে তাদের নারী সদস্যদের পাশে শক্ত হয়ে দাঁড়াতে হবে। এটি কোনো দয়া নয়, বরং রাজনৈতিক দলগুলোর নৈতিক দায়িত্ব।”
রাজনীতিতে নারীদের গুণগত অংশগ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি একটি শক্তিশালী ‘পাইপলাইন’ তৈরির কথা বলেন। তার মতে, ছাত্র রাজনীতি থেকে শুরু করে স্থানীয় সরকার পর্যায় পর্যন্ত যদি নারী নেতৃত্বের এই ধারাবাহিকতা বা পাইপলাইন মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ করা না হয়, তবে নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে যোগ্য নারী খুঁজে পাওয়া দুষ্কর হবে। জাইমা স্পষ্ট করে বলেন, “যদি নারীরা নীতি তৈরির টেবিলে না থাকেন, তবে তাদের প্রকৃত সমস্যা ও সমাধানগুলো কখনোই পুরোপুরি উঠে আসবে না।”
নারী ও পুরুষের সুযোগ-সুবিধার বৈষম্য নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি পারিবারিক ও কাঠামোগত বাধার কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, রাজনীতিতে পুরুষরা যতটা সহজলভ্য সুযোগ পান, নারীরা ততটা পান না। অনেক সময় নারীদের ব্যক্তিগত জীবন বা মাতৃত্বকে তাদের ক্যারিয়ারের পথে বাধা হিসেবে দেখা হয়। এই মানসিকতা পরিবর্তনের জন্য দলগুলোর ভেতরেই মেন্টরশিপ ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা জরুরি।
অনুষ্ঠানে জাইমা রহমান ডে-কেয়ার সেন্টারের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, কেবল একটি ঘরকে ‘ডে-কেয়ার’ নাম দিলেই হবে না; সেখানে দক্ষ ট্রেইনার ও পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসম্মত ব্যবস্থা থাকতে হবে। তবেই মায়েরা নিশ্চিন্তে কাজ বা রাজনীতিতে মনোযোগ দিতে পারবেন। এছাড়া রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা একটি বড় বাধা বলে তিনি মনে করেন। দলগুলোকে নারী প্রার্থীদের আর্থিক ও সাংগঠনিক সহায়তা দিয়ে এই বৈষম্য দূর করার আহ্বান জানান তিনি।
উইমেন ইন ডেমোক্রেসি (উইন্ড) আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন বীর মুক্তিযোদ্ধা লুৎফা হাসিন রোজী, অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ কবির এবং সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সারা হোসেন। বক্তারা সবাই একমত হন যে, আগামীর সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে হলে নারীদের জন্য কেবল কোটা নয়, বরং একটি নিরাপদ ও সম্মানজনক কাজের পরিবেশ নিশ্চিত করা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
জাইমা রহমানের এই বক্তব্য রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে সাইবার স্পেসে নারীদের সুরক্ষার বিষয়টি রাজনৈতিক দলগুলোর এজেন্ডায় অন্তর্ভুক্ত করার দাবিটি বেশ সময়োপযোগী বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

