কয়েক দশক ধরে চলমান ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাতের চূড়ান্ত ও একমাত্র সমাধান হিসেবে একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পক্ষে দ্ব্যর্থহীন অবস্থান ব্যক্ত করেছেন খ্রিস্টান ধর্মের রোমান ক্যাথলিক শাখার সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা পোপ লিও চতুর্দশ। রবিবার (১ ডিসেম্বর) তুরস্ক থেকে লেবাননের উদ্দেশে যাত্রাপথে বিমানে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি ভ্যাটিকানের এই নীতিগত অবস্থান পুনর্বার নিশ্চিত করেন, যা এই অঞ্চলে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য একটি শক্তিশালী নৈতিক বার্তা বহন করে।
পোপ লিও চতুর্দশের এই মন্তব্যটি এমন এক সময়ে এল, যখন আন্তর্জাতিক মহল, যার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের একটি অংশও রয়েছে, ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পক্ষে মত দিলেও ইসরায়েলের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু এর বিরোধিতা করে আসছেন। ভ্যাটিকানের সর্বোচ্চ নেতার এই বক্তব্য শান্তি আলোচনায় মধ্যস্থতাকারীদের ভূমিকা এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আকাঙ্ক্ষাকে আরও জোরদার করবে বলে মনে করা হচ্ছে।
ইতালীয় ভাষায় দেওয়া সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে পোপ লিও চতুর্দশ ভ্যাটিকানের চিরাচরিত ‘দ্বি-রাষ্ট্র নীতি’র প্রতি তার সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, এই সংঘাতের অবসানের জন্য একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা অপরিহার্য।
পোপ বলেন, “আমরা সবাই জানি, এই মুহূর্তে ইসরায়েল এখনও সেই সমাধানটি মেনে নেয়নি। তবে আমরা এটিকে একমাত্র সমাধান হিসেবে দেখি।”
একই সঙ্গে পোপ লিও সংঘাতের উভয় পক্ষের প্রতি তার সহানুভূতি এবং ন্যায়সঙ্গত সমাধানের জন্য মধ্যস্থতার ভূমিকার ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, “আমরা ইসরায়েলেরও বন্ধু এবং দুই পক্ষের মাঝে ন্যায়সঙ্গত সমাধানের জন্য আমরা মধ্যস্থতার ভূমিকা রাখার চেষ্টা করছি।” ভ্যাটিকান সবসময়ই এই সংঘাতের শান্তিপূর্ণ এবং ন্যায্য সমাধানের জন্য একটি ভারসাম্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এসেছে।
মে মাসে ১৪০ কোটি সদস্যের ক্যাথলিক চার্চের প্রধান হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার পর এটিই ছিল পোপ লিও চতুর্দশের প্রথম বিদেশ সফর। তুরস্ক সফর কেন্দ্র করে আয়োজিত আট মিনিটের এই সংক্ষিপ্ত সংবাদ সম্মেলন মূলত তুরস্ক ভ্রমণের অভিজ্ঞতা নিয়ে ছিল।
পোপ জানিয়েছেন, তুরস্ক সফরের সময় তিনি প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ানের সঙ্গে শুধু ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাত নয়, বরং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। পোপ মনে করেন, এই দুটি রক্তক্ষয়ী সংঘাতের সমাপ্তি টানার ক্ষেত্রে তুরস্ক একটি গুরুত্বপূর্ণ এবং কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে, কারণ দেশটি ভৌগোলিক ও রাজনৈতিকভাবে উভয় সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুর কাছাকাছি অবস্থিত।
তুরস্ক সফরের সময় তিনি বিশ্বজুড়ে রক্তক্ষয়ী সংঘাত বৃদ্ধি পাওয়ায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি সতর্ক করে বলেছিলেন যে, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে একযোগে চলা এই সংঘাত মানবজাতির ভবিষ্যৎকে বিপন্ন করে তুলছে। এ সময় তিনি ধর্মের নামে সংঘটিত সকল প্রকার সহিংসতার তীব্র নিন্দা জানান।
পোপ লিও চতুর্দশ, যিনি সাধারণত কূটনৈতিক ভাষায় কথা বলতেই অভ্যস্ত, তিনি চলতি বছরের শুরুর দিকে গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের কড়া সমালোচনা করেছিলেন। তাঁর এই সমালোচনামূলক অবস্থান আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছিল।
তুরস্ক সফরে গিয়ে পোপ লিও সেখানকার ধর্মীয় সহাবস্থানের উদাহরণ তুলে ধরেন। উল্লেখ্য, মুসলিমপ্রধান তুরস্ক হলো বিশ্বব্যাপী ২৬ কোটি অর্থোডক্স খ্রিস্টানের আধ্যাত্মিক নেতা প্যাট্রিয়ার্ক বারথোলোমিউ-এরও বাসস্থান।
ধর্মীয় সম্প্রীতির বিষয়ে পোপ লিও বলেন, “বিভিন্ন ধর্মের মানুষ শান্তিতে সহাবস্থান করতে পারে। এটাই সেই উদাহরণ, যা আমরা বিশ্বজুড়ে দেখতে চাই।” তার এই বার্তাটি সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে শান্তি ও বোঝাপড়ার প্রয়োজনীয়তাকেই সামনে নিয়ে আসে।
তুরস্ক সফরের পর পোপ লিও চতুর্দশ বর্তমানে লেবাননে অবস্থান করছেন। তিনি মঙ্গলবার পর্যন্ত সেখানে থাকবেন এবং এরপর রোমে ফিরে যাবেন। লেবানন, যেখানে খ্রিস্টান ও মুসলিম সম্প্রদায় বহু বছর ধরে জটিল রাজনৈতিক ও সামাজিক সম্পর্কের মধ্যে রয়েছে, সেখানে পোপের উপস্থিতি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ধারণা করা হচ্ছে, তাঁর লেবানন সফরের মূল উদ্দেশ্য হলো সংঘাতপূর্ণ মধ্যপ্রাচ্যে খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের প্রতি সমর্থন জানানো এবং আন্তঃধর্মীয় সংলাপকে উৎসাহিত করা।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, পোপ লিও চতুর্দশের ফিলিস্তিন রাষ্ট্র সংক্রান্ত এই দ্ব্যর্থহীন মন্তব্য সংঘাত নিরসনে আন্তর্জাতিক চাপ বাড়াতে এবং মধ্যস্থতার প্রচেষ্টায় একটি শক্তিশালী নৈতিক ভিত্তি তৈরি করবে। একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করাই এই সংঘাতের অবসানের একমাত্র কার্যকর উপায়—ভ্যাটিকানের এই নীতিগত অবস্থান বিশ্বব্যাপী একটি গুরুত্বপূর্ণ কণ্ঠস্বর হিসেবে পরিচিত।

