বাংলাদেশের বিদ্যমান সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ধর্মীয় মূল্যবোধের অবমাননা এবং জাতীয় সংহতি বিনষ্টের যেকোনো অপচেষ্টার বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ। সংগঠনের কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদী বুধবার এক বিশেষ বিবৃতিতে স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, দেশকে অস্থিতিশীল করার লক্ষ্যে যদি কোনো গোষ্ঠী বা মহল চক্রান্তে লিপ্ত হয়, তবে তৌহিদী জনতা নীরব দর্শক হয়ে বসে থাকবে না।
বিশেষ করে বিজয় দিবসকে কেন্দ্র করে ইসলামের মৌলিক বিধান এবং মুসলমানদের ধর্মীয় প্রতীক দাড়ি ও টুপিকে তথাকথিত ‘রাজাকারের প্রতীক’ হিসেবে উপস্থাপন করে ঘৃণা ছড়ানোর যে প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে, তার কড়া সমালোচনা করেন তিনি। একে একটি সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্র হিসেবে অভিহিত করে তিনি বলেন, এ ধরনের উস্কানিমূলক কর্মকাণ্ড দেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও জুলাই বিপ্লবের অর্জনকে ক্ষতিগ্রস্ত করার নামান্তর।
মাওলানা ইসলামাবাদী তার বিবৃতিতে বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করতে গিয়ে বলেন, আমরা অত্যন্ত উদ্বেগের সাথে লক্ষ্য করছি যে, মহান বিজয় দিবসকে উপলক্ষ্য করে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে একদল স্বার্থান্বেষী মহল পরিকল্পিতভাবে মুসলমানদের ধর্মীয় পরিচিতিকে লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে।
দাড়ি, টুপি ও সুন্নতি পোশাককে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করার মাধ্যমে মূলত ইসলাম ও মুসলমানদের প্রতি ঘৃণার চর্চা পুনরায় শুরু হয়েছে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, কেন বারবার বিজয় দিবসের মতো একটি জাতীয় উৎসবকে ব্যবহার করে মুসলমানদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেওয়া হচ্ছে?
এই ধরনের কর্মকাণ্ড কেবল অনভিপ্রেত নয়, বরং এটি জাতিকে নতুন করে বিভাজনের দিকে ঠেলে দেওয়ার একটি নীল নকশা। তিনি দেশপ্রেমিক জনতাকে এই ‘ঘৃণাজীবীদের’ চিহ্নিত করে সামাজিকভাবে প্রতিহত করার উদাত্ত আহ্বান জানান।
বিগত সরকারের সমালোচনা করে হেফাজতে ইসলামের এই নেতা বলেন, পতিত ফ্যাসিস্ট শক্তি দীর্ঘ সময় ধরে দেশে ইসলাম নির্মূলের এক সূক্ষ্ম রাজনীতি পরিচালনা করেছে। তাদের শাসনামলে মুসলিম পরিচয় এবং ইসলামী নাম-নিশানাকে সুকৌশলে ঘৃণার লক্ষ্যবস্তু বানানো হয়েছিল।
মানুষের ধর্মীয় স্বাতন্ত্র্যবোধকে হরণ করে এক ধরনের সাংস্কৃতিক আধিপত্য চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে ছাত্র-জনতা যখন শান্তি ও সহাবস্থানের একটি নতুন পথ তৈরি করেছে, ঠিক সেই সুযোগে কিছু হিন্দুত্ববাদী অপশক্তি এবং বাম সেকুলার গোষ্ঠী আবারও মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে।
তারা বিভেদ সৃষ্টি করে দেশকে একটি অস্থিতিশীল পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিতে চাইছে। মাওলানা ইসলামাবাদী হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, যদি এই অপতৎপরতা বন্ধ না হয়, তবে দেশের শান্তিকামী জনতা রাজপথে এর দাঁতভাঙা জবাব দিতে বাধ্য হবে।
বিবৃতিতে তিনি ‘রাজাকার’ শব্দের অপব্যবহার নিয়ে এক নতুন রাজনৈতিক ভাষ্য তুলে ধরেন। তিনি বলেন, মানুষকে ‘রাজাকার’ তকমা দিয়ে দমন করার যে সংস্কৃতি ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকার গড়ে তুলেছিল, তা জুলাই অভ্যুত্থানের মাধ্যমেই ধূলিসাৎ হয়ে গেছে। নতুন প্রজন্মের বিপ্লবীরা এখন আর সেই পুরনো ও বিতর্কিত বয়ান গ্রহণ করছে না।
জুলাই বিপ্লবের মধ্য দিয়ে তরুণ প্রজন্ম আধিপত্যবাদী শক্তির চাপিয়ে দেওয়া ইতিহাস ও চেতনাকে প্রত্যাখ্যান করেছে। একাত্তরের মহান জনযুদ্ধকে যারা একটি বিশেষ প্রতিবেশী রাষ্ট্রের স্বার্থে ব্যবহার করতে চেয়েছিল, তারা মূলত ক্ষমতার মোহে স্বজাতির সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। তাদের এই মেরুদণ্ডহীন নীতির কারণেই আজ ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিসহ দেশটির শীর্ষ নেতারা বাংলাদেশের বিজয় দিবসকে নিজেদের বলে দাবি করার ধৃষ্টতা দেখাতে পারছেন।
মাওলানা ইসলামাবাদী দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করেন যে, একাত্তরের রক্তাক্ত জনযুদ্ধ এবং তার পরবর্তী বিজয় একান্তই বাংলাদেশের মানুষের, এর ওপর অন্য কোনো রাষ্ট্রের কৃতিত্ব জাহির করার সুযোগ নেই।
ইতিহাসের ধারাবাহিকতা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদী এক গুরুত্বপূর্ণ তত্ত্ব উপস্থাপন করেন। তিনি বলেন, সাতচল্লিশের দেশভাগ ছিল আমাদের প্রথম স্বাধীনতার সোপান, যার উত্তরসূরি হিসেবে এসেছে একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ। আর চব্বিশের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান হলো সেই স্বাধীনতার সিলসিলা বা ধারাক্রমের এক আধুনিকতম রূপ।
সুতরাং ১৯৪৭, ১৯৭১ এবং ২০২৪—এই তিন বছরের প্রতিটি ঘটনাই আমাদের জাতীয় জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং আমাদের আজাদীর সিলসিলা। এর কোনো একটিকে অস্বীকার করা বা খাটো করে দেখার অর্থ হলো জাতীয় অস্তিত্বকে অস্বীকার করা।
তিনি আক্ষেপ করে বলেন, এতদিন একাত্তরকে এক ধরনের ‘ব্লাসফেমি’ বা অলঙ্ঘনীয় ধর্মীয় বিষয়ের মতো বানিয়ে রাখা হয়েছিল, যেখানে কোনো তথ্য বা সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তোলাও ছিল অপরাধ। তিনি মনে করেন, একাত্তরের জনযুদ্ধ কারো ব্যক্তিগত বা পারিবারিক সম্পত্তি নয়; এটি গণমানুষের ত্যাগের ফসল।
ভারতীয় বয়ানে মুক্তিযুদ্ধের প্রচারকদের সরাসরি ‘ফ্যাসিবাদ ও আধিপত্যবাদের দালাল’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন মাওলানা ইসলামাবাদী। তার মতে, যারা বাংলাদেশের জাতীয় ইতিহাসকে দিল্লির আয়নায় দেখতে পছন্দ করেন, তারা মূলত এদেশের মানুষের সত্যিকারের মুক্তির আকাঙ্ক্ষাকে অবদমিত রাখতে চান। তিনি দাবি করেন যে, এখন সময় এসেছে প্রকৃত এবং সত্য ইতিহাস চর্চা করার।
ইতিহাস কোনো বিশেষ গোষ্ঠী বা আদর্শের কুক্ষিগত হওয়া উচিত নয়। প্রকৃত ইতিহাস কেবল তখনই প্রস্ফুটিত হবে যখন সাতচল্লিশ থেকে চব্বিশ পর্যন্ত প্রতিটি মুক্তি সংগ্রামের অবদানকে যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হবে। তিনি বিশ্বাস করেন, জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে দেশ যে দ্বিতীয় স্বাধীনতা লাভ করেছে, তা রক্ষা করতে হলে এই আধিপত্যবাদী মনস্তত্ত্ব থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
বিবৃতিতে দেশের মুসলিম জনতাকে সতর্ক করে তিনি বলেন, দাড়ি ও টুপি আমাদের ধর্মীয় ঐতিহ্যের অংশ, এটি কোনো রাজনৈতিক বা অপরাধী পরিচয়ের লেবেল হতে পারে না। বিজয় দিবসের আয়োজনে এসব প্রতীককে ব্যঙ্গ করা বা ঘৃণার পাত্র হিসেবে উপস্থাপন করা মূলত পরোক্ষভাবে ইসলামকেই আঘাত করা।
এ ধরনের উস্কানি দেশের কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ ঘটায়। তিনি সরকারকে এই বিষয়ে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে বলেন, বিপ্লব-পরবর্তী বাংলাদেশে কোনো বিশেষ ধর্ম বা বর্ণের মানুষকে হেয় প্রতিপন্ন করার সুযোগ দেওয়া উচিত নয়। যারা বিজয়ের আনন্দকে কলুষিত করে সাম্প্রদায়িক উস্কানি দিচ্ছে, তাদের আইনের আওতায় আনা জরুরি।
মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদী তার বক্তব্যের শেষ দিকে ছাত্র-জনতার সংহতির ওপর জোর দিয়ে বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লব আমাদের শিখিয়েছে কীভাবে অন্যায়ের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হতে হয়। এই ঐক্য কোনো বিশেষ গোষ্ঠী বা প্রতিবেশী রাষ্ট্রের ইশারায় নষ্ট হতে দেওয়া যাবে না।
তিনি বলেন, “আমরা দেশে একটি টেকসই শান্তি এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি চাই। কিন্তু সেই শান্তির সুযোগ নিয়ে যদি কেউ আমাদের ঈমানি পরিচয় ও জাতীয় সার্বভৌমত্বে আঘাত হানে, তবে আমরা আমাদের জীবন বাজি রেখে হলেও তা রক্ষা করব।” তিনি সকল পর্যায়ের আলেম-ওলামা এবং ধর্মপ্রাণ জনতাকে সজাগ থাকার আহ্বান জানান যাতে কোনো কুচক্রী মহল দেশে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বা অস্থিতিশীলতা তৈরি করতে না পারে।
উপসংহারে মাওলানা ইসলামাবাদী বলেন, বাংলাদেশকে একটি আধুনিক ও স্বনির্ভর রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে হলে আমাদের শিকড়কে ভুলে গেলে চলবে না। ধর্মীয় অনুশাসন ও জাতীয় বীরত্ব—উভয়কেই সমমর্যাদায় ধারণ করে আমাদের সামনে এগিয়ে যেতে হবে।
যারা বিজয় দিবসের চেতনাকে সংকীর্ণ দলীয় বা সাম্প্রদায়িক স্বার্থে ব্যবহার করছে, তারা মূলত দেশের শত্রু। দেশবাসী এখন জাগ্রত, এবং যেকোনো ষড়যন্ত্রের জাল ছিঁড়ে ফেলতে তারা সদা প্রস্তুত। হেফাজতে ইসলামের এই শীর্ষ নেতার বক্তব্য থেকে এটি পরিষ্কার যে, আগামী দিনগুলোতে যেকোনো ধরনের সাংস্কৃতিক বা রাজনৈতিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ধর্মীয় সংগঠনগুলো এক কঠোর অবস্থানে থাকতে যাচ্ছে।

