তিন বছর আগে ‘হাওয়া’ সিনেমার মাধ্যমে ঢালিউডের ঝিমিয়ে পড়া পালে যে নতুন হাওয়া লেগেছিল, তার রেশ এখনো কাটেনি। সমুদ্রের নোনা জল, রহস্যময় গুমোট আবহাওয়া আর ‘সাদা সাদা কালা কালা’র জাদুতে বুঁদ হয়ে থাকা দর্শক তখন থেকেই অপেক্ষায় ছিলেন নির্মাতা মেজবাউর রহমান সুমনের পরবর্তী কাজের জন্য। দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে তিনি হাজির হয়েছেন তার নতুন চলচ্চিত্র ‘রইদ’ নিয়ে।
মহান বিজয় দিবসের সন্ধ্যায় এক জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজনে উন্মোচিত হয়েছে সিনেমাটির প্রথম ঝলক বা ট্রেলার। আর সেই ট্রেলার প্রকাশের পর থেকেই ভার্চুয়াল জগতে শুরু হয়েছে এক অভাবনীয় তোলপাড়। সাধারণ দর্শক থেকে শুরু করে চলচ্চিত্র সমালোচক—সবার একবাক্যে স্বীকারোক্তি, ‘রইদ’ কেবল একটি সিনেমা নয়, বরং এটি হতে যাচ্ছে বাংলা চলচ্চিত্রের দৃশ্যকাব্যের এক নতুন এবং শক্তিশালী অধ্যায়।
মেজবাউর রহমান সুমনের নির্মাণ মানেই গল্পের ভেতরে এক ভিন্নধর্মী দর্শনের ছোঁয়া। ‘রইদ’ ট্রেলারের প্রতিটি ফ্রেমে সেই মুন্সিয়ানার পরিচয় পাওয়া গেছে। ট্রেলারটি শুরু হয় এক ম্লান অথচ তীব্র রোদের খেলার মধ্য দিয়ে, যা সিনেমার নামকে সার্থক করে তোলে। প্রচলিত বাণিজ্যিক সিনেমার যে চাকচিক্য বা জৌলুশ আমরা দেখে অভ্যস্ত, ‘রইদ’ তার সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুতে অবস্থান করছে।
ট্রেলারজুড়ে রয়েছে এক ধরনের রহস্যময় গুমোট ভাব এবং ধূসর রঙের প্রাধান্য। ব্যাকগ্রাউন্ডে কান ফাটানো চড়া মিউজিকের বদলে মেজবাউর রহমান সুমন গুরুত্ব দিয়েছেন প্রকৃতির নিজস্ব শব্দকে। দীর্ঘশ্বাস, বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দ আর নৈঃশব্দ্যের মাঝখানে চরিত্রের অভিব্যক্তিগুলো দর্শককে যেন এক অপার্থিব অভিজ্ঞতার সম্মুখীন করে। এই ধরনের ডার্ক এবং রিয়েলিস্টিক টোন সচরাচর আন্তর্জাতিকমানের আর্ট ফিল্মগুলোতে দেখা যায়, যা এবার দেশের বড় পর্দায় দেখার সৌভাগ্য হবে দর্শকদের।
সিনেমাটির অভিনয়শিল্পীদের রূপান্তর দর্শকদের সবচেয়ে বেশি চমকে দিয়েছে। ‘হাওয়া’র গুলতি খ্যাত অভিনেত্রী নাজিফা তুষিকে এখানে দেখা গেছে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক আবহে। তার প্রসাধনহীন চেহারা, সাধারণ শাড়ি আর চোখেমুখে ফুটে ওঠা অব্যক্ত যন্ত্রণা এক মুহূর্তের জন্য হলেও দর্শককে স্থির করে দেয়। তুষি যে কেবল গ্ল্যামার নয়, বরং অভিনয়ের গভীরতা দিয়েও পর্দায় আধিপত্য বিস্তার করতে পারেন, তার প্রমাণ ‘রইদ’-এর প্রতিটি দৃশ্য।
অন্যদিকে, অভিনেতা মোস্তাফিজুর নূর ইমরানকে চেনাই যেন দায় হয়ে পড়েছে। তার রাফ অ্যান্ড টাফ লুক, তীক্ষ্ণ চাহনি এবং অস্থির বডি ল্যাঙ্গুয়েজ জানান দিচ্ছে যে, এই সিনেমায় তিনি এক বিধ্বংসী এবং জটিল চরিত্রে অভিনয় করেছেন। ‘সাহস’ বা ‘কাইজার’-এর মতো কাজের মাধ্যমে ইমরান আগেই নিজের জাত চিনিয়েছেন, তবে সুমনের ফ্রেমের নিচে তিনি যেন আরও বেশি অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছেন।
ট্রেলারটিতে সংলাপের ব্যবহার ছিল অত্যন্ত পরিমিত। তবে যে দু-একটি কথা শোনা গেছে, তা যেন তীরের মতো হৃদয়ে বিঁধে যাওয়ার ক্ষমতা রাখে। এই স্বল্পভাষী উপস্থাপনাটি মূলত সিনেমার শৈল্পিক গুণকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। সিনেমাটোগ্রাফির ক্ষেত্রে ‘রইদ’ এক অনন্য উচ্চতা স্পর্শ করেছে। অগ্নিকাণ্ডের দৃশ্যগুলোতে আলোর ব্যবহার এবং চরিত্রগুলোর ওপর ছায়ার খেলা এতটাই শৈল্পিক যে, অনেক দর্শক এর সঙ্গে মালয়ালম ঘরানার ‘আর্ট ড্রিভেন’ সিনেমাগুলোর তুলনা করছেন।
দক্ষিণ ভারতীয় চলচ্চিত্রের যে শক্তিশালী ভিজ্যুয়াল স্টোরিটেলিংয়ের ভক্ত আমরা সবাই, ‘রইদ’ যেন সেই একই মানের এক দেশীয় নির্মাণ। আলোর সূক্ষ্ম কারুকাজ এবং ক্যামেরার অ্যাঙ্গেলগুলো বলে দেয় যে, দীর্ঘ তিন বছর সুমন কেবল একটি গল্প লেখেননি, বরং প্রতিটি ফ্রেম নিয়ে গবেষণা করেছেন।
ট্রেলার প্রকাশের পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোতে প্রশংসার বন্যা বয়ে যাচ্ছে। নেটিজেনদের মধ্যে এক ধরণের সম্মিলিত উচ্ছ্বাস দেখা গেছে। অনেকেই মন্তব্য করেছেন যে, এটি যেন কোনো মালয়ালম সিনেমার বাংলা ডাবিং নয়, বরং বাংলার মাটিতেই নির্মিত এক আন্তর্জাতিক মানের কাজ। কেউ কেউ লিখেছেন, প্রতিটি ফ্রেম আলাদাভাবে একেকটা গল্প বলে যায়।
বিশেষ করে সিনেমার কালার গ্রেডিং এবং সাউন্ড ডিজাইনের প্রশংসা করছেন তরুণ নির্মাতারাও। দর্শকদের একাংশ মনে করছেন, ‘রইদ’ বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসে এক নতুন মাইলফলক হতে যাচ্ছে। ‘হাওয়া’ যদি দর্শকদের প্রেক্ষাগৃহমুখী করে থাকে, তবে ‘রইদ’ সেই দর্শকদের রুচিকে আরও এক ধাপ ওপরে নিয়ে যাবে—এমনটাই প্রত্যাশা চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্টদের।
বিজয় দিবসের সন্ধ্যায় ট্রেলার প্রকাশ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সিনেমাটির মূল কলাকুশলীরা। অভিনেতা মোস্তাফিজুর নূর ইমরান, নাজিফা তুষি, বরেণ্য অভিনেতা গাজী রাকায়েত এবং উদীয়মান তারকা আহসাবুল ইয়ামিন রিয়াদসহ অনেকেই তাদের অভিজ্ঞতার কথা ভাগ করে নেন। নির্মাতা মেজবাউর রহমান সুমন বরাবরের মতোই মিতভাষী ছিলেন, তবে তার চোখেমুখে ছিল আত্মবিশ্বাসের ছটা।
তিনি বরাবরই বিশ্বাস করেন যে, সিনেমা হলো দেখার মাধ্যম, শোনার নয়। আর সেই বিশ্বাস থেকেই তিনি ‘রইদ’-কে একটি ভিজ্যুয়াল ট্রিট হিসেবে গড়ে তুলেছেন। সিনেমার সেট ডিজাইন থেকে শুরু করে কস্টিউম—সবকিছুতেই এক ধরনের মেটে এবং গ্রামীন আবহ থাকলেও তার উপস্থাপনা ছিল অত্যন্ত আধুনিক এবং গ্লোবাল।
সিনেমার পেছনের কারিগরি দলটির কঠোর পরিশ্রম ট্রেলারের প্রতিটি সেকেন্ডে প্রতিফলিত হয়েছে। বিশেষ করে অগ্নিকাণ্ড এবং যন্ত্রণার দৃশ্যগুলোতে যেভাবে আবহ সংগীত এবং নীরবতাকে ব্যবহার করা হয়েছে, তা দর্শকদের দীর্ঘক্ষণ আবিষ্ট করে রাখার মতো। ‘রইদ’ শব্দের অর্থ রোদের তাপ বা তেজ।
ট্রেলার দেখার পর মনে হচ্ছে, এই সিনেমাটি কেবল প্রকৃতির রইদ নয়, বরং মানুষের জীবনের ভেতরের দহন এবং তপ্ত বাস্তবতাকে তুলে ধরবে। সব মিলিয়ে ‘হাওয়া’র বিশাল সাফল্যের পর মেজবাউর রহমান সুমন যে আবার একটি মাস্টারপিস নিয়ে ফিরছেন, তার আগাম বার্তা তিনি দিয়ে দিলেন এই ট্রেলারের মাধ্যমেই। এখন কেবল বড় পর্দায় সেই তীব্র ‘রইদ’ বা আগুনের তেজ দেখার অপেক্ষা।

