ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষিতে ইউরোপের বিভিন্ন ব্যাংকে গচ্ছিত রাশিয়ার প্রায় ২ হাজার ৪৬০ কোটি ডলারের সম্পদ ব্যবহারের যে পরিকল্পনা ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) গ্রহণ করেছিল, তাতে কড়া আপত্তি জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটন স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, বর্তমানে রুশ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই সম্পদ যে অবস্থায় (ফ্রিজড) আছে, সেভাবেই যেন রাখা হয়। পোল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্কের বরাতে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো এই চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এনেছে।
মঙ্গলবার জার্মানির বার্লিনে ইউক্রেন পরিস্থিতি এবং যুদ্ধ পরবর্তী অর্থায়ন নিয়ে ইউক্রেন ও যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের মধ্যে একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ইইউ-এর প্রতিনিধি হিসেবে সেই বৈঠকে উপস্থিত থাকা ডোনাল্ড টাস্ক জানান, যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউক্রেনকে পুনর্গঠনের লক্ষ্যে রুশ সম্পদ ব্যবহারের ইইউ-এর প্রস্তাবিত সিদ্ধান্তের বিষয়ে মার্কিন কর্মকর্তারা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তারা সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, রুশ সম্পদে হাত দেওয়া হলে তা চলমান সংঘাত নিরসনের প্রক্রিয়াকে নতুন করে জটিল করে তুলবে।
ডোনাল্ড টাস্ক সাংবাদিকদের বলেন, “মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, যদি এই মুহূর্তে রাশিয়ার জব্দ করা অর্থে হাত দেওয়া হয়, তবে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধাবসানের দীর্ঘমেয়াদী সম্ভাবনা ফের অনিশ্চিত হয়ে পড়বে এবং শান্তি আলোচনা ঝুঁকির মুখে পড়বে। তারা পরামর্শ দিয়েছেন, স্থিতিশীলতা বজায় রাখার স্বার্থে এই সম্পদ স্পর্শ না করাই শ্রেয়।”
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে সামরিক অভিযান শুরু করার পর রাশিয়ার ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে পশ্চিমা বিশ্ব। এরই অংশ হিসেবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত বিভিন্ন ব্যাংকে থাকা রাশিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রায় ২ হাজার ৪৬০ কোটি ডলারের সমপরিমাণ সম্পদ জব্দ বা ফ্রিজ করা হয়। দীর্ঘদিন ধরে এই বিপুল পরিমাণ অর্থ অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে।
সম্প্রতি ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লেন একটি প্রস্তাব পেশ করেন, যেখানে বলা হয়—যুদ্ধবিরতির পর ইউক্রেনের জাতীয় বাজেট এবং অবকাঠামো পুনর্গঠনের জন্য এই জব্দ করা রুশ অর্থ কিয়েভকে ঋণ হিসেবে দেওয়া যেতে পারে। গত ১২ ডিসেম্বর ব্রাসেলসে আয়োজিত ইইউ-এর বৈঠকে এই প্রস্তাবটি প্রাথমিক অনুমোদনও পায়। মূলত রাশিয়ার অর্থ দিয়েই রাশিয়ার ধ্বংস করা ইউক্রেনকে গড়ে তোলার একটি কৌশল নিয়েছিল ইউরোপ।
পূর্বনির্ধারিত সূচি অনুযায়ী, আগামীকাল ১৮ ডিসেম্বর ব্রাসেলসে ইউরোপীয় ইউনিয়নের এক বৈঠকে এই প্রস্তাবের ওপর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বিশ্ব রাজনীতির নিয়ন্ত্রক শক্তি যুক্তরাষ্ট্রের এমন আকস্মিক ও কঠোর সতর্কবার্তার পর আগামীকালের বৈঠকটি এখন অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্রের এই আপত্তির পেছনে রাশিয়ার সঙ্গে পর্দার অন্তরালে কোনো কূটনৈতিক সমঝোতা বা বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা রক্ষার চিন্তা কাজ করতে পারে।
রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম ‘আরটি’ জানিয়েছে, মস্কো শুরু থেকেই তাদের সার্বভৌম সম্পদে হাত দেওয়ার যেকোনো প্রচেষ্টাকে ‘আন্তর্জাতিক চুরি’ হিসেবে অভিহিত করে পাল্টা পদক্ষেপের হুমকি দিয়ে আসছে। এখন ওয়াশিংটনের এই অবস্থান ইউরোপীয় দেশগুলোর জন্য এক নতুন কূটনৈতিক সংকট তৈরি করল। একদিকে ইউক্রেনের পুনর্গঠনে অর্থের প্রয়োজন, অন্যদিকে মিত্র যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত সতর্কবার্তা—এই দুইয়ের মাঝে ইইউ এখন কোন পথে হাঁটে, সেটিই দেখার বিষয়।

