স্বাধীনতার আনন্দ উদযাপনের রেশ কাটতে না কাটতেই এক নারকীয় বিপর্যয়ের মুখোমুখি হলো লাতিন আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলা। মাত্র ৪০ সেকেন্ডের ব্যবধানে আছড়ে পড়া দুটি শক্তিশালী ও বিধ্বংসী ভূমিকম্পে কেঁপে উঠেছে পুরো দেশ। মাটির নিচের সেই তীব্র কম্পন মুহূর্তের মধ্যে চিরতরে থামিয়ে দিয়েছে অন্তত ৩২টি তাজা প্রাণ।
রাজধানী কারাকাসসহ দেশের বড় একটি অংশ এখন যেন এক জীবন্ত ধ্বংসস্তূপ। ধসে পড়া ইটের পাঁজর আর ভেঙে পড়া কংক্রিটের নিচ থেকে একের পর এক বের হয়ে আসছে রক্তাক্ত শরীর। ধুলোবালি মাখা সেইসব চেনা মুখের দিকে তাকিয়ে স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে কারাকাসের বাতাস।
দেশটির ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগুয়েজ আজ বৃহস্পতিবার সকালে এক জরুরি বিবৃতিতে এই ভয়াবহ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, উদ্ধার অভিযান এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। ধ্বংসস্তূপের নিচে আরও বহু মানুষ আটকা পড়ে আছেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ফলে নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।
আনন্দ উৎসবের দিনে নেমে এলো অন্ধকার
বুধবার দিনটি ভেনেজুয়েলার মানুষের জন্য ছিল এক মহা আনন্দের উপলক্ষ। প্রতি বছর ২৪ জুনে দেশটিতে একই সঙ্গে সেন্ট জন ব্যাপটিস্টের জন্মদিবস এবং জাতীয় স্বাধীনতা দিবস উদযাপন করা হয়। রাষ্ট্রীয় ছুটির দিন হওয়ায় অধিকাংশ মানুষই নিজ নিজ পরিবার ও প্রিয়জনদের নিয়ে বাড়িতে সময় কাটাচ্ছিলেন।
ঠিক এমন এক ঘরোয়া আবহে ঘড়ির কাঁটায় যখন সন্ধ্যা ৬টা ৪ মিনিট, তখনই প্রথম আঘাতটি আসে। মাটির গভীর থেকে উঠে আসা এক বিকট গর্জন আর তীব্র ঝাঁকুনিতে ঘরবাড়িগুলো তাসের ঘরের মতো দুলতে শুরু করে। মানুষ কিছু বুঝে ওঠার আগেই চারপাশ ধূলিধূসরিত হয়ে পড়ে।
মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএস জানিয়েছে, প্রথম কম্পনটির তীব্রতা ছিল রিখটার স্কেলে ৭ দশমিক ২ মাত্রা। এর রেশ কাটতে না কাটতেই, মাত্র ৪০ সেকেন্ডের মাথায় আঘাত হানে দ্বিতীয় ভূকম্পনটি। এবারের তীব্রতা ছিল আরও ভয়াবহ, রিখটার স্কেলে ৭ দশমিক ৫ মাত্রা। এই জোড়া আঘাতেই লণ্ডভণ্ড হয়ে যায় ভেনেজুয়েলা।
ধ্বংসস্তূপে পরিণত রাজধানী ও উপকূলীয় শহর
ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল বা এপিসেন্টার ছিল ভেনেজুয়েলার উত্তরাঞ্চলীয় উপকূলীয় এলাকা। তীব্র কম্পনের ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে রাজধানী কারাকাস এবং এর কাছাকাছি থাকা উপকূলীয় শহর কাতিয়া লা মার। পাহাড়ের ঢালে গড়ে ওঠা এই শহরের বহু বহুতল ভবন চোখের পলকে ধসে পড়েছে।
সিএনএনের জিওলোকেশন করা বেশ কিছু ভিডিও চিত্রে দেখা গেছে, কাতিয়া লা মার শহরের একটি পাহাড়ের পুরো ঢাল ধসে নিচের বাড়িঘরগুলোকে পিষে দিয়ে গেছে। ধসে পড়া ভবনের রড ও সিমেন্টের চাঁই সরিয়ে জীবিতদের খোঁজে মরিয়া হয়ে হাত দিয়ে মাটি খুঁড়ছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
ভূমিকম্পের পরপরই কারাকাসের সড়কগুলোতে নেমে আসে মানুষের ঢল। আতঙ্কিত হাজার হাজার মানুষ তাদের সন্তান, প্রিয়জন ও পোষা প্রাণীদের বুকে জড়িয়ে ধরে বহুতল ভবন থেকে রাস্তায় নেমে আসেন। আফটার শকের ভয়ে কেউ আর ঘরে ফিরতে সাহস পাচ্ছেন না। পুরো শহরজুড়ে এখন শুধুই সাইরেনের শব্দ আর মানুষের আর্তনাদ।
আহত ৭০০, হাসপাতালগুলোতে উপচে পড়া ভিড়
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত অন্তত ৭০০ মানুষকে গুরুতর আহত অবস্থায় উদ্ধার করে বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। আহতদের অনেকেরই হাত-পা ভেঙে গেছে কিংবা মাথায় গুরুতর আঘাত লেগেছে। আকস্মিক এত বিপুলসংখ্যক রোগীর চাপে ভেঙে পড়েছে দেশটির চিকিৎসা ব্যবস্থা।
কারাকাসের প্রধান হাসপাতালগুলোর করিডোরে এখন আর তিল ধারণের জায়গা নেই। মেঝেতে শুইয়েই অনেককে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। রক্ত এবং জরুরি ওষুধের জন্য হাহাকার দেখা দিয়েছে। চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, আহতদের মধ্যে অন্তত ৫০ জনের অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক।
ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগুয়েজ পরিস্থিতি সামাল দিতে ইতোমধ্যে দেশজুড়ে জরুরি অবস্থা জারি করেছেন। তিনি সামরিক বাহিনীকে উদ্ধারকাজে পূর্ণ শক্তিতে নামার নির্দেশ দিয়েছেন। তবে বিদ্যুৎ বিপর্যয় এবং সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় উদ্ধারকাজ ব্যাহত হচ্ছে।
তেল শোধনাগার ও অর্থনৈতিক অবকাঠামো ঝুঁকির মুখে
ভেনেজুয়েলার উত্তরাঞ্চলীয় উপকূলীয় এলাকা, যা এই ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থল ছিল, সেটি দেশটির অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল জোন। এই অঞ্চলেই ভেনেজুয়েলার বেশ কয়েকটি বড় বড় তেল শোধনাগার এবং মজুত কেন্দ্র অবস্থিত। ফলে এই দুর্যোগের পর দেশটির প্রধান অর্থনৈতিক খাতে বড় ধরনের ধাক্কা লাগার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
প্রাথমিক রিপোর্টে তেল শোধনাগারগুলোর বড় কোনো কাঠামোগত ক্ষতির খবর না পাওয়া গেলেও, সুরক্ষার স্বার্থে বেশ কয়েকটি কেন্দ্রের কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, পাইপলাইনে কোনো ফাটল দেখা দিয়েছে কিনা তা পরীক্ষা করতে কয়েক দিন সময় লেগে যেতে পারে।
জ্বালানি উৎপাদন ব্যাহত হলে দেশের অভ্যন্তরীণ বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতি আরও নাজুক হয়ে পড়বে। এমনিতেই রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটে জর্জরিত ভেনেজুয়েলার জন্য এই প্রাকৃতিক দুর্যোগ এক মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
ভঙ্গুর নির্মাণশৈলী ও ইউএসজিএসের মারাত্মক হুঁশিয়ারি
ভেনেজুয়েলার এই ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির পেছনে দেশটির দুর্বল নির্মাণশৈলীকে দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা। ল্যাটিন আমেরিকার এই দেশটির অধিকাংশ ভবন ও সাধারণ ঘরবাড়ি ভূমিকম্প সহনশীল বা সিসমিক রেসিস্ট্যান্ট প্রযুক্তি অনুসরণ করে তৈরি করা হয়নি। ফলে ৭ মাত্রার কম্পন সহ্য করার ক্ষমতা এসব ভবনের ছিল না।
ইউএসজিএস তাদের সর্বশেষ মূল্যায়নে এক মারাত্মক হুঁশিয়ারি দিয়ে জানিয়েছে, এই দুর্যোগ এখানেই শেষ নয়। সামনে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরও ব্যাপক আকার ধারণ করতে পারে। মাটির নিচে প্লেটগুলোর স্থানান্তরের কারণে আগামী কয়েক দিন মাঝারি থেকে তীব্র মাত্রার আফটার শক বা অনুকম্পন জারি থাকতে পারে।
ভেনেজুয়েলার যোগাযোগ ও তথ্য মন্ত্রণালয় এক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে আরও বহুসংখ্যক বহুতল ভবন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যেকোনো সময় এগুলো ধসে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। এই কারণে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো থেকে সাধারণ মানুষকে সরিয়ে নিতে নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে।
বিদ্যুৎহীন অন্ধকার ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন শহর
ভূমিকম্পের পরপরই কারাকাসসহ দেশের অধিকাংশ বড় শহরের বিদ্যুৎ গ্রিড ভেঙে পড়েছে। ফলে বিস্তীর্ণ এলাকা এখন সম্পূর্ণ অন্ধকারচ্ছন্ন। মোবাইল নেটওয়ার্ক ও ইন্টারনেট সেবাও প্রায় বিপর্যস্ত। যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় প্রত্যন্ত গ্রামগুলোর প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির চিত্র এখনো উদ্ধারকারীদের কাছে পৌঁছায়নি।
নিরাপত্তার স্বার্থে কারাকাসের সিমোন বলিভার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। রানওয়েতে কোনো ফাটল তৈরি হয়েছে কিনা তা পরীক্ষা করা হচ্ছে। বিমানবন্দর বন্ধ থাকায় আন্তর্জাতিক সাহায্য বা উদ্ধারকারী দল আসার প্রক্রিয়াও কিছুটা শ্লথ হয়ে পড়েছে।
রাস্তার ট্রাফিক সিগন্যাল ও আলো না থাকায় রাতের কারাকাসে এক ভুতুড়ে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। লুণ্ঠন ও আইনশৃঙ্খলার অবনতি রোধে রাস্তায় রাস্তায় সামরিক সাঁজোয়া যান ও পুলিশ টহল দিচ্ছে। ঘরের বাইরে খোলা মাঠে, পার্ক বা গাড়ির ভেতরে রাত কাটাচ্ছেন লাখ লাখ মানুষ।
আন্তর্জাতিক মহলের উদ্বেগ ও সহায়তার আশ্বাস
ভেনেজুয়েলার এই মানবিক বিপর্যয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা। প্রতিবেশী দেশগুলো এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন ভেনেজুয়েলাকে জরুরি মানবিক সহায়তা, ওষুধ এবং বিশেষজ্ঞ উদ্ধারকারী দল পাঠানোর প্রস্তাব দিয়েছে।
তবে দেশটির বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে আন্তর্জাতিক সাহায্য কতটা দ্রুত মাঠপর্যায়ে পৌঁছাবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট রদ্রিগুয়েজ বিশ্ব সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, এই মুহূর্তে রাজনীতি ভুলে ভেনেজুয়েলার সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়ানো উচিত।
আজকের সকালটা কারাকাসের জন্য কোনো নতুন আলো নিয়ে আসেনি, এনেছে ধ্বংসস্তূপের মাঝে বেঁচে থাকার এক কঠিন লড়াই। স্বজন হারানো মানুষের কান্না আর ক্ষণে ক্ষণে কেঁপে ওঠা মাটির ভয়—সব মিলিয়ে এক চরম অনিশ্চয়তার আবর্তে দুলছে ভেনেজুয়েলা। আগামী কয়েকটা দিন দেশটির জন্য কেবল ধ্বংসস্তূপ সরানোর নয়, বরং এক মানবিক ট্র্যাজেডি সামাল দেওয়ার পরীক্ষা।

