মহান বিজয় দিবসের এই ঐতিহাসিক ক্ষণে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব অটুট রাখতে আওয়ামী ফ্যাসিবাদ এবং দিল্লির আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে দেশবাসীকে ঐক্যবদ্ধ লড়াইয়ের ডাক দিয়েছে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ। মঙ্গলবার (১৬ ডিসেম্বর) গণমাধ্যমে পাঠানো এক যৌথ বিবৃতিতে সংগঠনটির আমির আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী ও মহাসচিব মাওলানা সাজেদুর রহমান এই আহ্বান জানান। বিজয়ের ৫৪ বছর পূর্তিতে দেশবাসীকে শুভেচ্ছা জানিয়ে তারা দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় নতুন করে শপথ নেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
বিবৃতিতে হেফাজত নেতৃবৃন্দ ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে আত্মদানকারী শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। একইসঙ্গে তারা ব্রিটিশবিরোধী আজাদী আন্দোলন থেকে শুরু করে ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবে শহীদ হওয়া ছাত্র-জনতার অবদানকে পরম শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করেন। তারা বলেন, “আজকের এই দিনে আমরা স্মরণ করছি একাত্তরের জনযুদ্ধের মহান শহীদদের এবং আমাদের সেই পূর্বপুরুষদের, যারা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করে জীবন দিয়েছেন। বিশেষ করে চব্বিশের গণবিপ্লবে দিল্লির তাঁবেদার আওয়ামী ফ্যাসিস্টদের নৃশংসতার শিকার দেড় সহস্রাধিক শহীদের রক্ত আজ আমাদের স্বাধীনতার নতুন প্রেরণা। আল্লাহ তায়ালা সকল শহীদের কোরবানি কবুল করুন এবং আমাদের সার্বভৌমত্ব রক্ষার তাওফিক দান করুন।”
বিবৃতিতে প্রতিবেশী দেশ ভারতের ভূমিকার তীব্র সমালোচনা করে হেফাজত নেতারা দাবি করেন, ভৌগোলিক স্বাধীনতা অর্জন করলেও বাংলাদেশের ওপর দিল্লির আধিপত্যবাদী ছায়া এখনো বিদ্যমান। তারা অভিযোগ করেন, দিল্লির আধিপত্যবাদ প্রতিনিয়ত বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থকে ক্ষত-বিক্ষত করছে। সীমান্তে নিরপরাধ বাংলাদেশি নাগরিকদের নির্বিচারে গুলি করে হত্যা এবং অভিন্ন নদ-নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা থেকে বঞ্চিত করার মাধ্যমে বাংলাদেশের কৃষি ও জনজীবন বিপন্ন করে তোলা হচ্ছে।
হেফাজত নেতৃবৃন্দ আরও বলেন, “বিগত ১৭ বছর ধরে দিল্লির প্রত্যক্ষ সমর্থনে আওয়ামী ফ্যাসিবাদ অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করে বাংলাদেশের মানুষের রাজনৈতিক ও নাগরিক স্বাধীনতা হরণ করেছিল। সেই সময় দেশের সার্বভৌমত্ববিরোধী অসংখ্য অসম চুক্তি সম্পাদিত হয়েছে। পিলখানা হত্যাকাণ্ড ও শাপলা চত্বরের গণহত্যার পেছনেও তাদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। এমনকি সর্বশেষ শরিফ ওসমান হাদিকে গুলি করার মধ্য দিয়ে জুলাই বিপ্লবের চেতনাকে স্তব্ধ করার যে ষড়যন্ত্র আমরা দেখেছি, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, আমাদের একাত্তরের মহান বিজয়কেও দিল্লি আজ নিজেদের বিজয় বলে দাবি করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে।”
বিবৃতিতে দেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলা হয়, একটি চিহ্নিত চক্র দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে নস্যাৎ করতে এবং দেশকে অস্থিতিশীল করতে নানামুখী ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে। এই ষড়যন্ত্রকারীদের প্রতিহত করতে জনগণকে সজাগ থাকার আহ্বান জানান তারা। নেতৃবৃন্দ মনে করেন, ১৯৪৭ সালের দেশভাগ, ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধ এবং ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান— এই তিনটি ঘটনাই বাংলাদেশের জনগণের মুক্তি বা ‘আজাদীর সিলসিলা’।
হেফাজত নেতারা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, স্বাধীনতার লড়াই এখনো শেষ হয়নি। জুলাই বিপ্লবের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা এখনো বাকি। এই বিপ্লবের সুফল ঘরে তুলতে এবং বাংলাদেশকে একটি নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে হলে সকল ‘জুলাইযোদ্ধা’ ও দেশপ্রেমিক জনতাকে সর্বদা ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। বিজয় দিবস কেবল একটি আনুষ্ঠানিক উৎসব নয়, বরং এটি আত্মশুদ্ধি এবং অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক শত্রু দমনের শপথ নেওয়ার দিন হিসেবে পালনের আহ্বান জানায় সংগঠনটি।

