অস্ট্রেলিয়ার সিডনি শহরের বন্ডি সৈকতে প্রাণঘাতী সন্ত্রাসী হামলার সময় এক অস্ত্রধারীর কাছ থেকে রাইফেল ছিনিয়ে নিয়ে বহু মানুষের জীবন বাঁচানোর পর আহমেদ আল আহমেদ নামের এক মুসলিম যুবক আন্তর্জাতিক মহলে প্রশংসায় ভাসছেন। এই বীরোচিত ও দুঃসাহসী পদক্ষেপের জন্য তাঁকে দেশটির নাগরিকরা ‘প্রকৃত নায়ক’ হিসেবে অভিহিত করছেন।
রবিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি নাটকীয় ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, হামলা চলাকালীন আহমেদ আল আহমেদ জীবন বাজি রেখে অস্ত্রধারী ব্যক্তির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন। একটি গাড়ির আড়াল থেকে তিনি আকস্মিকভাবে বন্দুকধারীটির দিকে দ্রুত ছুটে যান এবং তার হাত থেকে রাইফেলটি কেড়ে নেন। অস্ত্র ছিনিয়ে নেওয়ার পর তিনি সঙ্গে সঙ্গেই সেই বন্দুক হামলাকারীর দিকে তাক করেন। তাঁর এই দ্রুত ও ঝুঁকিপূর্ণ পদক্ষেপে বন্ডি সৈকতে উপস্থিত অসংখ্য মানুষের প্রাণ রক্ষা পায়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়া ফুটেজ অনুসারে, ৪৩ বছর বয়সী এই ফলের দোকানি, আহমেদ আল আহমেদকে সাদা শার্ট ও প্যান্ট পরিহিত অবস্থায় দেখা যায়। দ্রুত পার্কিং এলাকার মধ্য দিয়ে কালো শার্ট পরা এক সশস্ত্র ব্যক্তির দিকে তিনি দৌঁড়ে যান। ওই ব্যক্তির হাতে একটি রাইফেল ছিল। ভিডিওতে দৃশ্যমান হয় যে আহমেদ পেছন দিক থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ে সশস্ত্র ওই ব্যক্তির হাত থেকে রাইফেলটি কেড়ে নেন এবং অস্ত্রটি তাঁর দিকেই তাক করেন।
এরপর কালো শার্ট পরা ব্যক্তিটি পিছিয়ে একটি সেতুর দিকে সরে যেতে থাকে, যেখানে দ্বিতীয় একজন সন্দেহভাজন হামলাকারী অবস্থান করছিলেন বলে ধারণা করা হয়। এরপর আহমেদ আল আহমেদ সতর্কতা হিসেবে অস্ত্রটি মাটিতে রেখে দেন।
নিউ সাউথ ওয়েলস অঙ্গরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী ক্রিস মিনস এই পথচারীকে ‘প্রকৃত নায়ক’ (A True Hero) হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, এই ভিডিওটি তাঁর দেখা সবচেয়ে অবিশ্বাস্য দৃশ্যগুলোর মধ্যে অন্যতম। মিনস দৃঢ়ভাবে উল্লেখ করেন, আহমেদের এই অসাধারণ সাহসিকতার কারণেই আজ রাতে অসংখ্য মানুষ বেঁচে আছেন।
অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজও বিপদের মুখে সহায়তার জন্য এগিয়ে আসা সকল অস্ট্রেলীয় নাগরিকের প্রশংসা করেন। এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, “এই অস্ট্রেলীয়রা নায়ক, আর তাদের সাহসিকতা নিশ্চিতভাবেই বহু জীবন বাঁচিয়েছে।”
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, বিশেষত ‘এক্স’-এ (সাবেক টুইটার) মানুষজন আহমেদ আল আহমেদের সাহসিকতার প্রতি কৃতজ্ঞতা ও প্রশংসা প্রকাশ করে বিভিন্ন মন্তব্য করছেন। একজন ব্যবহারকারী লিখেছেন, “বেশির ভাগ মানুষ বিপদ থেকে পালিয়ে যান। কিন্তু বন্ডি সৈকতে হত্যাকাণ্ডের সময় উপস্থিত এই মানুষটি তা করেননি। তিনি আমাদের নায়ক।”
হনুকা ইহুদি ধর্মীয় উৎসব উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানের সময় এই সমুদ্রসৈকতে গোলাগুলির ঘটনাটি ঘটে। এই হামলায় অন্তত ১১ জন নিহত এবং এক ডজনেরও বেশি মানুষ আহত হয়েছেন। পুলিশ জানিয়েছে, হামলায় একজন সন্দেহভাজন হামলাকারী নিহত এবং আরেকজন গুরুতর আহত হয়েছেন। পুলিশ বর্তমানে এই ঘটনায় তৃতীয় কোনো হামলাকারী জড়িত ছিলেন কি না, তা গভীরভাবে তদন্ত করে দেখছে।
ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স তাৎক্ষণিকভাবে হামলাকারীকে নিরস্ত্র করা ওই পথচারীর পরিচয় নিশ্চিত করতে পারেনি। তবে অস্ট্রেলিয়ার স্থানীয় সংবাদমাধ্যম ‘সেভেন নিউজ’ পরে আহমেদ আল আহমেদের পরিচয় নিশ্চিত করে। তাঁকে লক্ষ্য করে অপর এক হামলাকারী গুলি ছুড়েছিল বলেও জানা গেছে। পরে তাঁকে উদ্ধার করে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হয়।
আহমেদ আল আহমেদের এই বীরত্ব কেবল তাঁর ব্যক্তিগত সাহসিকতার প্রমাণ দেয় না, বরং চরম বিপদের সময়েও মানবিক মূল্যবোধ ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে।

