রাজধানীর একটি শান্ত গলির মুখে সন্ধ্যার আলো আঁধারিতে কয়েকটি কিশোর যখন ধারালো অস্ত্র হাতে দাঁড়িয়ে থাকে, তখন আপাতদৃষ্টিতে দৃশ্যটিকে কোনো সিনেমার আবহ মনে হতে পারে। তবে এই পথ ধরে হেঁটে যাওয়া সাধারণ মানুষের কাছে এটি চরম আতঙ্কের এক বাস্তব প্রতিচ্ছবি। সাম্প্রতিক সময়ে অপ্রতিম নামের এক উদীয়মান কিশোরের নির্মম হত্যাকাণ্ড দেশজুড়ে নতুন করে এক গভীর ঝাঁকুনি দিয়েছে। এই একটি মৃত্যুই আবার আমাদের নির্মম আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে, যেখানে কিশোর অপরাধ ও গ্যাং কালচারের এক ভয়াল মুখচ্ছবি ফুটে ওঠে।
কিশোর গ্যাং, ছিনতাই, মাদক ব্যবসা, ফুটপাতে মারামারি থেকে শুরু করে অনলাইন অপরাধ পর্যন্ত সর্বত্র আজ জড়িয়ে পড়ছে অনুর্ধব-আঠারো বয়সের তরুণরা। খবরের কাগজের পাতায় এসব খবর প্রতিদিনের সাধারণ ঘটনায় পরিণত হলেও, সমাজ কি সত্যিই এর গভীরতা উপলব্ধি করতে পারছে? অপরাধবিজ্ঞানী ও সমাজ বিশ্লেষকদের মতে, সমস্যাটির শিকড় কেবল কোনো নির্দিষ্ট অপরাধে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি পুরো সামাজিক ও পারিবারিক কাঠামোর এক গভীর ধসের ইঙ্গিত দেয়।
কোনো কিশোরই একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে হঠাৎ করে অপরাধী হয়ে ওঠে না। এই রূপান্তরের পেছনে থাকে এক দীর্ঘ ও নীরব মনস্তাত্ত্বিক প্রক্রিয়া। পারিবারিক অমনোযোগ, ভুল মানুষের সঙ্গে মেলামেশা, অনিয়ন্ত্রিত প্রযুক্তিগত স্বাধীনতা এবং বাবা-মায়ের সঙ্গে মানসিক দূরত্ব—এই সবকিছুর প্রভাবেই ধীরে ধীরে একটি সংবেদনশীল শিশু তার মানবিক অনুভূতির নমনীয়তা হারাতে থাকে। অন্যায়কে সে আর অন্যায় মনে করে না, বরং সহিংসতাকে সাহসিকতা হিসেবে উদ্যাপন করতে শুরু করে।
আইনশৃঙ্খলার নিরিখে দেখলে, কোনো কিশোর অপরাধীকে গ্রেপ্তার করা বা শাস্তির মুখোমুখি দাঁড় করানো হয়তো পুলিশের তাৎক্ষণিক দায়িত্ব। কিন্তু সমাজচিন্তকদের মতে, কেবল পুলিশি অভিযান বা কারাগারের চার দেয়ালে এই সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। অপরাধী তৈরির কারখানা বন্ধ করতে হলে নজর দিতে হবে সেই মূল কেন্দ্রে, যেখানে শিশুটির বেড়ে ওঠা শুরু হয়। সন্তানকে অপরাধের পথ থেকে ফেরানোর সবচেয়ে প্রথম ও প্রধান দুর্গ হলো তার নিজ পরিবার।
সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিশিষ্ট ধর্মীয় ও সমাজচিন্তক শায়খ আহমাদুল্লাহ এই জটিল বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত আলোকপাত করেছেন। তাঁর মতে, আমরা এমন এক যুগে বাস করছি, যেখানে সামাজিক অবক্ষয় চারপাশ থেকে আমাদের সন্তানদের গ্রাস করছে। সন্তানকে সঠিক পথে রাখার সংগ্রাম আজ তাই যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি কঠিন ও চ্যালেঞ্জিং। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য, অভিভাবক হিসেবে আমরা সেই সংগ্রাম থেকে ক্রমেই দূরে সরে যাচ্ছি।
আধুনিক নাগরিক জীবনের চরম ব্যস্ততা আমাদের সন্তানদের কাছ থেকে দূরে ঠেলে দিচ্ছে। আমরা আমাদের কাজ, ব্যবসা, চাকরি এবং ব্যক্তিগত ক্যারিয়ার গড়ার পেছনে দিনের সিংহভাগ সময় ও শক্তি বিনিয়োগ করি। অর্থমূল্যের বিচারে আমরা সফল হতে চাই, কিন্তু নিজেদের সবচেয়ে বড় আমানত—সন্তানের জন্য ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আধঘণ্টা সময়ও ব্যয় করতে পারি না। সন্তানকে পর্যাপ্ত সময় না দেওয়া এবং তাদের আবেগ বোঝার চেষ্টা না করা আজকের যৌথ ও একক পরিবারগুলোর অন্যতম বড় ব্যর্থতা।
অনেক বিত্তবান কিংবা ব্যস্ত বাবা-মা মনে করেন, নামিদামি ইংরেজি মাধ্যম বিদ্যালয় কিংবা স্বনামধন্য কোনো মাদ্রাসায় মোটা অঙ্কের ফি দিয়ে ভর্তি করিয়ে দিলেই অভিভাবকত্বের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায়। শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণের এই যুগে অনেকেই বিশ্বাস করতে শুরু করেছেন যে টাকা দিয়ে মূল্যবোধ কেনা সম্ভব। তবে বাস্তবতা সবসময়ই এই ধারণার বিপরীত চিত্র তুলে ধরে। প্রথাগত প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা কখনোই পরিবারের প্রত্যক্ষ ভালোবাসা, মনোযোগ ও তদারকির বিকল্প হতে পারে না।
ইসলামি চিন্তাধারার কথা উল্লেখ করে শায়খ আহমাদুল্লাহ মনে করিয়ে দেন যে, রাসুলুল্লাহ (সা.) নির্দেশ করেছেন—প্রত্যেক সন্তানই শুভ ও স্বাভাবিক স্বভাব নিয়ে জন্মায়। কিন্তু পরবর্তীকালে তার অভিভাবকের মূল্যবোধ, শিক্ষা ও লালন-পালনের ধরণই নির্ধারণ করে সে কোন পথে পরিচালিত হবে। তাই সন্তানকে সুনাগরিক এবং নীতিবান মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার যে মূল ফ্রেমওয়ার্ক, তার রূপকার কোনো শিক্ষক বা প্রতিষ্ঠান নয়, বরং মা-বাবাই।
কৈশোর হলো জীবনের সবচেয়ে স্পর্শকাতর ও আবেগপ্রবণ সময়। এই বয়সটিতে ঘরের ভেতর বাবা-মায়ের কড়া শাসন বা উপদেশ যতটা না প্রভাব ফেলে, তার চেয়ে বহুগুণ বেশি প্রভাব ফেলে ঘরের বাইরের বন্ধু ও সমবয়সীদের মতামত। কিশোররা সাধারণত তাদের বন্ধুদের কাছে নিজেদের গ্রহণযোগ্য প্রমাণ করতে গিয়ে অনেক চরম পদক্ষেপ নিতে দ্বিধা করে না। এই মনস্তাত্ত্বিক দুর্বলতাকে পুঁজি করেই গড়ে ওঠে বিভিন্ন এলাকার কিশোর গ্যাং।
নবী কারিম (সা.) এক হাদিসে সতর্ক করে বলেছেন, মানুষ তার ঘনিষ্ঠ বন্ধুর আদর্শের ওপরই বড় হয়ে ওঠে, তাই কার সঙ্গে মেলামেশা করা হচ্ছে সে বিষয়ে দৃষ্টি রাখা জরুরি। আপনার সন্তান কার সঙ্গে বিকেল কাটাচ্ছে, সোশ্যাল মিডিয়ায় তার যোগাযোগের সার্কেল কেমন এবং সে কোথায় সময় ব্যয় করছে—এসব বিষয়ে সার্বক্ষণিক কিন্তু সম্মানজনক নজরদারি থাকা প্রয়োজন। নজরদারি মানে তাকে বন্দি করা নয়, বরং তাকে নিরাপদে রাখা।
ইদানীং প্রযুক্তির অবাধ ব্যবহারের কারণে সন্তানের অনিয়ন্ত্রিত স্বাধীনতা এক নতুন বিপদ ডেকে এনেছে। স্মার্টফোনের স্ক্রিনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় কাটানো একটি কিশোর বাস্তব জগতের সামাজিক যোগাযোগ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। এর ফলে অনলাইনের গ্যাং কালচার, সহিংস গেম ও অপরাধমূলক কনটেন্ট খুব সহজেই তার কচি মাথায় স্থান করে নিচ্ছে। অভিভাবকরা প্রায়ই সন্তানকে শান্ত রাখতে তাদের হাতে ডিভাইস তুলে দিয়ে নিজেদের দায় শেষ করেন, যা পরবর্তীতে মারাত্মক পরিণতি ডেকে আনে।
অপরাধ দমনে রাষ্ট্রীয় আইনি কাঠামোর নিজস্ব একটি ভূমিকা রয়েছে, যা অনস্বীকার্য। কিন্তু একটি শিশু যাতে কখনোই সেই আইনি অপরাধের চৌকাঠে পা না দেয়, তা নিশ্চিত করা পুরোপুরি একটি সামাজিক দায়িত্ব। যে সমাজে পরিবারের সদস্যরা একসঙ্গে রাতের খাবার খায় না, যে ঘরে সন্তানের মন খারাপের কথা শোনার মতো কেউ থাকে না, সেই ঘরেই কিন্তু জন্ম নেয় অপরাধের অন্ধকার ভবিষ্যৎ।
শায়খ আহমাদুল্লাহর মতে, একজন সন্তানকে সুনাগরিক ও সৎ মানুষ হিসেবে পেছনে রেখে যাওয়া হলো একজন মা-বাবার জীবনের সবচেয়ে সফল ও স্থায়ী বিনিয়োগ। পৃথিবীর সমস্ত সম্পদ, বাড়িঘর ও ক্যারিয়ার কিন্তু মানুষের মৃত্যুর সঙ্গেই শেষ হয়ে যায়। অথচ একটি ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠা সন্তানের ভালো কাজ ও দোয়া মা-বাবার মৃত্যুর পরেও তাদের জন্য শান্তির কারণ হয়ে থাকে।
সন্তান লালন-পালনকে তাই কেবল একটি দৈনন্দিন গৃহস্থালি দায়িত্ব হিসেবে দেখলে ভুল হবে; এটি একটি নৈতিক মিশন এবং নাগরিক দায়বদ্ধতা। আপনার সন্তান কেবল আপনার পরিবারের অংশ নয়, সে আগামী দিনের সমাজ ও রাষ্ট্রের নির্দেশক। সে যদি কোনো গ্যাংয়ের সদস্য হয়ে কারও বুকে ছুরি বসায়, তবে সেই রক্তের দাগ পরোক্ষভাবে অভিভাবকের উদাসীনতার ওপরও এসে পড়ে।
বর্তমানে দেশে কিশোর অপরাধ যেভাবে ছড়িয়ে পড়ছে, তা বন্ধ করতে হলে অবিলম্বে একটি সামাজিক জাগরণ প্রয়োজন। স্কুল, মাদ্রাসা, খেলার মাঠ, সামাজিক ক্লাব ও পরিবার—সব স্তরেই কিশোরদের সুস্থ বিকাশ নিশ্চিত করতে হবে। তাদের বিনোদনের জন্য পর্যাপ্ত খেলার মাঠের ব্যবস্থা করা এবং সাংস্কৃতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত রাখা আজ সময়ের দাবি।
একজন কিশোর যখন বুঝতে পারে যে ঘরে তাকে ভালোবাসার মতো মানুষ আছে, তার কথা শোনার মতো মা-বাবা আছেন, তখন সে অন্যায়ের দিকে পা বাড়াতে দ্বিধা করে। পারিবারিক বন্ধন যত মজবুত হবে, রাজপথের গ্যাং কালচার ততটাই দুর্বল হয়ে পড়বে। অপ্রতিম হত্যার মতো নৃশংস ঘটনা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল, আর চুপ করে বসে থাকার বা অন্যকে দোষ দেওয়ার সময় নেই।
আমাদের সন্তানদের সময় দিন, তাদের কথা শুনুন এবং তাদের বন্ধু হোন। কারণ একটি বিনষ্ট হয়ে যাওয়া জীবনকে পুলিশি শাস্তির মাধ্যমে ফেরানো কঠিন, কিন্তু ভালোবাসার মাধ্যমে তাকে শুরুতে আগলে রাখা অনেক সহজ। সন্তানকে সৎ, সহানুভূতিশীল ও আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার এই যুদ্ধে যদি আমরা হেরে যাই, তবে আমাদের সমস্ত অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিই মূল্যহীন হয়ে পড়বে।

