দক্ষিণের উপকূলীয় জেলা বরগুনার নিস্তব্ধ দুপুরটি হঠাৎ করেই রাজনৈতিক উত্তাপে ভরে ওঠে। শহরের প্রাণকেন্দ্রে আয়োজিত এক কর্মশালা শেষে দেশের বর্তমান পরিস্থিতি ও সাবেক শাসকের বিষয়ে তীক্ষ্ণ বক্তব্য দেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম।
জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশের রাজপথ এবং রাষ্ট্র পরিচালনার রূপরেখা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিষয়ে আপসহীন বার্তা দেন। তার মতে, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে প্রায় এক হাজার চারশত মানুষের প্রাণহানির দায় এড়িয়ে দেশে ফেরার আর কোনো সুযোগ নেই।
মঙ্গলবার দুপুরে বরগুনা পৌরশহরের প্রেসক্লাব সংলগ্ন হোটেল বে-অব বেঙ্গলে এনসিপির জেলা শাখা আয়োজিত সাংগঠনিক সমন্বয় সভা ও রাজনৈতিক কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তিনি দেশের সাম্প্রতিক নানা বিষয় নিয়ে বিস্তারিত কথা বলেন।
সারজিস আলম বলেন, অতীতে ঘটে যাওয়া রক্তক্ষয়ী ঘটনার পর যে পরিবর্তন এসেছে, তার পেছনে হাজারো মানুষের ত্যাগ জড়িত। প্রাণভয়ে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া শেখ হাসিনার বিচার না হওয়া পর্যন্ত দেশে তার ফেরা সম্ভব নয়। তার মৃত্যু এবং দাফন কোনোটিই এই দেশে হবে না বলে তিনি মন্তব্য করেন।
ছয় মাসের হিসাব ও প্রশাসনিক দায়িত্বের তাগিদ
সংবাদ সম্মেলনে দেশের বর্তমান ক্ষমতার দায়িত্বে থাকা বিএনপি সরকারের কর্মকাণ্ডের ওপরও কঠোর দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করেন এনসিপির এই জ্যেষ্ঠ নেতা। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর দেখতে দেখতে ছয়টি মাস পার হয়ে গেছে বলে স্মরণ করিয়ে দেন তিনি।
তিনি উল্লেখ করেন, একটি সরকারের পাঁচ বছরের মেয়াদের মধ্যে ছয় মাস সময় পার হয়ে যাওয়ার পর আর শিশু সরকারের অজুহাত দেওয়ার কোনো সুযোগ থাকে না। এখন থেকে বাহানা না বানিয়ে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও প্রশাসনিক সংকটগুলো সাহসের সঙ্গে মোকাবিলা করতে হবে।
দেশ পরিচালনায় বর্তমান সংকট কাটাতে এনসিপির সহযোগিতার মনোভাব সবসময় ছিল এবং এখনো রয়েছে। কিন্তু তার জন্য সরকারকে অবশ্যই নিজের ভুল এবং দেশের ভেতরের প্রকৃত সমস্যাগুলোকে অকপটে স্বীকার করে নেওয়ার মানসিকতা দেখাতে হবে বলে তিনি মনে করেন।
প্রশাসনের দলীয়করণ এবং বিভিন্ন স্থানে চাঁদাবাজির মতো ব্যাধিগুলোর কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, এসব সমস্যাকে যদি সরকার অস্বীকার করে, তবে উত্তরণের কোনো পথ খোলা থাকবে না। সমস্যা লুকিয়ে রেখে কোনো জাতি সামনে এগোতে পারে না।
অপরাধীদের আশ্রয় ও নির্বাচনী সমঝোতার হুঁশিয়ারি
বিগত স্বৈরাচারী আমলে যারা অপরাধের সঙ্গে যুক্ত ছিল না, তাদের রাজনীতি করার অধিকার নিয়ে কথা বলেন সারজিস আলম। শুধু প্রতীকে ভোট দেওয়া বা মতাদর্শের শুভাকাঙ্ক্ষীরা অপরাধে জড়িত না থাকলে তারা যে কোনো রাজনৈতিক দলে যোগ দিতে পারেন।
সাধারণ সমর্থকরা বিএনপি, জামায়াত কিংবা এনসিপিতে যোগ দিলে তাতে কোনো আইনি বাধা থাকা উচিত নয়। কিন্তু যারা প্রত্যক্ষভাবে অন্যায়ের সঙ্গে যুক্ত ছিল এবং অপরাধ করেছে, তাদের অবশ্যই বিচারে সোপর্দ করতে হবে বলে জোর দেন তিনি।
রাজনৈতিক সুবিধার জন্য বা নির্বাচনে জেতার তাগিদে অপরাধীদের আশ্রয় না দিতে বিএনপি নেতৃত্বের প্রতি আহ্বান জানান এনসিপি নেতা। এখন সাময়িক লাভের জন্য অভ্যন্তরীণ সমঝোতা করলে ভবিষ্যতে তারাই নিজেদের জন্য বড় বিপদ ডেকে আনবে বলে তিনি হুঁশিয়ার করেন।
তিনি স্পষ্ট করে বলেন, কোনো অবস্থাতেই অপরাধী চক্রকে ফের শক্তিশালী হতে দেওয়া হবে না। যারা গণমানুষের ওপর অতীতে জুলুম চালিয়েছে, তাদের আইনের আওতায় আনাই হবে নতুন বাংলাদেশের মূল ভিত্তি।
প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা ও সংকট কাটাতে বাস্তবভিত্তিক পদক্ষেপ
দেশের শীর্ষ পদের নিরাপত্তা এবং রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা বজায় রাখার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন সারজিস আলম। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা বলয় ভেদ করে এক ব্যক্তির প্রবেশের ঘটনার কথা উল্লেখ করে তিনি নিরাপত্তার ঘাটতি পূরণের তাগিদ দেন।
তিনি বলেন, দেশ পরিচালনায় কেবল সুন্দর উপস্থাপনা বা কথার ফুলঝুরি দেখালেই চলবে না, বাস্তবক্ষেত্রে তার প্রতিফলন ঘটাতে হবে। প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা ব্যবস্থা অক্ষুণ্ন রাখা কেবল কোনো ব্যক্তির সুরক্ষার জন্য নয়, বরং গোটা দেশের সার্বিক স্থায়িত্বের স্বার্থেই জরুরি।
চলমান তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎ সংকট এবং দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস ওঠার বিষয়টিও তার বক্তব্যে গুরুত্ব পায়। এসব সমস্যার সমাধানে পরামর্শ দিতে এনসিপির সংসদ সদস্যরা লিখিতভাবে সরকারের কাছে প্রস্তাব জমা দিয়েছিলেন।
জাতীয় সংসদেও এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে বলে তিনি জানান। তবে সরকার কেবল লোক দেখানোর জন্য পরামর্শ চায়, কিন্তু সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় সেই পরামর্শগুলোকে গুরুত্ব দেয় না বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন এই তরুণ রাজনৈতিক সংগঠক।
জ্বালানি সংকট ও নীতিনির্ধারণের গলদ
সারজিস আলম অভিযোগ করেন, সংকটের মুহূর্তে সবাইকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করার তাগিদ দেওয়া হলেও আসল সিদ্ধান্তগুলো নেওয়া হচ্ছে দু-চারজন আস্থাভাজন মানুষের বন্দি ঘরে। নীতিনির্ধারণের এই প্রক্রিয়া দেশকে আরও বেশি অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
তিনি জানান, জনদুর্ভোগ কমাতে যদি সরকারের প্রকৃত সদিচ্ছা থাকে, তবে এনসিপি সব ধরনের সহায়তা দিতে প্রস্তুত। তবে কাজ না করে শুধু ক্ষমতার ভাগাভাগি কিংবা নেওয়ার মানসিকতা থাকলে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে রাজপথে নামার ইঙ্গিত দেন তিনি।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। কেবল মুখের কথায় এই সংকট মেটানো সম্ভব নয়, বরং সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নিয়ে কাজ শুরু না করলে পরিস্থিতি আরও অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়বে বলে তিনি সতর্ক করেন।
সরকার যদি বিরোধী দলকে সঙ্গী করে প্রকৃত পরিবর্তনের পথে না হাঁটে, তবে রাজপথেই পরবর্তী সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হবে বলে তিনি সাফ জানিয়ে দেন।
সংস্কৃতিকর্মী আজমেরী হক বাঁধন হেনস্তা ও বিদেশের মাটি
সাংস্কৃতিক অঙ্গনের অসাম্প্রদায়িক ও স্পষ্টভাষী ব্যক্তিত্ব আজমেরী হক বাঁধন হেনস্তার শিকার হওয়া নিয়ে তীব্র ক্ষোভ উগরে দেন সারজিস আলম। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে বাঁধনের সাহসী ভূমিকার কথা স্মরণ করে তিনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানান।
জুলাইয়ের রক্তক্ষয়ী দিনগুলোতে যিনি স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে কণ্ঠ তুলেছিলেন, বিদেশে গিয়ে তার এমন লাঞ্ছিত হওয়ার ঘটনায় সরকারের নিরবতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি। বিএনপি বা সরকারি পর্যায়ে কোনো স্পষ্ট প্রতিবাদ বা বিবৃতি না দেখে তিনি হতাশা ব্যক্ত করেন।
পতিত শাসনের দোসররা যখন একজন নারীকে এভাবে কটূক্তি বা হেনস্তা করার সাহস পায়, তখন পুরো জাতির ঐক্যবদ্ধ হওয়া উচিত ছিল। এই ইস্যুতে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে দ্রুত কার্যকরী উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানান এনসিপির এই নেতা।
বিদেশের মাটিতে এ ধরনের ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট দেশের প্রশাসনের সঙ্গে সরকারি পর্যায়ে যোগাযোগের জোর তাগিদ দেন তিনি।
অলিফের ওপর হামলা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি
গণঅভ্যুত্থানের সহযোদ্ধা অলিফের ওপর হওয়া নজিরবিহীন নীতিনৈতিকতাহীন আক্রমণের বর্ণনা দিতে গিয়ে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন সারজিস আলম। রড দিয়ে আঘাত করে অলিফের একটি চোখ উপড়ে ফেলার মতো নৃশংস ঘটনার পরও অপরাধীদের গ্রেপ্তার না হওয়াকে প্রশাসনের চরম ব্যর্থতা হিসেবে দেখছেন তিনি।
বিশ থেকে ত্রিশ জন হামলাকারীর মধ্যে যে প্রধান অভিযুক্ত রড দিয়ে আঘাত করেছে, তাকেও এতদিন ধরে কেন পুলিশ আটক করতে পারল না—সেই প্রশ্ন তোলেন তিনি। এই ধরনের ঘটনার বিচারে গতিহীনতা অপরাধীদের আরও দুঃসাহসী করে তুলছে।
রাজনৈতিক পরিচয় দেখে অপরাধীদের ছাড় দেওয়া বন্ধ করতে স্পষ্ট বার্তা দেন সারজিস আলম। বিএনপি যদি নিজ দলের কর্মী ভেবে অপরাধীদের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে, তবে বাংলাদেশ দ্রুত অপরাধের অভয়ারণ্যে পরিণত হবে।
আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা না হলে এবং অপরাধীদের রাজনৈতিক সুরক্ষা দিলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির স্থায়ী পুনরুদ্ধার কোনোদিন সম্ভব হবে না বলে মন্তব্য করেন তিনি।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এনসিপির স্বতন্ত্র লড়াই
জাতীয় রাজনীতির সংস্কারের পাশাপাশি তৃণমূলের রাজনীতিতে নিজেদের অবস্থান শক্ত করার পরিকল্পনা প্রকাশ করেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি। আগামী স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এনসিপি পুরোদমে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে জানানো হয়।
সারজিস আলম স্পষ্ট করেন যে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে তারা কোনো জোট বা অন্য কারো কাঁধে ভর দিয়ে লড়াই করবেন না। বরং প্রতিটি আসনে এককভাবে প্রার্থী দিয়ে জনমানুষের রায় প্রত্যাশা করবে নতুন এই রাজনৈতিক দলটি।
তৃণমূলের আপামর জনগণকে সঙ্গে নিয়ে একটি স্বচ্ছ ও দুর্নীতিমুক্ত নেতৃত্ব গড়ে তোলাই তাদের মূল লক্ষ্য। কোনো কায়েমি স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর সঙ্গে আপস না করে তারা সাধারণ মানুষের ভোটাধিকার রক্ষায় কাজ করে যাবেন।
সভা শেষে তিনি স্থানীয় নেতাকর্মীদের সুসংগঠিত হয়ে জনসেবায় নিজেদের আত্মনিয়োগ করার আহ্বান জানান। বরগুনার সাধারণ মানুষও যেন এই রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত হয়ে নিজেদের গণতান্ত্রিক অধিকার পুনরুদ্ধার করতে পারে, সে বিষয়ে দিকনির্দেশনা দেন তিনি।
রাজনীতি ও শাসনের অঙ্গনে বিচারহীনতার সংস্কৃতি দূর করা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা না গেলে যে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি সম্ভব নয়, তা সারজিস আলমের বক্তব্যে বারবার স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। আগামী দিনের স্থানীয় রাজনীতিতে এনসিপির এই অবস্থান কতখানি প্রভাব ফেলবে, তা এখন দেখার বিষয়।

