রাজনীতির ময়দানে কথার মারপ্যাঁচ নতুন কিছু নয়। তবে সংসদ ভবন আর রাজপথের ভাষা যখন সম্পূর্ণ উল্টো হয়, তখন তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে। সম্প্রতি এমন দ্বিমুখী আচরণের অভিযোগ তুলেছে সরকারি দল। পানিসম্পদ মন্ত্রী এবং বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি সরাসরি আঙুল তুলেছেন বিরোধী দলের ভূমিকার দিকে। তাঁর মতে, সংসদের ভেতরে বিরোধী দলের নেতারা অত্যন্ত মার্জিত ও সুন্দর ভাষায় কথা বলেন। কিন্তু রাজপথে নামলেই তাদের সেই পরিচিত রূপ বদলে যায়। ঠিক যেন একাত্তরের সেই পুরনো চেহারায় ফিরে যান তারা।
শনিবার বিকেলে লক্ষ্মীপুর জেলার প্রাণকেন্দ্রে আয়োজিত এক বিশাল বর্ণাঢ্য র্যালির প্রাক্কালে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এই কঠোর মন্তব্য করেন মন্ত্রী। বিএনপির সুদীর্ঘ ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপনের অংশ হিসেবে এই র্যালির আয়োজন করা হয়েছিল। জেলা বিএনপির ব্যানারে সদর উপজেলা ও চন্দ্রগঞ্জ থানা বিএনপি ছাড়াও দলটির বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের হাজার হাজার নেতাকর্মী এতে অংশ নেন। দুপুরের পর থেকেই খণ্ড খণ্ড মিছিল নিয়ে শহরের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে নেতাকর্মীরা জড়ো হতে থাকেন। চারদিকের সেই উৎসবমুখর পরিবেশের মাঝেই রাজনৈতিক উত্তাপ ছড়িয়ে দেন দায়িত্বশীল এই মন্ত্রী।
বক্তব্যের শুরুতেই সাম্প্রতিক সময়ে বিরোধী দলের লংমার্চ কর্মসূচি নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেন এ্যানি চৌধুরী। তিনি প্রশ্ন তোলেন, যারা হরহামেশা ‘গ্যাস নেই, বিদ্যুৎ নেই’ বলে স্লোগান তুলে লংমার্চ করছেন, তাদের এই কর্মসূচির নৈতিক ভিত্তি আসলে কোথায়? বর্তমান সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই বিরোধী দলগুলোর অবস্থান নিয়ে নানা প্রশ্ন রয়েছে। মন্ত্রী স্মরণ করিয়ে দেন, নতুন সরকারের শপথ গ্রহণের দিন থেকেই তারা বয়কট বা ভিন্ন পথের আশ্রয় নিয়েছিল। এরপর গত ছয় মাস ধরে এমন কোনো একটি দিনও যায়নি, যেদিন তারা রাজপথে কোনো না কোনো আন্দোলনের হুংকার বা কর্মসূচি পালন করেননি।
বিরোধী দলের শীর্ষনেতা এবং জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমানের সাম্প্রতিক বক্তব্য নিয়েও কড়া প্রতিক্রিয়া জানান এই বিএনপি নেতা। সম্প্রতি জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে বিরোধীদলীয় এই নেতা প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের নিয়ে কিছু অনভিপ্রেত মন্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন। পরিবারের সদস্যদের গালিগালাজ করার তীব্র নিন্দা জানিয়ে দোষীদের দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবিও তুলেছিলেন তিনি। সংসদের অন্দরে দাঁড়িয়ে দেওয়া সেই মার্জিত বক্তব্যকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে মন্ত্রী বলেন, সংসদীয় ফোরামে দাঁড়িয়ে তারা ঠিকই ভালো ভালো কথা বলেন এবং শিষ্টাচারের কথা মনে করিয়ে দেন।
তবে সংসদের বাইরে বা মাঠের রাজনীতিতে এসে বিরোধী দলের নেতারা ঠিক উল্টো আচরণ করেন বলে অভিযোগ করেন এ্যানি। বিশেষ করে ১১ দলীয় ঐক্যের লংমার্চ বা জনসভাগুলোতে যেভাবে কুৎসিত আক্রমণ চালানো হয়, তার কঠোর সমালোচনা করেন তিনি। তিনি নাম ধরে উল্লেখ করেন অপর এক নেতার সাম্প্রতিক বক্তব্যের কথা, যিনি দীর্ঘদিন ধরে জিয়া পরিবারকে টার্গেট করে অশালীন ও কুরুচিপূর্ণ ভাষায় বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছেন। প্রশ্ন তুলে মন্ত্রী বলেন, যারা নিজেদের খুব নীতিবান বলে দাবি করেন, সেই আমির সাহেব কি একবারের জন্যও ওই নেতাকে এমন অশালীন কথা বলতে বারণ করেছিলেন?
রাজনৈতিক শিষ্টাচার না জানার অভিযোগ তুলে মন্ত্রী বলেন, যারা ফ্যাসিবাদের দোসরদের মতো আচরণ করতে চান, তাদের মুখ থেকেই এমন ভাষা মানায়। সম্প্রতি সিফাত নামের এক যুবকের একটি আপত্তিকর ভিডিও বা বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া নিয়ে দেশজুড়ে আলোচনা চলছে। সেই তরুণকে ভালোয় ভালোয় ছেড়ে দেওয়ার জন্য লংমার্চের মঞ্চ থেকে আলটিমেটাম দেওয়া হয়েছিল। এ বিষয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে মন্ত্রী বলেন, সংসদের ভেতরে এক ভাষা আর রাজপথের মাইকে অন্য ভাষা ব্যবহার করা রাজনৈতিক দ্বিচারিতা ছাড়া আর কিছু নয়।
দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ এবং জ্বালানি সংকটের বিষয়টিও নিজের বক্তব্যে খোলামেলাভাবে তুলে ধরেন পানিসম্পদ মন্ত্রী। গত ছয় মাসের সরকারের কার্যকারিতা নিয়ে যারা প্রশ্ন তুলছেন, তাদের উদ্দেশ্যে তিনি বাস্তবতার কথা স্মরণ করিয়ে দেন। একটি ভঙ্গুর ও ধ্বংসস্তূপের মধ্য থেকে এই সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছে। পরিস্থিতির ভয়াবহতা বোঝাতে গিয়ে তিনি বলেন, বর্তমান প্রশাসন যেন তুষের আগুনের ওপর বসে রয়েছে। ম্যাজিক দেখিয়ে রাতারাতি সব ঠিক করে ফেলা সম্ভব নয়।
মন্ত্রী স্পষ্ট ভাষায় স্বীকার করেন যে, দেশের সাধারণ মানুষ বর্তমানে লোডশেডিং ও জ্বালানি সংকটের কারণে প্রচণ্ড কষ্ট পাচ্ছে। যদি মুহূর্তের মধ্যে এই সমস্যার সমাধান করা সম্ভব হতো, তবে সরকার নিজেই সবার ঘরে ঘরে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পৌঁছে দিত। কিন্তু দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত অব্যবস্থাপনার কারণে আজ গ্যাসের ঘাটতি রয়েছে এবং বিদেশ থেকে বাড়তি মূল্যে গ্যাস এনে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে হচ্ছে। এই কাঠামোগত দুর্বলতা একদিনে তৈরি হয়নি, তাই এর সুরাহাতেও কিছুটা সময় লাগবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
বিরোধীদের লংমার্চের সমালোচনা করে তিনি আরও বলেন, কেবল সরকারের সমালোচনা করলেই বাস্তব চিত্র বদলে যায় না। যদি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গত বছরের নির্দিষ্ট সময়ের আগে সুনির্দিষ্ট কিছু পদক্ষেপ নিত, তবে বর্তমান সরকারের জন্য কাজগুলো কিছুটা সহজ হতে পারত। কিন্তু সেই সুযোগ হাতছাড়া হওয়ার কারণে এখন বর্তমান প্রশাসনকে এক প্রকার শূন্য থেকেই কাজ শুরু করতে হয়েছে। তাই মাত্র ছয় মাসের মাপকাঠিতে পুরো সরকারের সফলতা বা ব্যর্থতা নির্ধারণ করা চরম অবিচার হবে।
লক্ষ্মীপুরের এই র্যালি ও সমাবেশে স্থানীয় বিএনপির শীর্ষস্থানীয় নেতারাও উপস্থিত ছিলেন। জেলা বিএনপির সদস্য সচিব সাহাব উদ্দিন সাবু, যুগ্ম আহ্বায়ক হাছিবুর রহমান এবং বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের সহ-সভাপতি ওয়াহিদ উদ্দিন চৌধুরী হ্যাপি মঞ্চে উপস্থিত থেকে পুরো অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন। এছাড়া স্থানীয় প্রবীণ নেতা আবুল হাশেম, পৌরসভার সাবেক চেয়ারম্যান হাসানুজ্জামান চৌধুরী মিন্টু এবং ওলামা দলের সভাপতি শাহ মোহাম্মদ এমরানসহ বিভিন্ন ইউনিটের সভাপতিরা উপস্থিত ছিলেন। পুরো এলাকাজুড়ে নেতাকর্মীদের ব্যাপক উৎসাহ ও উদ্দীপনা লক্ষ করা গেছে।
সব মিলিয়ে শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানির এই বক্তব্য দেশের বর্তমান রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। একদিকে সরকারের পক্ষ থেকে উন্নয়ন ও সংস্কারের জন্য সময় চাওয়ার আকুতি, অন্যদিকে বিরোধীদের লাগাতার আন্দোলনের হুংকার—সব মিলিয়ে রাজনীতির পারদ এখন বেশ চড়াই রয়েছে। সাধারণ মানুষ কেবল কথার লড়াই দেখতে চায় না, তারা চায় দীর্ঘমেয়াদী সংকটের একটি স্থায়ী ও টেকসই সমাধান।

