শনিবারের সকালটা আর দশটা সাধারণ দিনের মতোই শুরু হয়েছিল গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার বাসিন্দাদের জন্য। কিন্তু বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে একটি বিকট শব্দ আর আর্তনাদ সব স্বাভাবিকতা কেড়ে নেয়। কালিয়াকৈর-মাওনা আঞ্চলিক সড়কের কাঞ্চনপুর এলাকায় ঘটে যায় এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনা।
একটি যাত্রীবাহী সিএনজিচালিত অটোরিকশা এবং মালবাহী কাভার্ড ভ্যানের মধ্যে মুখোমুখি এই সংঘর্ষ হয়। মুহূর্তের মধ্যেই অটোরিকশাটি দুমড়ে-মুচড়ে রাস্তার পাশে ছিটকে পড়ে। ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান দুজন সাধারণ যাত্রী। হাসপাতালে নেওয়ার পর মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে আরও এক টগবগে কিশোর।
নিহত ওই কিশোরের নাম আশাদুল ইসলাম। সে কালিয়াকৈর উপজেলার বংখুরী এলাকার বাসিন্দা এবং প্রবাসী হাসেম মিয়ার সন্তান। উন্নত ভবিষ্যতের আশায় বাবা যখন বিদেশে হাড়ভাঙা খাটুনি খাটছেন, তখন দেশে ছেলের এমন অকাল মৃত্যুতে পুরো পরিবারে নেমে এসেছে শোকের ছায়া।
বাকি দুজন নিহত যাত্রীর পরিচয় এখনো নিশ্চিত করতে পারেনি পুলিশ। তাদের পরিচয় শনাক্তের জন্য স্থানীয় প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। মর্গে রাখা অচেনা এই মৃতদেহগুলো যেন দেশের সড়কগুলোর প্রতিদিনের নির্মম বাস্তবতারই প্রতিচ্ছবি।
বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ঘটা এই দুর্ঘটনাটি আবারও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল আমাদের আঞ্চলিক সড়কগুলোর চরম নিরাপত্তাহীনতার বিষয়টি। মাত্র পাঁচজন যাত্রী নিয়ে সিএনজিটি কালিয়াকৈরের দিকে যাচ্ছিল। গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই বিপরীত দিক থেকে আসা দানবীয় কাভার্ড ভ্যানটি তাদের পিষে দেয়।
দুর্ঘটনার পরপরই স্থানীয় বাসিন্দারা ছুটে আসেন উদ্ধারকাজে। তারা নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দুমড়ে যাওয়া অটোরিকশার ভেতর থেকে যাত্রীদের বের করার চেষ্টা করেন। তাদের আপ্রাণ চেষ্টার পরও দুজনকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
রক্তাক্ত তিন যাত্রীকে উদ্ধার করে দ্রুত কালিয়াকৈর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান স্থানীয়রা। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসকরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করলেও কিশোর আশাদুল ইসলামকে বাঁচাতে পারেননি। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ এবং শরীরে গুরুতর আঘাতের কারণেই তার মৃত্যু হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে।
কালিয়াকৈর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শহিদুল ইসলাম সংবাদমাধ্যমকে এই ভয়াবহ দুর্ঘটনার বিস্তারিত তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, দুর্ঘটনার খবর পাওয়া মাত্রই পুলিশ ঘটনাস্থলে ছুটে যায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার পাশাপাশি মৃতদেহগুলো উদ্ধার করে আইনি প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে।
ঘাতক কাভার্ড ভ্যান এবং দুর্ঘটনাকবলিত সিএনজিটি এরই মধ্যে জব্দ করেছে পুলিশ। তবে কাভার্ড ভ্যানের চালক পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে কি না, সে বিষয়ে এখনো বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি। পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, পুরো ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত চলছে এবং দোষীদের আইনের আওতায় আনা হবে।
বাংলাদেশের সড়কগুলোতে ভারী যানবাহনের সঙ্গে থ্রি-হুইলার বা তিন চাকার হালকা যানের সংঘর্ষ কোনো নতুন ঘটনা নয়। প্রায় প্রতিদিনই দেশের কোনো না কোনো প্রান্তে এমন অসম সংঘর্ষে প্রাণ হারাচ্ছেন নিরীহ মানুষ। এই যানগুলো একই সড়কে চলাচলের কারণে দুর্ঘটনার মাত্রা ও ভয়াবহতা বহুগুণ বেড়ে যায়।
বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরেই মহাসড়ক এবং আঞ্চলিক সড়কগুলোতে হালকা যান চলাচলের জন্য আলাদা লেন বা সার্ভিস লেনের দাবি জানিয়ে আসছেন। কিন্তু দৃশ্যমান কোনো স্থায়ী সমাধান এখনো নিশ্চিত করা যায়নি। ফলে কাভার্ড ভ্যান বা বাসের মতো ভারী যানের সামান্য নিয়ন্ত্রণহীনতাও সিএনজি যাত্রীদের জন্য নিশ্চিত মৃত্যু ডেকে আনছে।
কাঞ্চনপুর এলাকার এই দুর্ঘটনাটি স্থানীয়দের মনে গভীর ক্ষোভ ও আতঙ্কের জন্ম দিয়েছে। তারা অভিযোগ করেছেন, এই আঞ্চলিক সড়কটিতে ভারী যানবাহনগুলো প্রায়শই বেপরোয়া গতিতে চলাচল করে। ট্রাফিক নিয়মের তোয়াক্কা না করা এবং চালকদের অদক্ষতাই এমন প্রাণহানির মূল কারণ।
আশাদুলের পরিবারে এখন চলছে শোকের মাতম। প্রবাসী বাবার কাছে ছেলের মৃত্যুর খবর পৌঁছানোর পর এক হৃদয়বিদারক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। যে সন্তানের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের জন্য বাবা পরবাসে মাটি কামড়ে পড়েছিলেন, সেই সন্তানের নিথর দেহ এখন মর্গের শীতল মেঝেতে।
অজ্ঞাতপরিচয় অপর দুই নিহতের স্বজনদের খুঁজে বের করতে পুলিশ আশেপাশের থানাগুলোতে বার্তা পাঠিয়েছে। তাদের আঙুলের ছাপ সংগ্রহ করে জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্যভাণ্ডারের সঙ্গে মিলিয়ে দেখারও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একটি দুর্ঘটনা কীভাবে একাধিক পরিবারকে পথে বসিয়ে দেয়, এটি তার এক নির্মম উদাহরণ।
দুর্ঘটনাকবলিত সিএনজিটির দিকে তাকালে শিউরে উঠতে হয়। ইস্পাত ও টিনের কাঠামোটি এমনভাবে দুমড়ে গেছে যে, এর ভেতর থেকে কারও জীবিত ফেরাটাই এক বিরাট অলৌকিক ব্যাপার। ঘাতক কাভার্ড ভ্যানের ধাক্কার তীব্রতা কতটা ভয়াবহ ছিল, তা ওই দুমড়ানো কাঠামো দেখলেই সহজে অনুমান করা যায়।
সড়ক নিরাপত্তার বিষয়টি কেবল আইন প্রয়োগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এটি চালকদের মানসিকতার সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত। কাভার্ড ভ্যান চালকদের দীর্ঘক্ষণ টানা গাড়ি চালানো, ক্লান্তিবোধ এবং ওভারটেক করার অসুস্থ প্রতিযোগিতাই বেশিরভাগ সময় এমন বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, আহতদের অবস্থা এতটাই সংকটাপন্ন ছিল যে, উন্নত চিকিৎসার সুযোগটুকুও তারা পাননি। গ্রামীণ ও উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতে ট্রমা সেন্টারের অভাব থাকায় গুরুতর আহতদের বাঁচানো প্রায়ই কঠিন হয়ে পড়ে।
এই দুর্ঘটনা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, নিরাপদ সড়কের দাবি কেবল স্লোগানে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। প্রতিদিন রাস্তায় বের হওয়া মানুষগুলোর সুস্থ শরীরে ঘরে ফেরার নিশ্চয়তা রাষ্ট্রকে দিতে হবে। তা না হলে কালিয়াকৈরের কাঞ্চনপুরের মতো আরও অসংখ্য ট্র্যাজেডি আমাদের দেখতে হবে।
পুলিশ প্রশাসন জানিয়েছে, নিহতদের ময়নাতদন্তের জন্য গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে। আইনি প্রক্রিয়া শেষে মৃতদেহগুলো তাদের স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হবে। এর পাশাপাশি একটি অপমৃত্যুর মামলা দায়েরের প্রক্রিয়াও চলমান রয়েছে।
একটি আধুনিক রাষ্ট্রে সড়ক দুর্ঘটনা নিছক কোনো নিয়তির লিখন হতে পারে না। এটি কাঠামোগত দুর্বলতা ও অব্যবস্থাপনার ফল। যতদিন না আঞ্চলিক সড়কগুলোর নকশাগত ত্রুটি দূর করা হচ্ছে এবং চালকদের কঠোর জবাবদিহিতার আওতায় আনা হচ্ছে, ততদিন সাধারণ মানুষের লাশের সারি কেবল দীর্ঘই হবে।
শোকস্তব্ধ বংখুরী গ্রাম আজ যেন এক মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়েছে। প্রতিবেশীরা দলে দলে আশাদুলের বাড়িতে ভিড় করছেন। কিন্তু স্বান্ত্বনা দেওয়ার মতো কোনো ভাষা তাদের জানা নেই। একজন প্রবাসী বাবার স্বপ্ন কীভাবে মুহূর্তের মধ্যে ধূলিসাৎ হয়ে যায়, তা তারা নিজেদের চোখেই দেখছেন।
মহাসড়কে বা আঞ্চলিক সড়কে থ্রি-হুইলার নিষিদ্ধ করার সরকারি নির্দেশনা থাকলেও অনেক জায়গাতেই তা কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ। বিকল্প সহজলভ্য গণপরিবহনের অভাবেই সাধারণ মানুষ বাধ্য হয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এসব অটোরিকশায় যাতায়াত করেন। এই নিরুপায় অবস্থার সুযোগ নিয়েই সড়কে মৃত্যুর ফাঁদ তৈরি হচ্ছে।
সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের উচিত দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকা বা ব্ল্যাক স্পটগুলো চিহ্নিত করে দ্রুত সেখানে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা। কাঞ্চনপুরের এই সড়কটি যদি আগে থেকেই বিপদসংকুল হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকে, তবে কেন সেখানে গতিরোধক বা স্পিড ব্রেকার দেওয়া হয়নি, সেই প্রশ্নও তুলছেন স্থানীয় সচেতন মহল।
দুর্ঘটনার শিকার সিএনজি চালকও সম্ভবত তার পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন। তার অবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিত জানা না গেলেও, এমন ভয়াবহ সংঘর্ষে চালকের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। একটি সিএনজির পেছনে জড়িয়ে থাকে নিম্ন আয়ের একটি পরিবারের বেঁচে থাকার লড়াই।
ভারী যানবাহনগুলোর ক্ষেত্রে আরেকটি বড় সমস্যা হলো ফিটনেসবিহীন গাড়ি এবং লাইসেন্সবিহীন চালক। মালিকপক্ষ অনেক সময় বেশি লাভের আশায় অদক্ষ হেলপার বা সহকারীর হাতে এত বড় একটি গাড়ির স্টিয়ারিং তুলে দেন। যার চূড়ান্ত পরিণতি ভোগ করতে হয় রাস্তার সাধারণ পথচারী ও যাত্রীদের।
এই ধরনের দুর্ঘটনার পর সাধারণত একটি মামলা হয়, কিছুদিন তদন্ত চলে, তারপর ধীরে ধীরে তা ফাইলের স্তূপে হারিয়ে যায়। ভুক্তভোগী পরিবারগুলো বছরের পর বছর আদালতের বারান্দায় ঘুরেও কাঙ্ক্ষিত বিচার বা ক্ষতিপূরণ পায় না। বিচারহীনতার এই সংস্কৃতিই সড়কে নৈরাজ্যকে আরও উসকে দিচ্ছে।
কালিয়াকৈরের এই দুর্ঘটনা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, জীবনের চেয়ে সময়ের মূল্য কোনোভাবেই বেশি হতে পারে না। গন্তব্যে দ্রুত পৌঁছানোর এই মরণখেলায় আজ যারা হেরে গেলেন, তাদের আর কোনোদিন ফিরে পাওয়া যাবে না। কিন্তু যারা বেঁচে আছেন, তাদের জন্য একটি নিরাপদ ব্যবস্থা রেখে যাওয়া রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।
পুলিশের উচিত কেবল গাড়ি জব্দ করার মধ্যেই নিজেদের দায়িত্ব সীমাবদ্ধ না রাখা। এই কাভার্ড ভ্যানের মালিক কে, চালকের বৈধ লাইসেন্স ছিল কি না এবং গাড়ির ফিটনেস হালনাগাদ ছিল কি না—সবকিছু জনসমক্ষে প্রকাশ করা উচিত। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হলেই কেবল এই ধরনের কাঠামোগত হত্যাকাণ্ড কমিয়ে আনা সম্ভব।
পরিশেষে, কালিয়াকৈরের কাঞ্চনপুর সড়কের এই রক্তদাগ হয়তো কয়েকদিন পর বৃষ্টির জলে ধুয়ে যাবে। দুমড়ানো সিএনজিটিও সরিয়ে নেওয়া হবে ডাম্পিং স্টেশনে। কিন্তু আশাদুলের পরিবারের হৃদয়ে যে রক্তক্ষরণ শুরু হলো, তা কোনোদিন থামবে না। তাদের এই নীরব কান্না যেন আমাদের সড়ক ব্যবস্থাপনার এক চিরস্থায়ী কলঙ্ক হয়েই থাকবে।

