উত্তরের বিভাগীয় শহর রংপুরের শান্ত জনপদে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া চার খুনের ঘটনাটি সাধারণ মানুষের মনে গভীর রেখাপাত করেছে। শহরের অলিগলিতে এখন কেবলই এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পেছনের কারণ নিয়ে ফিসফাস আর আলোচনা। এমন এক থমথমে ও কৌতূহলপূর্ণ পরিস্থিতিতে অপরাধীদের দ্রুত বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর কড়া বার্তা দিয়েছে সরকার। শনিবার দুপুরে রংপুরে এসে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, এই চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডেরহস্য উন্মোচনে প্রশাসন সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে। খুব শিগগিরই নিখুঁত চার্জশিট প্রদানের মাধ্যমে অপরাধীদের দ্রুততম সময়ে বিচারের আওতায় আনা হবে।
শনিবার সরকারি সফরে রংপুরে এসে মন্ত্রী কেবল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েই কথা বলেননি, তিনি হাত দিয়েছেন উত্তরের কোটি মানুষের আস্থার জায়গা রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পুরোনো ক্ষতগুলোতেও। দুপুরে হাসপাতালের বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটের নতুন সার্ভিস ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন শেষে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন তিনি। সেখানে তিনি বিগত দেড় দশকের বেশি সময় ধরে দেশের স্বাস্থ্যখাতে চলা লাগামহীন অনিয়ম ও দুর্নীতির চিত্র অত্যন্ত খোলামেলাভাবে তুলে ধরেন। তাঁর কথায় উঠে আসে কীভাবে একটি দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যবস্থা সাধারণ মানুষের জীবন রক্ষাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গিয়েছিল।
চার হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে মন্ত্রীর কণ্ঠে ছিল একদিকে কঠোরতা, অন্যদিকে তদন্তের স্বচ্ছতা নিয়ে সতর্কতা। তিনি স্বীকার করেন যে, রংপুরের ইতিহাসে একসঙ্গে চারটি খুনের এমন ঘটনা সত্যিই বিরল এবং এটি জনমনে ব্যাপক ভীতির সঞ্চার করেছে। তবে প্রশাসন কেন তদন্তে কিছুটা সময় নিচ্ছে, তার একটি যৌক্তিক ব্যাখ্যাও তিনি দাঁড় করান। তাড়াহুড়ো করে তদন্ত শেষ করতে গিয়ে যেন মূল অপরাধীরা পার পেয়ে না যায়, সে বিষয়ে পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে সতর্ক করা হয়েছে। প্রকৃত দোষীদের খুঁজে বের করে আইনের জালে আটকাতেই এই বাড়তি সময় নেওয়া হচ্ছে বলে তিনি আশ্বস্ত করেন।
হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে কোনো প্রভাবশালী চক্র বা ইন্ধনদাতা জড়িয়ে আছে কি না, সেটিও অত্যন্ত গভীরভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। মন্ত্রী দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, হত্যাকাণ্ডের পেছনের মূল কুশীলবদের মুখোশ উন্মোচন করাটা এখন সবচেয়ে বেশি জরুরি। প্রাথমিক তদন্ত শেষে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই আদালতে পূর্ণাঙ্গ চার্জশিট জমা দেওয়া হবে। এরপর বিচার প্রক্রিয়া যাতে কোনোভাবেই দীর্ঘায়িত না হয়, সে বিষয়ে আইন মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করার ইঙ্গিত দেন তিনি। তাঁর এই বক্তব্য নিহতদের পরিবার ও স্থানীয়দের মনে সুবিচার পাওয়ার একটি নতুন আশার সঞ্চার করেছে।
আইনশৃঙ্খলার পাশাপাশি স্বাস্থ্যখাতের ভঙ্গুর দশা নিয়ে মন্ত্রীর বিশ্লেষণ ছিল বেশ তীক্ষ্ণ। রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার পর এটি তাঁর তৃতীয়বারের মতো হাসপাতাল পরিদর্শন। তিনি জানান, দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে তিনি নিয়মিত হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বৈঠক করছেন এবং পূর্বের সিদ্ধান্তগুলো কতটুকু বাস্তবায়িত হয়েছে, তার কড়া হিসাব নিচ্ছেন। প্রশাসনিক এই জবাবদিহিতার অভাবেই যে বছরের পর বছর ধরে হাসপাতালের সেবা তলানিতে গিয়ে ঠেকেছিল, সেটি তাঁর কথায় স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র বা আইসিইউ সংকটের মতো একটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে এদিন কথা বলেন মন্ত্রী। উত্তরাঞ্চলের এই সর্ববৃহৎ হাসপাতালটিতে দীর্ঘদিন ধরে আইসিইউ শয্যার হাহাকার চলছে। মুমূর্ষু রোগীদের আইসিইউর অভাবে ঢাকায় স্থানান্তর করতে গিয়ে পথেই অনেকের মৃত্যু হয়। মন্ত্রী অত্যন্ত হতাশার সঙ্গে জানান যে, হাসপাতালে আইসিইউ শয্যা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হলেও কেবল অ্যানেসথেশিওলজিস্ট বা অজ্ঞানকারী চিকিৎসকের অভাবে তা চালু করা সম্ভব হয়নি। একটি সরকারি হাসপাতালে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের এমন সংকটকে তিনি বিগত সরকারের চরম অব্যবস্থাপনার ফল বলে আখ্যায়িত করেন।
তবে আশার কথা হলো, দীর্ঘদিনের এই অচলাবস্থা কাটতে শুরু করেছে। ত্রাণমন্ত্রী সাংবাদিকদের জানান, এরই মধ্যে হাসপাতালে প্রয়োজনীয় সংখ্যক অ্যানেসথেশিওলজিস্ট পদায়ন করা হয়েছে। জনবলের এই শূন্যতা পূরণ হওয়ায় আগামী এক মাসের মধ্যেই নতুন করে আইসিইউ বেডগুলো রোগীদের সেবায় পুরোপুরি চালু করা সম্ভব হবে বলে তিনি জোরালো আশা ব্যক্ত করেন। মুমূর্ষু রোগী ও তাঁদের স্বজনদের জন্য এই ঘোষণা নিঃসন্দেহে একটি বড় স্বস্তির খবর।
গত ১৭ বছরের স্বাস্থ্যখাতের সামগ্রিক পরিস্থিতি মূল্যায়নে মন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু কোনো রাখঢাক করেননি। তিনি বলেন, বছরের পর বছর ধরে চলা অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতির কারণে স্বাস্থ্যখাত আজ ধ্বংসের একেবারে শেষ প্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে। তবে বর্তমান সরকার প্রধান এই খাতটিকে ঢেলে সাজাতে সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। তিনি স্বীকার করেন যে, সারা দেশেই চিকিৎসবা ও স্বাস্থ্যকর্মীর ব্যাপক সংকট রয়েছে। তবে খুব শিগগিরই নতুন জনবল নিয়োগের মাধ্যমে হাসপাতালগুলোর বিভিন্ন বিভাগের দীর্ঘদিনের চাহিদা পূরণের সর্বাত্মক চেষ্টা চলছে।
এদিন বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটের যে নতুন সার্ভিস ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হলো, সেটি রংপুর মেডিকেলের চিকিৎসা সেবায় এক নতুন মাত্রা যোগ করবে। হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, অগ্নিদগ্ধ রোগীদের সুচিকিৎসার জন্য সম্পূর্ণ আলাদা এই ছয়তলা ভবনটি নির্মাণে সরকারের প্রায় ১০ কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে। বার্ন ইউনিটের মতো একটি সংবেদনশীল বিভাগের জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও অন্যান্য কারিগরি সহায়তা নিশ্চিত করতে এই সার্ভিস ভবনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
নতুন এই সার্ভিস ভবনের নকশা ও ফ্লোর পরিকল্পনা করা হয়েছে একেবারে আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের চাহিদা অনুযায়ী। এর নিচতলায় স্থাপন করা হবে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন জেনারেটরের সাব-স্টেশন, যাতে এক মুহূর্তের জন্যও বিদ্যুৎ বিভ্রাট না ঘটে। দ্বিতীয় তলায় থাকবে মেডিকেল গ্যাসের মেনিফোল্ড রুম ও ইলেকট্রিক কন্ট্রোল রুম। তৃতীয় তলায় চিকিৎসা সামগ্রী সংরক্ষণের জন্য বিশাল স্টোর রুম এবং চতুর্থ থেকে ষষ্ঠ তলা পর্যন্ত নিরাপত্তা কর্মীদের থাকার জন্য আনসার ব্যারাক নির্মাণ করা হবে।
শনিবার মন্ত্রীর এই হাসপাতাল পরিদর্শনের সময় উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় প্রশাসনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। রংপুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান সামসুজ্জামান সামু, রংপুর মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. আনোয়ার হোসেন এবং হাসপাতালের বর্তমান পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আশিকুর রহমানসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা মন্ত্রীর সঙ্গে ছিলেন। তাঁরা প্রত্যেকেই হাসপাতালের সেবার মান বাড়াতে একযোগে কাজ করার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন।
এর আগে শনিবার সকালেই মন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু রংপুর নগরীর গুপ্তপাড়ায় একটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি দপ্তরের উদ্বোধন করেন। সেখানে নবনির্মিত বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি) সচিবালয়ের আঞ্চলিক কার্যালয়টির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন তিনি। উত্তরের চাকরিপ্রার্থীদের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল এই পিএসসি কার্যালয়টি। এর ফলে এখন আর সামান্য কাজের জন্য এ অঞ্চলের তরুণদের ঢাকা মুখী হতে হবে না।
সব মিলিয়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রীর এই রংপুর সফরটি ছিল বহুমুখী বার্তায় ভরপুর। একদিকে চাঞ্চল্যকর খুনের ঘটনায় প্রশাসনের কঠোর অবস্থান স্পষ্ট করে জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার তাগিদ, অন্যদিকে দুর্নীতিগ্রস্ত স্বাস্থ্যখাতকে টেনে তুলে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় আধুনিক চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দেওয়ার নিরন্তর চেষ্টা। এখন কেবল সময়ের অপেক্ষা, সাধারণ মানুষ দেখতে চায় মন্ত্রীর এই আশ্বাসগুলো কত দ্রুত বাস্তবতার আলো দেখে এবং রংপুরের মানুষ তাদের কাঙ্ক্ষিত সুবিচার ও উন্নত চিকিৎসাসেবা ফিরে পায়।

