সাভারের একটি স্থানীয় মাদরাসায় ধর্মীয় শিক্ষা নিতে গিয়ে নরকীয় অভিজ্ঞতার শিকার হয়েছে সাত বছরের এক ছোট্ট শিশু। গত ছয় মাস ধরে শিক্ষক ও কয়েকজন শিক্ষার্থীর হাতে বারবার শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে দ্বিতীয় শ্রেণির ওই শিক্ষার্থী। বর্তমানে সে মারাত্মক মানসিক ট্রমা ও শারীরিক জখম নিয়ে ধুঁকছে।
শুক্রবার দুপুরে সংবাদকর্মীদের সামনে এসে শিশুটির অসহায় বাবা তার সন্তানকে নিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন। কারখানায় সামান্য চাকরি করা এই মানুষটি এখন ছেলের ব্যয়বহুল চিকিৎসা নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছেন। ঘটনার বহু দিন পেরিয়ে গেলেও মামলার কোনো অভিযুক্তকে এখনো গ্রেপ্তার করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
গত ২৬ আগস্ট সাভার মডেল থানায় এ বিষয়ে একটি আনুষ্ঠানিক মামলা দায়ের করা হয়েছে। তবে পুলিশের দাবি, মামলা হওয়ার পর থেকেই অভিযুক্ত শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা গা ঢাকা দিয়েছেন। শাহীবাগ মহল্লার মারকাযুল উলূম আশ-শরইয়্যাহ মাদরাসার মক্তব বিভাগের এই ঘটনায় পুরো এলাকায় চরম ক্ষোভ ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
মামলার এজাহার অনুযায়ী, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে শিশুটিকে কোরআনি শিক্ষা দেওয়ার জন্য ওই মাদরাসায় ভর্তি করেছিলেন তার বাবা। কিন্তু মাস না ঘুরতেই শুরু হয় সহপাঠী ও বড় ছাত্রদের যৌন নিপীড়ন। গত একুশে ফেব্রুয়ারির সন্ধ্যায় টয়লেটে নিয়ে প্রথমবার শিশুটির ওপর শারীরিক নির্যাতন চালায় রাফি নামের এক শিক্ষার্থী।
কিছুদিন পর সেই ঘটনা জেনে যায় অপর ছাত্র সায়েম। এরপর ২৪ ফেব্রুয়ারি একা পেয়ে সেও শিশুটিকে বলাৎকার করে। রুমের সঙ্গী আবু সাঈদ ও মোহম্মদ বিন মুক্তারও এই নৃশংসতার হাত থেকে শিশুটিকে রেহাই দেয়নি। গত ১২ ও ১৪ এপ্রিল রাতে ঘুমে আচ্ছন্ন থাকা অবস্থায় তারাও একে একে নিষ্পাপ এই শিশুটির ওপর পাশবিক নির্যাতন চালায়।
ভয়ঙ্কর এই চক্র এখানেই থেমে থাকেনি। ২৫ এপ্রিল রাতে ঘুম থেকে তুলে জোর করে টয়লেটে নিয়ে হাসান বিন মোস্তফা আবারও একই অপরাধ করে। ঘটনা কাউকে জানালে মেরে ফেলার হুমকি দিয়ে শিশুটিকে পুরোপুরি আতঙ্কিত করে রাখা হয়েছিল। একের পর এক এমন নিপীড়নে শিশুটির মনস্তত্ত্ব মারাত্মকভাবে ভেঙে পড়ে।
সবচেয়ে মর্মান্তিক বিষয় হলো, এই কুকর্মের কথা এক সময় মক্তব বিভাগের সহকারী শিক্ষক হাফেজ মাওলানা জাবের হোসেনের কানেও পৌঁছে যায়। কিন্তু অপরাধীদের প্রতিহত না করে গত ৪ জুলাই রাতে সেই শিক্ষক নিজেই শিশুটির ওপর বলাৎকার চালান। মুখ খুললেই গলা টিপে ধরে মেরে ফেলার হুমকি দেন তিনি।
অন্যান্য শিক্ষক যেমন হাফেজ কামরুজ্জামান, ক্বারী রফিকুল ইসলাম ও জিয়া ইবনে কাসেম বিষয়টি ধামাচাপা দিতে উল্টো শিশুটিকে শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করেন। কাউকে মুখ না খোলার জন্য রীতিমতো ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করা হয়েছিল ওই প্রতিষ্ঠানে। ভয়ে কুঁকড়ে থাকা শিশুটি দীর্ঘদিন পরিবারকেও কিচ্ছু বলতে পারেনি।
বর্তমানে রাতে ঘুমের মধ্যে হঠাৎ করেই আঁতকে উঠে চিৎকার করে ওঠে শিশুটি। ঘুমের ঘোরে সে বলতে থাকে, আমার গলা ছেড়ে দাও। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, শারীরিক ক্ষতির পাশাপাশি তার মনে গভীর মানসিক আঘাত বা ট্রমা তৈরি হয়েছে, যা থেকে বের করে আনতে দীর্ঘমেয়াদি থেরাপি ও চিকিৎসা প্রয়োজন।
ভুক্তভোগী শিশুর বাবা সাভারের একটি পোশাক কারখানায় স্টোর কিপার হিসেবে সামান্য বেতনে চাকরি করেন। তার পক্ষে এই ব্যয়বহুল চিকিৎসা করানো একেবারেই অসম্ভব হয়ে পড়েছে। সন্তানের আর্তনাদ শুনে প্রতিদিন নিজেকে অপরাধী মনে করেন এই হতভাগ্য পিতা।
সাভার মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল আলম গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, অভিযোগ পাওয়ার পরই মামলা নেওয়া হয়েছে। অভিযুক্তরা ঘটনার পর থেকে পলাতক থাকায় তাদের ধরতে পুলিশি অভিযান চলছে। যেকোনো মূল্যে আসামিদের আইনের আওতায় আনা হবে বলে তিনি আশ্বাস দিয়েছেন।

