রাজধানীর রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সের ঐতিহাসিক প্যারেড গ্রাউন্ড আজ এক ভিন্নতর গাম্ভীর্যের সাক্ষী হয়ে রইল। দীর্ঘ দেড় দশকের রাজনৈতিক অস্থিরতা আর গত ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের রক্তক্ষয়ী স্মৃতি পেরিয়ে এক নতুন পরিবেশে উদযাপিত হচ্ছে ‘পুলিশ সপ্তাহ-২০২৬’। এই আয়োজনের মধ্য দিয়ে যেমন বাহিনীর আধুনিকায়নের বার্তা দেওয়া হয়েছে, তেমনি দেওয়া হয়েছে গভীর এক রাজনৈতিক ও মানবিক প্রতিশ্রুতি।
রোববার সকালে বর্ণাঢ্য কুচকাওয়াজ ও কুশল বিনিময়ের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। স্বাধীনতার প্রথম প্রহরে যে মাটি পুলিশের রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল, সেই পুণ্যভূমিতে দাঁড়িয়ে তিনি বাহিনীর সদস্যদের প্রতি এক নতুন এবং সাহসী আহ্বান জানান। তার বক্তব্যে উঠে এসেছে অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে একটি ন্যায়ভিত্তিক পুলিশ বাহিনী গড়ে তোলার দৃঢ় সংকল্প।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান স্পষ্ট ভাষায় উচ্চারণ করেন, এই বাংলাদেশে আর কোনো ফ্যাসিবাদ বা স্বৈরাচার যেন পুলিশ সদস্যদের দেশ ও জনগণের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে সক্ষম না হয়। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, পুলিশ জনগণের শত্রু নয়, বরং সেবক। কিন্তু বিগত সময়ে রাজনৈতিক সংকীর্ণতায় বাহিনীকে যেভাবে ব্যবহার করা হয়েছে, সেই অন্ধকার অধ্যায়ের পুনরাবৃত্তি যেন আর না ঘটে, সেটাই ছিল তার বক্তব্যের মূল সুর।
স্বাধীনতার ইতিহাসের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী ১৯৭১ সালের উত্তাল দিনগুলোর কথা টেনে আনেন। তিনি বলেন, একদিকে চট্টগ্রামে মেজর জিয়ার ঐতিহাসিক বিদ্রোহ ‘উই রিভোল্ট’, আর অন্যদিকে ঢাকার রাজারবাগে পুলিশ বাহিনীর মরণপণ প্রতিরোধ—এই দুই ঘটনাই ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতার পথে অবিচ্ছেদ্য শক্তি। সেই গৌরবময় ইতিহাসের উত্তরসূরি হিসেবে আজকের পুলিশকেও একই সাহসিকতার পরিচয় দিতে হবে।
তবে ইতিহাসের কিছু ধূসর দিক নিয়েও প্রশ্ন তোলেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি গবেষকদের প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন, ১৯৭১ সালের মার্চে যখন পশ্চিম পাকিস্তান থেকে হাজার হাজার সৈন্য ঢাকায় জড়ো করা হচ্ছিল, তখন সব পুলিশ সদস্যকে রাজারবাগে এক জায়গায় কেন জমা রাখা হয়েছিল, সেই কৌশলগত সিদ্ধান্তের পেছনে তৎকালীন রাজনৈতিক নেতৃত্বের যুক্তি কী ছিল, তা আজও গবেষণার বিষয়। এই সত্যগুলো খুঁজে দেখা প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।
তারেক রহমান পুলিশের কুচকাওয়াজ দেখে মুগ্ধতা প্রকাশ করে বলেন, এটি কেবল একটি আনুষ্ঠানিক প্যারেড ছিল না। বরং এটি ছিল পুলিশ সদস্যদের শৃঙ্খলা, আত্মমর্যাদা এবং দায়িত্ববোধের এক অনন্য বহিঃপ্রকাশ। তাদের এই ঋজু ভঙ্গি এবং দৃপ্ত কদমই বলে দেয় যে তারা একটি সুন্দর ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাওয়ার জন্য মানসিক ও পেশাগতভাবে প্রস্তুত।
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, বর্তমান সরকার জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন। দীর্ঘ সময় ধরে হামলা, মামলা ও নির্যাতনের শিকার অধিকারহারা মানুষ এখন শান্তি ও নিরাপত্তা চায়। আর এই কাঙ্ক্ষিত নিরাপত্তা নিশ্চিত করার গুরুদায়িত্ব অর্পিত হয়েছে পুলিশ বাহিনীর ওপর। জনগণের আস্থা অর্জনই হবে তাদের সবচেয়ে বড় সার্থকতা।
পুলিশ সদস্যদের প্রতি দিকনির্দেশনা দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আপনাদের সাধ্য এবং সামর্থ্যের সবটুকু দিয়ে জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। সরকারের পক্ষ থেকে এটিই আপনাদের প্রতি প্রধান এবং একমাত্র প্রত্যাশা। পুলিশ যখন তার পেশাদারিত্বের জায়গায় অটল থাকে, তখন কোনো অপশক্তিই সাধারণ মানুষের ক্ষতি করতে পারে না বলে তিনি বিশ্বাস করেন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রসঙ্গ টেনে তারেক রহমান বলেন, সাম্প্রতিক নির্বাচন প্রমাণ করেছে যে বাংলাদেশ পুলিশ অত্যন্ত দক্ষতা ও নিরপেক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালন করতে সক্ষম। যে পেশাদারিত্বের পরিচয় তারা দিয়েছেন, তা দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক মহলে প্রশংসিত হয়েছে। এই ধারা অব্যাহত রাখা এবং প্রতিটি ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা বজায় রাখা এখন বাহিনীর প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত।
দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে বিশ্বমঞ্চেও বাংলাদেশ পুলিশের সফলতার কথা তিনি গর্বের সাথে উল্লেখ করেন। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশ পুলিশের সাহসিকতা ও মানবিকতা আজ বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত। বিশেষ করে নারী পুলিশ সদস্যদের ভূমিকা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেছে। এই সাফল্যকে দেশীয় প্রেক্ষাপটেও প্রয়োগ করার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।
তারেক রহমান একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোকপাত করেন, যা দীর্ঘকাল ধরে বিতর্কিত ছিল। তিনি বলেন, বিদেশের মাটিতে আমাদের পুলিশ সদস্যরা যেমন মানবিক আচরণ করেন, দেশের জনগণের সাথেও ঠিক তেমন আচরণই প্রত্যাশিত। ক্ষমতার দম্ভ বা পেশিশক্তির ব্যবহার নয়, বরং বিপদে পড়া মানুষের শেষ আশ্রয়স্থল হিসেবে পুলিশকে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে।
অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, সরকারের পদস্থ আমলা এবং পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। প্যারেড শেষে প্রধানমন্ত্রী পুলিশ নারী কল্যাণ সমিতির (পুনাক) স্টল পরিদর্শন করেন এবং সদস্যদের পরিবারের খোঁজখবর নেন। তার এই অংশগ্রহণ কেবল আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং বাহিনীর প্রতিটি স্তরের মানুষের সাথে এক ধরনের সংযোগ স্থাপনের চেষ্টা ছিল দৃশ্যমান।
প্রধানমন্ত্রী তার ভাষণে আরও উল্লেখ করেন, পুলিশের আধুনিকায়ন এবং সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির বিষয়ে সরকার আন্তরিক। তবে তার বিপরীতে বাহিনীর সদস্যদের কাছ থেকে শতভাগ সততা ও নিষ্ঠা প্রত্যাশা করে রাষ্ট্র। অপরাধীর কোনো রাজনৈতিক পরিচয় থাকবে না—এই নীতিতে অটল থেকে কাজ করার নির্দেশ দেন তিনি। এতেই একটি সত্যিকারের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা শক্তিশালী হবে।
বক্তব্যের শেষে তারেক রহমান একটি নতুন শপথের কথা বলেন। তিনি বলেন, আসুন আজ আমরা আবারও অঙ্গীকারবদ্ধ হই যে, এই মাটি আর কখনো স্বৈরাচারের তল্পিবাহক হবে না। পুলিশ হবে গণমানুষের বন্ধু এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার প্রধান হাতিয়ার। স্বাধীনতার লড়াইয়ে যারা জীবন দিয়েছিলেন, তাদের রক্তের ঋণ শোধ করার এটাই একমাত্র পথ।
রাজারবাগের এই অনুষ্ঠানটি কেবল পুলিশ সপ্তাহের উদ্বোধন ছিল না, বরং এটি ছিল পরিবর্তিত বাংলাদেশে রাষ্ট্র ও বাহিনীর নতুন সম্পর্কের একটি রূপরেখা। সাধারণ মানুষও আশা করছে, প্রধানমন্ত্রীর এই কড়া বার্তার পর পুলিশি ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আসবে। ভয় নয়, বরং ভরসার নাম হবে পুলিশ—এই স্বপ্ন এখন কোটি মানুষের চোখে।
পুরো আয়োজনটি ছিল সুশৃঙ্খল এবং আবেগময়। বিশেষ করে যখন শহীদ পুলিশ সদস্যদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয়, তখন পুরো অডিটোরিয়ামে এক পিনপতন নীরবতা নেমে আসে। প্রধানমন্ত্রী নিজে দাঁড়িয়ে তাদের বীরত্বকে সালাম জানান। এটি বাহিনীর নিম্নস্তরের সদস্যদের মধ্যে বিশেষ অনুপ্রেরণা তৈরি করেছে বলে উপস্থিত কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলে জানা গেছে।
নতুন বাংলাদেশের এই যাত্রায় পুলিশ বাহিনীকে আধুনিক ও মানবিক করতে সরকারের যে অঙ্গীকার, তার বাস্তবায়ন এখন সময়ের দাবি। রাজারবাগের এই মাঠ থেকে আজ যে বার্তার যাত্রা শুরু হলো, তা দেশের প্রতিটি থানায় পৌঁছে যাবে—এমনটাই প্রত্যাশা করা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর বজ্রকণ্ঠের এই নির্দেশনা মাঠ পর্যায়ে কতটুকু প্রতিফলিত হয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
সব মিলিয়ে, পুলিশ সপ্তাহ-২০২৬ এর এই উদ্বোধনী অনুষ্ঠানটি কেবল একটি উৎসব নয়, বরং এটি ছিল একটি জবাবদিহিমূলক প্রশাসনিক সংস্কৃতির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের মাহেন্দ্রক্ষণ। তারেক রহমানের এই ভাষণ দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটিয়ে পুলিশ বাহিনীকে এক নতুন উদ্যমে কাজ করার প্রেরণা জুগিয়েছে। জনগণের জানমালের পাহারাদার হিসেবে পুলিশ এখন আরও বেশি দায়িত্বশীল হবে—রাজারবাগের আকাশ-বাতাসে আজ এই আশাবাদই প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল।

