ঘরের চার দেয়ালের ভেতর থেকে শুরু করে ইন্টারনেটের সুবিস্তীর্ণ ভার্চুয়াল জগৎ—কোথাও যেন নিরাপদ নয় শৈশব। প্রতিনিয়ত খবরের কাগজের পাতা উল্টালেই চোখে পড়ে কোনো না কোনো শিশুর আর্তনাদের ছবি। বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে শিশুদের ওপর শারীরিক, মানসিক ও যৌন নিপীড়ন। এই অন্ধকার পরিস্থিতি থেকে নতুন প্রজন্মকে বাঁচাতে এবার রাষ্ট্রে সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে এসেছে এক বড় ঘোষণা।
দেশে ক্রমবর্ধমান শিশু নির্যাতন ও সহিংসতা মোকাবিলায় জাতীয় পর্যায়ে একটি শক্তিশালী ও সমন্বিত ‘শিশু নিরাপত্তা টাস্কফোর্স’ গঠনের জোর দাবি উঠেছে। জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল এই টাস্কফোর্স গঠনের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছেন। তার মতে, বিচ্ছিন্ন কোনো উদ্যোগ নয়, বরং সব সরকারি ও বেসরকারি সংস্থাকে এক ছাতার নিচে এনে শিশুদের জন্য একটি নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বলয় তৈরি করতে হবে।
শনিবার (৬ জুন) রাজধানীর শাহবাগে অবস্থিত শহীদ আবু সাঈদ কনভেনশন সেন্টারের মূল কনফারেন্স কক্ষে একটি উচ্চপর্যায়ের গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। “বাংলাদেশে ক্রমবর্ধমান শিশু নির্যাতন মোকাবিলা: প্রতিবন্ধকতা, দায়িত্ব ও করণীয়” শীর্ষক এই সংবেদনশীল আলোচনার আয়োজন করেছিল ‘নিপীড়িত নারী ও শিশুদের আইনি ও স্বাস্থ্য সহায়তা সেল’। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মানবাধিকার কর্মী ও নীতিনির্ধারকেরা সেখানে জড়ো হয়েছিলেন।
সামাজিক ব্যাধি নির্মূলে সমন্বিত লড়াইয়ের ডাক
গোলটেবিল বৈঠকে প্রধান অতিথির বক্তব্যে ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল শিশু নির্যাতনের বর্তমান চিত্র নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, “আমাদের বুঝতে হবে যে শিশু নির্যাতন স্রেফ কোনো সাধারণ অপরাধ নয়, এটি একটি গুরুতর সামাজিক ব্যাধি। আর কোনো ব্যাধিকে কেবল পুলিশ বা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার লাঠি দিয়ে চিরতরে নির্মূল করা সম্ভব নয়।”
ব্যারিস্টার কায়সার কামাল তার বক্তৃতায় সমাজকে এক নতুন আয়নার সামনে দাঁড় করান। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, কেবল আদালতের বারান্দায় বিচার চেয়ে এই সংকটের সমাধান হবে না। এই মরণব্যাধি রুখতে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় উপাসনালয়, সামাজিক সংগঠন, গণমাধ্যম এবং রাষ্ট্রের প্রতিটি অঙ্গকে একযোগে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করতে হবে। তবেই প্রতিটি শিশুর শৈশব হবে ভয়হীন।
তিনি আরও যোগ করেন, “আমাদের নিজেদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সমাজের প্রতিটি নাগরিককে ব্যক্তিগতভাবে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। আমরা যদি আজ চুপ করে থাকি, তবে আগামী দিনের বাংলাদেশ এক পঙ্গু ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত প্রজন্মের মুখোমুখি হবে। যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।”
আইনের ফাঁকফোকর ও প্রযুক্তির নতুন ফাঁদ
বর্তমানে বাংলাদেশে শিশু সুরক্ষায় বেশ কিছু কড়া আইন বিদ্যমান থাকলেও বাস্তবে তার প্রয়োগ এবং কার্যকারিতা নিয়ে মাঠপর্যায়ে অনেক প্রশ্ন রয়েছে। ডেপুটি স্পিকার তার বক্তব্যে সেই কাঠামোগত দুর্বলতার কথা স্বীকার করেন। তিনি বলেন, শিশু নির্যাতনের মূল কারণগুলো প্রথমে আমাদের বৈজ্ঞানিকভাবে চিহ্নিত করতে হবে। এরপর দেখতে হবে আমাদের বিদ্যমান আইন ও সুরক্ষা নীতিতে কোথায় কোথায় ঘাটতি বা ফাঁকফোকর রয়েছে।
বক্তব্যের একটি বড় অংশ জুড়ে ছিল আধুনিক প্রযুক্তির অপব্যবহার এবং শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তা। কায়সার কামাল সতর্ক করে দিয়ে বলেন, বর্তমান সময়ে শিশুদের প্রতি প্রথাগত শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের পাশাপাশি অনলাইনভিত্তিক ব্ল্যাকমেইল ও সাইবার বুলিংয়ের ঝুঁকি উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। লকডাউন ও পরবর্তী সময়ে স্মার্টফোনের অবাধ ব্যবহার শিশুদের এক অদৃশ্য বিপদের মুখে ঠেলে দিয়েছে।
এই ডিজিটাল ফাঁদ থেকে শিশুদের বাঁচাতে অভিভাবকদের সচেতনতা বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই বলে তিনি মনে করেন। একই সঙ্গে প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একটি ‘শিশু সুরক্ষা সেল’ গঠন এবং প্রযুক্তির নিরাপদ ব্যবহার নিশ্চিতকরণের ওপর জোর দেন তিনি। শিশুদের অধিকার সম্পর্কে গ্রামীণ ও প্রান্তিক পর্যায়ে সামাজিক সচেতনতা বাড়াতে বড় ধরনের ক্যাম্পেইন শুরুর আহ্বান জানান ডেপুটি স্পিকার।
কথার চেয়ে কাজে বিশ্বাসের রাজনীতি ও রামিসা হত্যা
বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে অনেক সময় বড় বড় আশ্বাসের বাণী শোনা গেলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন ধীরগতির হয়। এই প্রচলিত ধারার সমালোচনা করে ডেপুটি স্পিকার বলেন, “আমরা আর ফাঁকা বুলি শুনতে চাই না। কথার চেয়ে কাজে বিশ্বাসী হতে হবে আমাদের। একটি শিশু নির্যাতিত হওয়ার পর আমাদের ঘুম ভাঙবে, এই সংস্কৃতি পরিবর্তন করতে হবে। আমাদের প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়তে হবে।”
সাম্প্রতিক সময়ে দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করা শিশু ‘রামিসা হত্যা’ প্রসঙ্গেও কথা বলেন এই আইনপ্রণেতা। রামিসার নির্মম মৃত্যু দেশের বিবেককে নাড়া দিয়েছে। এই হত্যাকাণ্ডের বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে দেশবাসীর দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি বলেন, “আমি দেশের একজন নাগরিক এবং সংসদের প্রতিনিধি হিসেবে আশ্বস্ত করছি, দ্রুততম সময়ের মধ্যে দেশের সর্বোচ্চ আদালতের মাধ্যমে রামিসা হত্যার ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা হবে।”
তিনি স্পষ্ট করে বলেন, এই ধরণের জঘন্য অপরাধের ক্ষেত্রে অপরাধী যত প্রভাবশালীই হোক না কেন, তাকে কোনো ধরনের রাজনৈতিক বা সামাজিক আশ্রয় দেওয়া হবে না। দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হবে, যাতে ভবিষ্যতে কোনো অপরাধী শিশুদের গায়ে হাত তোলার সাহস না পায়।
সুরক্ষায় নিয়োজিত প্রতিষ্ঠানগুলোর মানবিক ভূমিকা
যেসব বেসরকারি সংস্থা ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন নির্যাতিত নারী ও শিশুদের আইনি, চিকিৎসা ও মানসিক ট্রমা কাটাতে সহায়তা দিচ্ছে, তাদের কাজের ভূয়সী প্রশংসা করেন প্রধান অতিথি। তিনি বলেন, রাষ্ট্র একা সব কাজ করতে পারে না। সরকারের পাশাপাশি এসব প্রতিষ্ঠান অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও মানবিক দায়িত্ব পালন করছে।
ব্যারিস্টার কায়সার কামাল বলেন, “নির্যাতনের শিকার একটি শিশু কেবল শারীরিকভাবেই আঘাতপ্রাপ্ত হয় না, তার মনের ভেতর যে গভীর ক্ষত তৈরি হয়, তা তাকে সারাজীবন তাড়া করে বেড়ায়। এই নির্যাতিতদের সঠিক সময়ে মানসিক থেরাপি দেওয়া, আইনি লড়াইয়ে পাশে থাকা এবং তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে এই সেলগুলো অসাধারণ কাজ করছে।”
তিনি সরকারের পক্ষ থেকে এসব মানবিক ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমে সব ধরণের প্রশাসনিক সহযোগিতা ও তহবিল সরবরাহের আশ্বাস দেন। বিশেষ করে আইনি লড়াইয়ের খরচ জোগাতে না পেরে অনেক গরিব পরিবার যাতে মাঝপথে বিচার পাওয়া থেকে বঞ্চিত না হয়, সেদিকে বিশেষ নজর রাখার অনুরোধ করেন।
রাষ্ট্র ও সংবিধানের নৈতিক দায়বদ্ধতা
একজন প্রবীণ আইনজীবী হিসেবে ব্যারিস্টার কায়সার কামাল দেশের সর্বোচ্চ আইন তথা সংবিধানের প্রসঙ্গ টেনে আনেন। তিনি উপস্থিত সবাইকে মনে করিয়ে দেন যে, দেশের প্রতিটি শিশুর শারীরিক, মানসিক এবং সামাজিক বিকাশ নিশ্চিত করা স্রেফ দয়া বা অনুকম্পা নয়; এটি রাষ্ট্রের সাংবিধানিক, আইনি এবং পরম নৈতিক দায়িত্ব।
সংবিধানের মৌলিক অধিকারের ধারাগুলোর উল্লেখ করে তিনি বলেন, রাষ্ট্র যদি তার দেশের শিশুদের একটি নিরাপদ, মানবিক ও সহিংসতামুক্ত সমাজ উপহার দিতে না পারে, তবে সার্বিক উন্নয়নের কোনো মূল্য থাকে না। বড় বড় মেগা প্রকল্প আর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির চেয়েও একটি শিশুর নিরাপদ হাসির মূল্য অনেক বেশি। তাই একটি টেকসই ও কার্যকর জাতীয় শিশু নীতি প্রণয়ন এখন সময়ের দাবি।
গোলটেবিল বৈঠকে বিশিষ্টজনদের উদ্বেগ ও সামাজিক ঐকমত্য
‘নিপীড়িত নারী ও শিশুদের আইনি ও স্বাস্থ্য সহায়তা সেল’-এর কেন্দ্রীয় সমন্বয়কারী প্রফেসর ড. মো. রফিকুল ইসলামের সুনিপুণ সঞ্চালনায় এই গোলটেবিল বৈঠকটি এক প্রাণবন্ত ও কার্যকর আলোচনায় রূপ নেয়। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী মিজ ফারজানা শারমীন। তিনি সরকারের বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী ও শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রের আধুনিকায়নের চিত্র তুলে ধরেন।
এছাড়াও আলোচনায় অংশ নেন জাতীয় সংসদের সদস্য নিপুণ রায় চৌধুরী, দেশের প্রখ্যাত প্রবীণ অভিনেতা আশরাফ উদ্দিন আহমেদ উজ্জ্বলসহ নারী ও শিশু অধিকার বিষয়ক বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও দেশীয় সংগঠনের শীর্ষ প্রতিনিধিরা। বৈঠকে উন্নয়নকর্মী, মানবাধিকার কর্মী এবং বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের পদস্থ কর্মকর্তারা তাদের নিজ নিজ অভিজ্ঞতা ও প্রস্তাবনা পেশ করেন।
অনুষ্ঠানের সবচেয়ে আবেগঘন মুহূর্তটি তৈরি হয় যখন নিহত শিশু রামিসার বাবা মঞ্চে এসে দাঁড়ান। সন্তান হারানোর বিচার চেয়ে তার আকুল আবেদন উপস্থিত কাউকেই স্থির থাকতে দেয়নি। তার সেই কান্নাভেজা কণ্ঠস্বরই প্রমাণ করে দেয়, দেশের শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন কতটা জরুরি হয়ে পড়েছে।
টাস্কফোর্সের রূপরেখা ও আগামী দিনের রোডম্যাপ
গোলটেবিল বৈঠকের শেষ পর্যায়ে প্রস্তাবিত ‘জাতীয় শিশু নিরাপত্তা টাস্কফোর্স’-এর একটি প্রাথমিক রূপরেখা নিয়ে আলোচনা করা হয়। বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দেন, এই টাস্কফোর্সে কেবল সরকারি আমলারা থাকবেন না; এতে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে শিশু মনোবিজ্ঞানী, সমাজবিজ্ঞানী, আইনি বিশেষজ্ঞ এবং মাঠপর্যায়ের মানবাধিকার কর্মীদের।
টাস্কফোর্সের প্রধান কাজ হবে দেশের প্রতিটি জেলায় শিশু নির্যাতনের ঘটনাগুলোর একটি কেন্দ্রীয় ডাটাবেজ তৈরি করা, নির্যাতিত শিশুদের দ্রুততম সময়ে ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে চিকিৎসা দেওয়া এবং প্রতিটি মামলার অগ্রগতি প্রতি সপ্তাহে মনিটর করা। একই সঙ্গে গ্রামীণ অঞ্চলের স্কুলগুলোতে শিশুদের ‘গুড টাচ ও ব্যাড টাচ’ সম্পর্কে সচেতন করার জন্য বিশেষ মডিউল তৈরি করা হবে।
শাহবাগের এই গোলটেবিল বৈঠক থেকে উঠে আসা সুপারিশমালা খুব দ্রুতই একটি আনুষ্ঠানিক প্রস্তাবনা আকারে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে বলে আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। নতুন সরকারের প্রথম বাজেট অধিবেশনের ঠিক আগের দিন এই ধরনের একটি নীতিগত আলোচনা দেশের নীতিনির্ধারকদের বাজেটে শিশু সুরক্ষায় বরাদ্দ বাড়ানোর ক্ষেত্রেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আশা করা হচ্ছে।
শৈশবকে সুরক্ষিত করার এই লড়াইয়ে রাষ্ট্র এখন কতটা দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেয়, সেটাই দেখার বিষয়। ব্যারিস্টার কায়সার কামালের এই টাস্কফোর্স গঠনের আহ্বান যদি দ্রুত বাস্তবে রূপ নেয়, তবে তা হবে বাংলাদেশের শিশু অধিকার আন্দোলনের ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী মাইলফলক। দেশের কোটি শিশুর নিরাপদ ভবিষ্যতের স্বার্থে এই উদ্যোগের সফল বাস্তবায়ন দেখতে উন্মুখ পুরো বাংলাদেশ।

