রাজধানীর মগবাজারের আদ্-দ্বীন ব্যরিস্টার রফিক-উল-হক হাসপাতালে সম্প্রতি ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্বাস্থ্য প্রশাসনের কঠোর অবস্থানের মুখে আইনি ও নৈতিক লড়াইয়ের ঘোষণা দিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, তাকে সম্পূর্ণ বেআইনি এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছেন তাদের আইনজীবীরা।
শনিবার (৬ জুন) দুপুরে রাজধানীর তেজগাঁওয়ের একটি স্থানীয় হোটেলে আয়োজিত এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি উপস্থিত ছিলেন সন্তান হারানো ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরাও। সেখানে আইনি ব্যবস্থার চুলচেরা বিশ্লেষণের পাশাপাশি উঠে আসে এক আবেগঘন পরিবেশ। যেখানে রাষ্ট্র যখন হাসপাতাল বন্ধের দাবি তুলছে, তখন খোদ ভুক্তভোগী এক পিতাই চাইলেন হাসপাতালের ধারাবাহিকতা।
সংবাদ সম্মেলনে আদ্-দ্বীন হাসপাতালের পক্ষে আইনি অবস্থান ব্যাখ্যা করেন সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট শিশির মনির। তিনি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক পদক্ষেপগুলোর আইনি ভিত্তি নিয়ে তীব্র প্রশ্ন তোলেন। একই সঙ্গে সরকারি তদন্ত প্রতিবেদনের ভেতরে থাকা নানা কারিগরি ও বৈজ্ঞানিক অস্পষ্টতা সংবাদমাধ্যমের সামনে বিশদভাবে তুলে ধরেন।
কারণ দর্শানোর নোটিশ ও আইনি বৈধতার প্রশ্ন
গত বৃহস্পতিবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে আদ্-দ্বীন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে একটি কারণ দর্শানোর নোটিশ পাঠানো হয়েছিল। সেই নোটিশে জানতে চাওয়া হয়েছিল, কেন হাসপাতালটির লাইসেন্স বাতিল করা হবে না। এই নোটিশের জবাব দেওয়ার জন্য হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে আগামী রবিবার বিকেল ৫টা পর্যন্ত সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে অ্যাডভোকেট শিশির মনির স্পষ্ট করে বলেন, “আমরা নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই, অর্থাৎ আগামীকাল বিকেলের মধ্যে যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে নোটিশের জবাব দাখিল করব। তবে নোটিশে যেভাবে বলা হয়েছে যে জবাব সন্তোষজনক না হলে লাইসেন্স বাতিল করা হবে, তা দেশের প্রচলিত চিকিৎসা আইনের পরিপন্থী এবং সম্পূর্ণ বেআইনি।”
তিনি দাবি করেন, যেকোনো বেসরকারি হাসপাতালের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার একটি সুনির্দিষ্ট আইনি প্রক্রিয়া রয়েছে। মাত্র কয়েক দিনের নোটিশে একটি চলমান ও জনসেবামূলক হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের হুমকি দেওয়া আইনগতভাবে টিকবে না। আদ্-দ্বীন কর্তৃপক্ষ শুরু থেকেই তদন্তে সব ধরণের সহযোগিতা করে আসছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
সরকারি তদন্ত প্রতিবেদনের অস্পষ্টতা
ছয় নবজাতকের আকস্মিক মৃত্যুর কারণ অনুসন্ধানে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় যে বিশেষ তদন্ত কমিটি গঠন করেছিল, সম্প্রতি তাদের একটি সারসংক্ষেপ প্রকাশিত হয়েছে। সেই প্রতিবেদনের প্রধানতম পর্যবেক্ষণ ছিল—হাসপাতালের বিশেষায়িত শিশু ওয়ার্ডে অক্সিজেনের তীব্র স্বল্পতা ছিল এবং বাতাসে কার্বন-ডাই-অক্সাইড গ্যাসের পরিমাণ বিপজ্জনক মাত্রায় বৃদ্ধি পেয়েছিল।
এই বৈজ্ঞানিক দাবির বিপরীতে তীব্র আপত্তি তুলেছেন আইনজীবী শিশির মনির। তিনি প্রতিবেদনের দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করে বলেন, “মন্ত্রণালয়ের রিপোর্টে বলা হয়েছে কার্বন-ডাই-অক্সাইড বেড়েছে। কিন্তু ওই নির্দিষ্ট সময়ে ওয়ার্ডের বাতাসে অক্সিজেনের মাত্রা ঠিক কতটুকু ছিল বা কার্বন-ডাই-অক্সাইডের পিপিএম (পার্টস পার মিলিয়ন) কত ছিল, তার কোনো সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান বা ডাটা রিপোর্টে নেই।”
তিনি আরও প্রশ্ন তোলেন, “কতটুকু অক্সিজেন থাকলে বা গ্যাসের অনুপাত কেমন হলে একটি নবজাতকের মৃত্যুঝুঁকি তৈরি হয় না, সে বিষয়েও কোনো আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বা সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা এই রিপোর্টে দেওয়া হয়নি। সম্পূর্ণ অনুমানের ওপর ভিত্তি করে এমন একটি সংবেদনশীল বিষয়ে চূড়ান্ত রিপোর্ট দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে ব্যাপক অস্পষ্টতা রয়ে গেছে।”
‘হাসপাতাল বন্ধ হোক আমরা চাই না’
সংবাদ সম্মেলনের সবচেয়ে নাটকীয় এবং মানবিক মুহূর্তটি তৈরি হয় যখন নিহত এক নবজাতকের পিতা হাবিবুর রহমান মাইকের সামনে এসে দাঁড়ান। সন্তান হারানোর গভীর শোক বুকে চেপেও তিনি যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা উপস্থিত সাংবাদিকদের অনেককেই বিস্মিত করেছে। তিনি কোনো অন্ধ আক্রোশের বদলে প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটনের দাবি জানান।
হাবিবুর রহমান ভাঙা গলায় বলেন, “আমি আমার সন্তানকে হারিয়েছি, এই কষ্ট কোনো কিছু দিয়ে পূরণ হবে না। আমরা নিশ্চিতভাবেই চাই যে তদন্ত হোক এবং প্রকৃত দোষী যিনি, তার কঠোরতম শাস্তি হোক। কিন্তু তার মানে এই নয় যে একটি হাসপাতাল বন্ধ করে দেওয়া হবে। আমরা কোনোভাবেই হাসপাতাল বন্ধের এই ঘোষণা সমর্থন করি না।”
নিজের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে এই পিতা আরও বলেন, “আমার এর আগেও দুটি সন্তান হয়েছে। তাদের জন্মও এই আদ্-দ্বীন হাসপাতালেই হয়েছিল। তারা সম্পূর্ণ সুস্থ অবস্থায় বাড়ি ফিরেছিল এবং এখনো ভালো আছে। একটি দুর্ঘটনা বা কারও ব্যক্তিগত ভুলের জন্য পুরো প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস করা ঠিক হবে না। কারণ এখানে প্রতিদিন হাজারো গরিব মানুষ কম খরচে চিকিৎসা পায়।”
ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর জন্য আজীবন পুনর্বাসন
আদ্-দ্বীন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এই ঘটনায় তাদের ওপর আসা সব দায় এড়ানোর চেষ্টা করেনি। বরং সংবাদ সম্মেলনে তারা সন্তান হারানো পরিবারগুলোর প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়ে এক অভূতপূর্ব ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। যা দেশের চিকিৎসা খাতের ইতিহাসে বেশ ব্যতিক্রমী একটি ঘটনা।
হাসপাতালের পরিচালনা পর্ষদের পক্ষ থেকে ঘোষণা করা হয়, এই ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত ও ভুক্তভোগী সব পরিবারের সদস্যদের আজীবনের জন্য আদ্-দ্বীন হাসপাতালের যেকোনো শাখায় সম্পূর্ণ বিনামূল্যে সব ধরণের চিকিৎসা সেবা প্রদান করা হবে। তাদের চিকিৎসার যাবতীয় ব্যয়ভার বহন করবে হাসপাতাল ট্রাস্ট।
এর পাশাপাশি, ভুক্তভোগী পরিবারের যোগ্যতা অনুযায়ী স্থায়ী কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা এবং তাৎক্ষণিকভাবে বড় অঙ্কের আর্থিক ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। আদ্-দ্বীন কর্তৃপক্ষের এই মানবিক ও দায়িত্বশীল উদ্যোগকে উপস্থিত ভুক্তভোগী পরিবারগুলো সাধুবাদ জানিয়েছে এবং তারা হাসপাতালের পাশে থাকার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে।
জনস্বাস্থ্য ও প্রশাসনিক টানাপোড়েন
মেডিকেল বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নবজাতকদের এনআইসিইউ (Neonatal Intensive Care Unit) বা সিসিইউতে রাখার ক্ষেত্রে অত্যন্ত সুক্ষ্ম কারিগরি ব্যবস্থাপনার প্রয়োজন হয়। সেন্ট্রাল অক্সিজেন লাইনে সামান্য ত্রুটি বা ভেন্টিলেশন ব্যবস্থার দুর্বলতা অনেক সময় বড় ধরণের বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে। আদ্-দ্বীনের ক্ষেত্রেও তেমন কিছু ঘটেছিল কিনা, তা আরও গভীর বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার দাবি রাখে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মতো নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর দায়িত্ব কেবল লাইসেন্স বাতিলের হুমকি দেওয়া বা শাস্তি দেওয়া নয়। বরং বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে যাতে বিশ্বমানের প্রোটোকল বজায় থাকে, তা নিয়মিত তদারকি করা। আকস্মিক কোনো দুর্ঘটনার পর পুরো হাসপাতাল বন্ধ করে দিলে সাধারণ রোগীদের ওপর তার বড় ধরণের নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
শনিবার বিকেল পর্যন্ত মগবাজারের আদ্-দ্বীন হাসপাতালে গিয়ে দেখা গেছে, বহির্বিভাগে সাধারণ রোগীদের স্বাভাবিক ভিড় রয়েছে। তবে ইনডোর ও শিশু ওয়ার্ডগুলোতে এক ধরণের থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। লাইসেন্স বাতিলের গুঞ্জনে অনেক ভর্তি থাকা রোগীর স্বজনেরা আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
আগামী দিনের আইনি লড়াই ও ভবিষ্যৎ
রোববার বিকেল ৫টার মধ্যে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লিখিত জবাব জমা দেওয়ার পর এই সংকটের পরবর্তী ধাপ শুরু হবে। আইনি বিশ্লেষকদের মতে, যদি প্রশাসন আদ্-দ্বীনের জবাবে সন্তুষ্ট না হয়ে লাইসেন্স বাতিলের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়, তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ উচ্চ আদালতের শরণাপন্ন হতে পারে।
অ্যাডভোকেট শিশির মনির ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, তারা যেকোনো ধরণের একতরফা ও বেআইনি সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে দেশের সর্বোচ্চ আদালতে রিট আবেদন করতে প্রস্তুত। কারণ হিসেবে তারা বলছেন, ভুক্তভোগী পরিবারগুলো নিজেই যেখানে হাসপাতালের কার্যক্রম সচল রাখার পক্ষে, সেখানে প্রশাসনের এমন তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত হঠকারিতার শামিল।
ছয়টি কচি প্রাণের অকাল চলে যাওয়ার এই ঘটনাটি দেশের স্বাস্থ্য খাতের জবাবদিহিতাকে আবার বড় ধরণের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে। তবে আদ্-দ্বীনের এই সংকট কেবল একটি লাইসেন্স বাতিলের আইনি লড়াইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি এখন রূপ নিয়েছে ভুক্তভোগীদের অধিকার, মানবিকতা আর রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের ক্ষমতার সমীকরণে। আগামীকালের জবাবের পর জল কোন দিকে গড়ায়, সেদিকেই তাকিয়ে আছে দেশের পুরো চিকিৎসা অঙ্গন।

