আকাশে মেঘের ঘনঘটা আর পঞ্জিকার পাতায় বৃষ্টির দিন ঘনিয়ে আসতেই উপকূলীয় জেলা বরগুনার জনপদে জেঁকে বসছে এক অজানা আতঙ্ক। গত বছরের সেই বিভীষিকাময় স্মৃতি এখনো তাড়া করে ফিরছে স্থানীয়দের, যখন ডেঙ্গুর ছোবলে অকালে ঝরে গিয়েছিল অর্ধশতাধিক প্রাণ। সরকারি নথিতে ১০ হাজার মানুষের আক্রান্ত হওয়ার খবর থাকলেও বাস্তব চিত্র ছিল আরও ভয়াবহ।
চলতি বছর আবারও ডেঙ্গুর মৌসুম কড়া নাড়ছে দুয়ারে। অথচ যে জেলাকে গত বছর ‘হটস্পট’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল, সেখানে মশক নিধনে প্রশাসনের দৃশ্যমান কোনো তৎপরতা নেই বলে অভিযোগ উঠেছে। সাধারণ মানুষের চোখে যা ধরা পড়ছে, তা হলো এক চরম উদাসীনতা। চিকিৎসকরা সতর্ক করে বলছেন, এখনই ব্যবস্থা না নিলে গত বছরের চেয়েও ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে আসতে পারে।
সরেজমিনে বরগুনা পৌর শহর ও সংলগ্ন এলাকাগুলো ঘুরে দেখা গেছে এক অস্বস্তিকর চিত্র। বিশেষ করে সদর উপজেলার গৌরীচন্না ইউনিয়নের দক্ষিণ মনসাতলী এলাকাটি যেন মশার চারণভূমি। গত বছর এই গ্রামেই ডেঙ্গুর প্রকোপ ছিল সবচেয়ে বেশি। ঘনবসতিপূর্ণ এই এলাকায় পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা এতটাই শোচনীয় যে, বৃষ্টি হলেই তৈরি হয় কৃত্রিম জলাবদ্ধতা।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, দীর্ঘ এক বছরেও এখানে ড্রেনেজ ব্যবস্থার কোনো উন্নতি হয়নি। একটিমাত্র ড্রেন থাকলেও তা পরিষ্কার করার দায়ভার নিতে হয় স্থানীয়দেরই। ফলে পরিত্যক্ত ডোবা আর নালায় জমে থাকা পানি হয়ে উঠেছে এডিস মশার নিরাপদ প্রজনন কেন্দ্র। অথচ এ বছর এখন পর্যন্ত সেখানে না ছিটানো হয়েছে মশার ওষুধ, না চালানো হয়েছে কোনো পরিচ্ছন্নতা অভিযান।
দক্ষিণ মনসাতলীর বাসিন্দা আব্দুল্লাহর কণ্ঠে ঝরে পড়ল একরাশ ক্ষোভ। তিনি বলছিলেন, “জনসংখ্যা বাড়ছে কিন্তু ড্রেন বাড়ছে না। একটু বৃষ্টি হলেই বাড়ির উঠানে হাঁটু সমান পানি জমে থাকে। ড্রেনগুলো সচল থাকলে মশার উপদ্রব কমত, আমরাও একটু শান্তিতে ঘুমানোর ভরসা পেতাম। কিন্তু প্রশাসন যেন আমাদের কথা ভুলেই গেছে।”
একই এলাকার মো. জসিম উদ্দিনের অভিজ্ঞতা আরও তিক্ত। গত বছর তার পাড়ার প্রায় প্রতিটি ঘরেই ছিল ডেঙ্গু রোগী। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, “গতবার যে কষ্ট পেয়েছি, তা বলে বোঝানো যাবে না। অথচ এ বছর জেলা পরিষদ কিংবা ইউনিয়ন কাউন্সিল—কেউই কোনো ভ্রুক্ষেপ করছে না। এখনই মশা না মারলে আমাদের কপালে আবারও দুঃখ আছে।”
শহরের সাধারণ মানুষের মনেও জমেছে একরাশ প্রশ্ন। পৌর শহরের বাসিন্দা মোর্শেদ সুজনের মতে, গত বছর ৫০ জনেরও বেশি মানুষের মৃত্যুর পরও পৌর কর্তৃপক্ষের এই নির্লিপ্ততা ক্ষমার অযোগ্য। পরিচ্ছন্নতা অভিযানে কোনো নজর নেই বললেই চলে। শহরজুড়ে মশার ভনভনানি বাড়ছে, কিন্তু ফগার মেশিনের শব্দ শোনা যাচ্ছে না কোথাও।
আমিনুল ইসলাম নাবিল নামে এক নাগরিক সরাসরি আঙুল তুললেন বৈষম্যের দিকে। তিনি বলেন, “পৌরসভায় প্রশাসক নিয়োগের পর থেকে সেবা পাওয়া যেন ভাগ্যের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। শুধু অফিসারদের কোয়ার্টার আর ভিআইপি এলাকার আশপাশে মশা মারার ওষুধ ছিটানো হয়। অথচ আমরা সাধারণ মানুষ সন্ধ্যার পর মশার কামড়ে ঘরে টিকতে পারছি না।”
গত বছরের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মার্চের পর থেকে বরগুনায় ডেঙ্গুর গ্রাফ ছিল ঊর্ধ্বমুখী। ২৫০ শয্যার জেনারেল হাসপাতালে তিল ধারণের জায়গা ছিল না। প্রতিদিন গড়ে দেড়শ থেকে দুইশ রোগী ভর্তি হতে শুরু করলে স্বাস্থ্য বিভাগ জরুরি ভিত্তিতে অতিরিক্ত চিকিৎসক ও নার্স নিয়োগ দিতে বাধ্য হয়েছিল। সেই পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খেয়েছিল পুরো জেলা প্রশাসন।
পরিস্থিতি এতটাই জটিল ছিল যে, আইইডিসিআরের একটি বিশেষ তদন্ত দল বরগুনা সফর করেছিল। গবেষকরা জানিয়েছিলেন, জনসচেতনতার অভাব এবং খোলা পাত্রে বৃষ্টির পানি জমে থাকাই ছিল সংক্রমণের মূল কারণ। অথচ সেই তদন্ত রিপোর্টের সুপারিশগুলো কতটুকু বাস্তবায়িত হয়েছে, তা নিয়ে এখন বড় ধরনের সংশয় দেখা দিয়েছে।
সিভিল সার্জন অফিসের তথ্য বলছে, গত বছর বরগুনায় মোট ৯ হাজার ৭৪৯ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন। সরকারিভাবে মৃত্যুর সংখ্যা ১৫ বলা হলেও বেসরকারি হিসাবে তা ৬০ ছুঁইছুঁই। চলতি বছর জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত ৯১ জন রোগী শনাক্ত হয়েছেন, যার মধ্যে বর্তমানে চারজন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। যদিও এখন পর্যন্ত কেউ মারা যায়নি, তবে মৌসুমের শুরুতেই এই সংখ্যাটিকে ‘বিপজ্জনক’ মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বরগুনা জেলা স্বাস্থ্য অধিকার ফোরামের সভাপতি মনির হোসেন কামালের মতে, বৃষ্টির সাথে পাল্লা দিয়ে ডেঙ্গু বাড়বে এটাই স্বাভাবিক। গত কয়েকদিনের বিক্ষিপ্ত বৃষ্টিতেই আক্রান্তের সংখ্যা বাড়তে শুরু করেছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে যে প্রস্তুতির দাবি করা হচ্ছে, তা কেবল খাতা-কলমেই সীমাবদ্ধ বলে মনে করেন এই অধিকার কর্মী।
পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট নুরুল আমিনও গত বছরের ভয়াবহতা স্মরণ করে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, “পূর্বপ্রস্তুতি না থাকলে আবারও আমরা স্বজন হারানোর মিছিলে যোগ দেব। এখনই ড্রেন পরিষ্কার ও লার্ভা নিধনের কার্যকর কর্মসূচি না নিলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে।”
বরগুনা জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মো. রেজওয়ানুর আলমের পরামর্শ বেশ সুনির্দিষ্ট। তিনি জানান, ড্রেনগুলো সচল রাখা এবং সপ্তাহে অন্তত তিন দিন মশার ওষুধ ছিটানো এখন বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত। বিশেষ করে গত বছরের ‘হটস্পট’ এলাকাগুলোতে এখনই ক্রাশ প্রোগ্রাম শুরু করা দরকার। তিনি চান না গত বছরের মতো আর কোনো মর্মান্তিক মৃত্যু দেখতে।
তবে প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের কণ্ঠে শোনা গেল ভিন্ন সুর। বরগুনা পৌরসভার প্রশাসক সজল চন্দ্র শীল দাবি করেছেন, তারা ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়ে কাজ করছেন। প্রতিটি ইউনিয়নে ফগার মেশিন কেনা হয়েছে এবং নিয়মিত সভা করা হচ্ছে। এমনকি প্রতি শনিবার বিশেষ পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালানো হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
যদিও মাঠপর্যায়ের চিত্র প্রশাসনের এই দাবির সঙ্গে ঠিক মিলছে না। জনস্বাস্থ্য রক্ষায় কেবল প্রচারণাই যথেষ্ট নয়, বরং মশা নিধনে সরাসরি পদক্ষেপ কতটুকু নেয়া হচ্ছে—সেটাই এখন বড় প্রশ্ন। সচেতন নাগরিকরা মনে করেন, লার্ভা ধ্বংস না করে কেবল লিফলেট বিলি করে ডেঙ্গু ঠেকানো সম্ভব নয়।
বরগুনার সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ আবুল ফাত্তাহ অবশ্য চিকিৎসার দিক থেকে আশার কথা শুনিয়েছেন। তিনি বলেন, “গত বছরের অভিজ্ঞতা থেকে আমরা অনেক কিছু শিখেছি। ল্যাব পরীক্ষার সক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে এবং জনবল সংকট থাকলেও আমরা সর্বোচ্চ সেবা দিতে প্রস্তুত।” তবে চিকিৎসার চেয়ে প্রতিরোধই যে এখন বড় প্রয়োজন, তা তিনি নিজেও স্বীকার করেন।
উপকূলীয় এই জনপদে মানুষের জীবন এমনিতেই সংগ্রামমুখর। তার ওপর ডেঙ্গুর মতো ঘাতক ব্যাধি যদি প্রশাসনের অবহেলায় জেঁকে বসে, তবে তার দায়ভার কে নেবে? ড্রেনের পচা পানি আর ডোবার লার্ভা যেন কেবল মশার প্রজনন কেন্দ্র নয়, বরং প্রশাসনিক ব্যর্থতার এক একেকটি দর্পণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বরগুনার মানুষ এখন কেবল ঘোষণার বাস্তবায়ন দেখতে চায়। তারা চায় না কোনো মা তার সন্তানকে হারাক, কোনো পরিবার যেন ডেঙ্গুর ব্যয়বহুল চিকিৎসা মেটাতে নিঃস্ব না হয়। সময় এখনো ফুরিয়ে যায়নি, বৃষ্টির দাপট বাড়ার আগেই শহর ও গ্রামজুড়ে মশক নিধনের জোরালো যুদ্ধ শুরু করা এখন সময়ের দাবি।
শেষ পর্যন্ত কি প্রশাসন ঘুম ভেঙে জেগে উঠবে, নাকি গত বছরের মতো আবারও শ্মশান আর কবরস্থানে লাশের সারি বাড়বে—সেই উত্তরের অপেক্ষায় প্রহর গুনছে বরগুনা। জনস্বাস্থ্য রক্ষায় কোনো অজুহাত নয়, বরং দৃশ্যমান কার্যকর পদক্ষেপই হতে পারে এই আতঙ্কের একমাত্র সমাধান।

